ড. মুহাম্মদ ইউনূস : ক্ষমতার বাইরে থেকেও বাংলাদেশের কণ্ঠ হতে পারেন

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সম্মান, বিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিনের সাধনায় অর্জিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই সম্মান অর্জন করেছেন নিরলস কাজ, আত্মনিবেদন ও নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে। এখন সময় এসেছে দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতার বাইরে থেকেও বাংলাদেশের কণ্ঠ হতে পারেন। এই সত্যকে উপলব্ধি করাই হবে দেশের প্রকৃত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা

অ্যাডভোকেট শফিকুল হক
ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন ব্যক্তি ও সময় যেন একে অপরকে খুঁজে নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়টি ছিল তেমনি এক সন্ধিক্ষণ। অনিশ্চয়তা, ভঙ্গুরতা ও জাতীয় উদ্বেগে ভরা সেই মুহূর্তে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। যা নিছক প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু; এটি ছিল নৈতিক সাহস ও গভীর জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ড. ইউনূস দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। তিনি তখন আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ও বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং দেশের ভেতরের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দায়িত্ব গ্রহণের কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা তার ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতা ও বিপুল জনপ্রত্যাশার ভার নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেয়া কোনোভাবেই আরামদায়ক বা আকর্ষণীয় ছিল না।

তবু জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা ছাত্রনেতারা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবং বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল বিশ্বাস করতেন, এই সঙ্কটকালে কেবল একজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও নৈতিক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিই দেশকে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে পারেন। জাতীয় প্রয়োজনের তাগিদেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেষ পর্যন্ত এই দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। এটি ছিল ক্ষমতার লোভ থেকে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং আত্মত্যাগমূলক নেতৃত্বের এক স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

সীমিত ক্ষমতায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসকে কাজ করতে হয়েছে কঠোর বাস্তবতার মধ্যে সময় সীমিত, সাংবিধানিক ক্ষমতা সংযত এবং রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র। সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও দেশকে গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারত। এই বাস্তবতায় তার নেতৃত্ব ছিল সংযত, বিচক্ষণ এবং নৈতিকতানির্ভর।

তিনি কখনোই এই দায়িত্বকে ব্যক্তিগত মর্যাদা বা রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, শাসনব্যবস্থাকে সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। সংলাপের প্রতি তার আগ্রহ, ধৈর্য ও সঙ্ঘাত এড়িয়ে সমাধানের পথ খোঁজার মানসিকতা দেশকে একটি গুরুতর সঙ্কট থেকে রক্ষা করেছে।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও নেতৃত্বের প্রতীক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেবল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার প্রকৃত অবদানকে খাটো করা হবে। তিনি সেই বিরল বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যারা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতায় না থেকেও একটি দেশের কণ্ঠস্বর ও মূল্যবোধকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারেন।

ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার ধারণার মাধ্যমে তিনি দারিদ্র্য বিমোচন সম্পর্কে বৈশ্বিক চিন্তাধারায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছেন। উন্নয়ন যে কেবল রাষ্ট্র বা করপোরেট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই সত্য তিনি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই বাংলাদেশী বিশ্বনাগরিকের পরিচয় কোনো রাজনৈতিক পদে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কয়েক দশকের নিরলস কাজ, নৈতিক অবস্থান ও মানবিক দর্শনের ফল।

একজন বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক কণ্ঠ
বিশ্ব রাজনীতিতে এমন মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা, যারা ক্ষমতার বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই বিরল ব্যতিক্রম। জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সংস্থা ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্ভবত একমাত্র সরকারপ্রধান, যিনি ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে ‘চোখে চোখ রেখে’ কথা বলার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। এই অবস্থান কোনো উচ্চকণ্ঠ জাতীয়তাবাদ বা সঙ্ঘাতমূলক কূটনীতির ফল নয়; বরং এটি এসেছে তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা থেকে। ফলে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলেও তিনি একজন বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানিত আলোচক হিসেবে বিবেচিত হন— যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

এই গ্রহণযোগ্যতা কোনো সরকারি পদ থেকে পাওয়া নয়; এটি অর্জিত হয়েছে সততা, নৈতিক ধারাবাহিকতা এবং মানুষের ক্ষমতায়নে অবিচল বিশ্বাসের মাধ্যমে। ভবিষ্যতে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে, ড. ইউনূসের এই নৈতিক পুঁজি কীভাবে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা জরুরি।

তিনি হতে পারেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিশেষ দূত বা অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ— যার মাধ্যমে দেশের ভাবমর্যাদা উন্নত হবে, দায়িত্বশীল বিদেশী বিনিয়োগ আসবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, অভিবাসন ও মানবিক সঙ্কটের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের কণ্ঠ আরো জোরালোভাবে তুলে ধরা যাবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক উপলব্ধি
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্ব কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত। নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের পর তিনি যখন যুক্তরাজ্য সফর করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তার সম্মানে একটি বৃহৎ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়, যা যৌথভাবে সংগঠিত করে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশী কমিউনিটি ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। সে সময় আমি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম এবং সেই সংবর্ধনার কনভেনর ও চেয়ার হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়।

অনুষ্ঠানটিতে যুক্তরাজ্যের বহু সাংস্কৃতিক সমাজের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আন্তরিক ভালোবাসা ড. ইউনূসকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এই অভিজ্ঞতা তাকে কেবল একজন বাংলাদেশী নয়; বরং একজন বৈশ্বিক মানবিক নেতার আসনে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আমি নিজেও প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক নেতৃত্বে কাজ করেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ ধরনের প্রশাসনিক মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক সেরা চর্চা যদি বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারপ্রক্রিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।

বৈশ্বিক সঙ্কটে প্রাসঙ্গিক নৈতিক নেতৃত্ব
আজকের বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়সহ একাধিক সঙ্কটে আক্রান্ত। এসব সঙ্কট কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব ও মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।

এই প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ যদি তাকে সামনে রেখে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে, তবে তা কেবল কূটনৈতিক সাফল্য হবে না, এটি হবে নৈতিক নেতৃত্বের এক শক্তিশালী উদাহরণ।

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সম্মান, বিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘদিনের সাধনায় অর্জিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই সম্মান অর্জন করেছেন নিরলস কাজ, আত্মনিবেদন ও নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।

এখন সময় এসেছে দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতার বাইরে থেকেও বাংলাদেশের কণ্ঠ হতে পারেন। এই সত্যকে উপলব্ধি করাই হবে দেশের প্রকৃত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।

লেখক : সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস

কাউন্সিল, লন্ডন, যুক্তরাজ্য