মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রকাশ্যে যুদ্ধ এড়ানোর কথা উচ্চারিত হলেও বাস্তবে সবপক্ষই যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, অন্যদিকে স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা অস্বীকার করার মার্কিন অবস্থান আসলে সুপরিচিত ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’। ইতিহাস বলে, এ ধরনের ধোঁয়াশা সাধারণত বড় ধরনের সঙ্ঘাতের পূর্বাভাস।
ইরানে আমেরিকার কোনো ভালো বিকল্প নেই মর্মে যে সতর্কতা উচ্চারিত হয়েছে, তা মূলত এই বাস্তবতার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সঙ্ঘাতে জড়িয়েছে, যেখানে লক্ষ্য, কৌশল ও বের হওয়ার পথ— তিনটিই অস্পষ্ট। আর এদিকে নিয়ে গেছে ইসরাইল।
প্রথমত, সামরিক বাস্তবতা বিবেচনায় দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি কেবল প্রতিরক্ষামূলক নয়; এটি দ্রুত আক্রমণ সক্ষমতা তৈরির ইঙ্গিত। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে শুধু আকাশ হামলা যথেষ্ট নয়— সীমিত স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য দখল বা ধ্বংসের মতো ‘সার্জিক্যাল গ্রাউন্ড অপারেশন’ বাস্তব কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এমন সীমিত অভিযান খুব কমই সীমিত থাকে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বার্তার বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ‘স্থল অভিযানের’ কথা অস্বীকার করে মূলত অভ্যন্তরীণ জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ইরাক ও আফগান যুদ্ধের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা মার্কিন জনগণকে স্থলযুদ্ধে অনীহ করে তুলেছে। ফলে প্রশাসন একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, অন্যদিকে কূটনৈতিকভাবে সঙ্ঘাত সীমিত রাখার সঙ্কেত দেয়— যাতে প্রয়োজনে দ্রুত অবস্থান বদলানো যায়। এই দ্বৈত অবস্থানই আসলে বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
তৃতীয়ত, ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, স্থল অভিযানে নামলে তা হবে ‘নরকে প্রবেশের’ সমান। এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং সুসংগঠিত সামরিক মতবাদের প্রতিফলন। ইরানের কৌশল মূলত অসম যুদ্ধ, যেখানে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি গেরিলা হামলা, প্রক্সি মিলিশিয়া এবং আঞ্চলিক ফ্রন্ট ব্যবহার করা হয়। ফলে মার্কিন স্থল অভিযান শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে ইরাক, লেবানন, এমনকি ইয়েমেন পর্যন্ত। এতে একটি সীমিত যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এখানেই যুক্ত হয় বৈশ্বিক শক্তি সমীকরণ। রাশিয়া ও চীন এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, অর্থাৎ সীমিত লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া অভিযান ক্রমে বৃহৎ যুদ্ধে পরিণত হওয়া। ইলান গোল্ডেনবার্গ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুস্পষ্ট এন্ড গেম বা শেষ খেলা নেই। যদি লক্ষ্য হয় কেবল সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, তবে স্থল অভিযান অপ্রয়োজনীয়; আর যদি লক্ষ্য হয় শাসন পরিবর্তন, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বে রূপ নেবে, যার ফলাফল অনিশ্চিত।
এখানেই যুক্ত হয় বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ। রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও সঙ্ঘাতকে জটিল করে তুলতে পারে। রাশিয়া ইরানকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে চীন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি ক্ষেত্রে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। ফলে সঙ্ঘাত ক্রমে একটি ‘মাল্টি-লেয়ার দ্বন্দ্বে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরাইলের সামরিক কৌশল। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের অভিযানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। এটি মূলত ইরান-সমর্থিত প্রক্সি কাঠামো, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি বৃহত্তর ‘কৌশলগত ঘেরাও’-এর অংশ, যেখানে ইরানকে চারদিক থেকে চাপের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এই কৌশল উল্টো সঙ্ঘাত ত্বরান্বিত করতে পারে, কারণ ইরান সরাসরি সঙ্ঘাতে জড়াতে বাধ্য হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো, ভুল হিসাব। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সীমিত সংঘর্ষ, যেমন লেবানন ফ্রন্টে উত্তেজনা বা উপসাগরে মুখোমুখি অবস্থান, দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন একটি প্রক্সি যুদ্ধ মুহূর্তেই সরাসরি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
শেষ প্রশ্নটি কেবল যুদ্ধ হবে কি না— তা নয়; বরং যুদ্ধ শুরু হলে তা কোথায় গিয়ে থামবে সেটি। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান প্রমাণ করেছে, যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন। ইরানের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরো গভীর। ইরান শক্তিশালী রাষ্ট্র, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং বৈশ্বিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।
এক কথায়, মধ্যপ্রাচ্য এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি কৌশলই ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিটি পদক্ষেপই বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযানের সম্ভাবনা শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি কৌশলগত ফাঁদ, যা একবার সক্রিয় হলে পুরো অঞ্চল— এমনকি বিশ্বকে একটি বৃহত্তর সঙ্ঘাতের দিকে ঠিলে দিতে পারে।
দুই.
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সঙ্কটকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে একটি বড় বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এই সঙ্ঘাতের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো, যারা সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ফলাফল নির্ধারণে সক্ষম।
প্রথমত, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র— বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার একদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে সন্দেহের চোখে দেখে; অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধ তাদের জন্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকলেও, বাস্তবে সঙ্ঘাত সীমিত রাখার পক্ষে কাজ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা এই সঙ্কটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না, কারণ ইয়েমেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের দেখিয়েছে, প্রক্সি সঙ্ঘাত কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে। তবে তারা ইরানের শক্তি বৃদ্ধিকেও মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে তারা এক ধরনের ‘নীরব ভারসাম্য’ কৌশল অনুসরণ করছে।
তৃতীয়ত, ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এই সঙ্ঘাতের সরাসরি প্রভাবের মুখে রয়েছে। ইরাক এখানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটিতে শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া রয়েছে, যারা যে কোনো মুহূর্তে মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে পারে। ফলে ইরাক কার্যত একটি ‘যুদ্ধের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে’- পরিণত হতে পারে। একইভাবে তুরস্ক স্বতন্ত্র কৌশল অনুসরণ করছে। আঙ্কারা কারো পক্ষে না গিয়ে নিজের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে, বিশেষ করে সিরিয়া ও কুর্দি ইস্যুতে।
চতুর্থত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীরাও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সাথে সীমান্ত ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইসলামাবাদ এই সঙ্ঘাতে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করবে। আফগানিস্তানও একটি অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে সঙ্ঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বহন করতে পারে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার মাধ্যমে।
পঞ্চমত, ইসরাইল এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল সবচেয়ে আক্রমণাত্মক। দক্ষিণ লেবাননে তাদের অভিযান মূলত হিজবুল্লাহকে দুর্বল করে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর কৌশল। কিন্তু এই কৌশল সঙ্ঘাত ত্বরান্বিত করতে পারে, কারণ হিজবুল্লাহর সাথে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ মানেই ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার ঝুঁকি।
ষষ্ঠত, এই পুরো অঞ্চলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খাবে।
সবশেষে, এই সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কেউই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের বহুমাত্রিক স্বার্থের দ্বন্দ্বই পরিস্থিতি আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।
এর মধ্যেই পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসর— এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারেননি, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছেন। বৈঠকের প্রধান আউটকাম হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ তৈরির উদ্যোগ। এখানে পাকিস্তান নিজেকে ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে তুলে ধরেছে। ইসলামাবাদ একই সাথে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সাথে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হওয়ায় মধ্যস্থতার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনা। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বন্দ্বে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও প্রক্সি সমর্থন বন্ধের দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে ইরান প্রথমে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কমই।
এই বৈঠকের আরেকটি কৌশলগত তাৎপর্য হলো, একটি আঞ্চলিক কূটনৈতিক ব্লকের সূচনা, যেখানে পশ্চিমা শক্তির বাইরে থেকে সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তিন.
ইরান এখন ঠিক কোন অবস্থায় রয়েছে তা নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। ট্রাম্প বলছেন, তাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসরাইল এবং আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে ইরানের আক্রমণ ক্রমেই বেপরোয়া রূপ নিচ্ছে। নার্গেস বাজোঘলি ফরেন অ্যাফেয়ার্সে ‘ইরানের দীর্ঘ খেলা’ নামে সদ্য লেখা এক নিবন্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি সামনে আনেন। তিনি মনে করেন, প্রচলিত সামরিক মানদণ্ডে ইরান হয়তো দুর্বল অবস্থানে, কিন্তু কৌশলগতভাবে দেশটি যুদ্ধে জিততে পারে।
বাজোঘলির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিকভাবে ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস, কমান্ডার হত্যা ও সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও, এগুলো আসল সূচক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শেষে ইরান কি তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করছে? এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান এগিয়ে আছে।
এই ‘লং গেম’ বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধে ইরান বুঝতে পারে, পশ্চিমা শক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের সম্মিলিত চাপের মুখে টিকে থাকতে হলে তাকে ভিন্ন পথ নিতে হবে। ফলে গড়ে ওঠে অসম যুদ্ধ কৌশল, যেখানে সরাসরি শক্তির বদলে ছায়াযুদ্ধ, প্রক্সি বাহিনী ও বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসে। তারা শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত নেটওয়ার্ক তৈরি করে— যার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠী, যেমন হিজবুল্লাহ এবং ইরাক ও সিরিয়ায় বিভিন্ন মিলিশিয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইরানের প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইরান বিকল্প কৌশল গড়ে তোলে। এখন তারা পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ও হরমুজ প্রণালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে বৈশ্বিক বাজার অস্থির করে তুলছে। পুরোপুরি বন্ধ না করেও কেবল হুমকির মাধ্যমে তেলের দাম, বীমা খরচ ও সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা দায় তৈরি করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে। সৌদি আরব আমিরাত ও কাতার এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, বিশেষ করে যখন ইসরাইলকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে বলে তাদের মনে হচ্ছে। এটি ইরানের বড় অর্জন।
নার্গেস বাজোঘলি ‘শিরশ্ছেদ কৌশল’ অর্থাৎ শীর্ষ নেতাদের হত্যার কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলেও, ইরানের বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো নতুন নেতৃত্ব দ্রুত তৈরি করছে। বরং নতুন প্রজন্মের কমান্ডাররা আরো আক্রমণাত্মক, যা সঙ্ঘাত আরো বাড়াতে পারে।
ইরানের মূল কৌশল হলো টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। ইরান জানে, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে পরাজিত করতে পারবে না; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের খরচ এত বাড়াতে পারে যে, প্রতিপক্ষ নিজেই পিছিয়ে যাবে।
নার্গেস বাজোঘলি মনে করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধ ক্ষেত্রে জিতছে বলে মনে হয়, সেখানে ইরান কৌশলগতভাবে পুরো যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে যেতে পারে। হ
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



