মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি সঙ্ঘাতের সমাপ্তি নয়; বরং আরো জটিল অধ্যায়ের সূচনা। পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর গোলাগুলি থামলেও সঙ্ঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
ইসরাইল তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ইরানের শাসনব্যবস্থা অটুট, তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও সচল। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়ে কেবল একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছে। লেবানন কার্যত এর বাইরে, পশ্চিমতীরে দখলদারি বাড়ছে, ফিলিস্তিন ইস্যু ক্রমেই আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রান্তে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ থেমেছে; কিন্তু সঙ্ঘাতের কাঠামো অটুট।
ইসরাইল : বাইরের যুদ্ধ, ভেতরের সঙ্কট
যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিধ্বনি এখন ইসরাইলের ভেতরেই একধরনের ‘নীরব যুদ্ধ’ হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বিরোধী মত দমন, পুলিশের ক্ষমতা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক চাপ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিসর সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শুধু সাময়িক নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি শাসন কৌশলের রূপ নিচ্ছে, যেখানে জরুরি অবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থার অংশে পরিণত হচ্ছে।
এর ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং নাগরিক স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কেবল নিরাপত্তা নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র : যুদ্ধ শেষে ইসরাইল কেমন রাষ্ট্রে পরিণত হবে? এটি কি আরো কেন্দ্রীভূত, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে যাবে, নাকি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে?
আমেরিকার ক্ষমতার সীমা : বাস্তবতার মুখোমুখি
এই সঙ্ঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র; কিন্তু আর সর্বশক্তিমান নয়। দীর্ঘ দিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার যে সক্ষমতা ওয়াশিংটনের ছিল, এই সঙ্ঘাতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মতো উচ্চাভিলাষী অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র একটি হিসাবি পশ্চাৎপসরণ বেছে নিয়েছে। এটি সরাসরি পরাজয় নয়; বরং বাস্তবতার স্বীকৃতি, যেখানে কৌশলগত সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বৃহত্তর ক্ষতি এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি কাজ করেছে। প্রথমত, ইরানকে শুধু অর্থনৈতিক চাপ বা সামরিক হুমকি দিয়ে নত করা সম্ভব নয়; দেশটি তার প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজেকে স্থিতিস্থাপক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। দ্বিতীয়ত, একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে- অর্থনৈতিক ব্যয়, সামরিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের সঙ্ঘাত দ্রুত বৈশ্বিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাবের কারণে।
এই তিনটি বাস্তব উপলব্ধিই যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করেছে। ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী; কিন্তু তার ক্ষমতার প্রয়োগ আর একমুখী বা সীমাহীন নয়; বরং তা ক্রমেই প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক ভারসাম্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
ইরান : স্থিতিস্থাপক শক্তির উত্থান
এই সঙ্ঘাতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ইরানের কৌশলগত ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরাসরি সামরিক বিজয় অর্জন না করেও তেহরান একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে, আধুনিক ভূরাজনীতিতে প্রতিরোধই একধরনের কার্যকর শক্তি, যা প্রতিপক্ষের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে।
ইরান এই সঙ্ঘাতকে একক যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বহুমাত্রিক আকার দিয়েছে। লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরাকে তাদের প্রভাব ও মিত্রগোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার মাধ্যমে সঙ্ঘাত বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধ একটি জটিল নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে, যেখানে কোনো একক ফ্রন্টে জয়লাভ করলেই সামগ্রিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
এই বহুমুখী কৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে একই সাথে বিভিন্ন দিক থেকে চাপ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এতে তাদের সামরিক সক্ষমতা ভাগ হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল হয়েছে এবং সঙ্ঘাতের ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই কৌশল কেবল সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করে কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানি ও বাণিজ্য রুটকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে স্পষ্ট হয়েছে- আধুনিক সঙ্ঘাতে জয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না; বরং কৌশল, ধৈর্য এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।
‘আউটসোর্সড নিরাপত্তা’ মডেলের পতন
শীতল যুদ্ধপরবর্তী সময়ে গালফ অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামো ছিল একধরনের অলিখিত সমঝোতার ওপর প্রতিষ্ঠিত- নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র, বিনিময়ে আরব দেশগুলো দেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক আনুগত্য। এই ‘আউটসোর্সড নিরাপত্তা’ মডেল বহু দশক আঞ্চলিক স্থিতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত সেই কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার উপলব্ধি করছে যে, ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং গালফ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সৃষ্ট এই অনিশ্চয়তার কারণে শুরু হয়েছে নতুন কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস। গালফ দেশগুলো এখন বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। একইভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথেও নতুন সমঝোতা ও ভারসাম্য তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি বহুমাত্রিক কূটনীতির যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমে আসছে। এই নতুন বাস্তবতায় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতি- সবই আরো জটিল, গতিশীল এবং বহুমুখী হয়ে উঠছে।
ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা : সামরিক শক্তির সীমা
দীর্ঘ দিন ধরে ইসরাইল তার উন্নত সামরিক সক্ষমতা ও দ্রুত আঘাত হানার কৌশলের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রেখেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতে সেই ধারণা গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ইরানের প্রভাব কমানো দূরের কথা, দীর্ঘমেয়াদে ইরানকে মোকাবেলার পথও স্পষ্ট হয়নি। এটি একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্রথমত, শুধু সামরিক শক্তি আর যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি আঞ্চলিক জোট, প্রক্সি শক্তি এবং কৌশলগত ধৈর্যের মাধ্যমে বহুমাত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বাস্তবতা বদলে গেছে; এখন শুধু বিমান হামলা বা সীমিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লক্ষ্যপূরণ করা কঠিন।
এই নতুন বাস্তবতায় ইরান একটি স্থায়ী ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি উপেক্ষা করা বা সরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এর ফলে ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতি এবং সামরিক কৌশলকে নতুন করে ভাবতে হবে, যেখানে শুধু শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং কূটনীতি, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।
ভবিষ্যতের তিন দৃশ্যপট : কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য?
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট সামনে আসে- যার প্রত্যেকটি গালফ অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামোকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ক. দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি : মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বোঝার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, যেখানে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন রূপ নিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইরান ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ওপর তার প্রভাবের কারণে। ইরান যদি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই রুটের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে। এর ফলে গালফ অঞ্চলের নিরাপত্তা আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর থাকবে না; বরং একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে, যেখানে ইরানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে।
খ. পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ : পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যপট। এমন একটি যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সঙ্কটে পড়বে। একই সাথে এই সঙ্ঘাত বড় শক্তিগুলোর সরাসরি জড়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে দ্রুত বৈশ্বিক সঙ্ঘাতে রূপান্তরিত করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
গ. দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার সংঘর্ষ : তবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার সংঘর্ষ, যা ধীরে ধীরে ‘নতুন স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই মডেলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হবে না, আবার সম্পূর্ণ শান্তিও প্রতিষ্ঠা হবে না; বরং মাঝে মধ্যে সীমিত হামলা, পাল্টা হামলা এবং সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, আবার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
এ ধরনের সঙ্ঘাতকে বলা যায়, ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা’- যেখানে সঙ্ঘাত কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না; বরং ক্রমাগত রূপ বদলায়। এতে জড়িত পক্ষগুলো সরাসরি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়েও নিজেদের প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে, যতক্ষণ না তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত সঙ্কট তৈরি করছে।
সবমিলিয়ে, গালফ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আর একক কোনো পথে নির্ধারিত হবে না; বরং এই তিনটি সম্ভাবনার মধ্যেই একটি গতিশীল ভারসাম্য তৈরি হবে, যেখানে শক্তি, কৌশল এবং বাস্তবতার সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাকাঠামো নির্ধারণ করবে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা : একমেরু থেকে বহুমেরু
এই সঙ্ঘাতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে একমেরু অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে একটি বহুমেরু শক্তির ভারসাম্যের দিকে, যেখানে একাধিক রাষ্ট্র সমান্তরালভাবে প্রভাব বিস্তার করছে।
শীতল যুদ্ধপরবর্তী যুগে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় একক আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ওয়াশিংটন বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা পালন করত। বর্তমান বাস্তবতায় সেই একচ্ছত্র অবস্থান আর আগের মতো অটুট নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো একটি প্রধান শক্তি; কিন্তু একমাত্র নির্ধারক নয়।
এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে তার প্রভাব বিস্তার করেছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও সামরিক সক্ষমতায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। একই সাথে তুরস্ক, ইরান, ভারতসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিও নিজ নিজ অঞ্চলে প্রভাব বাড়াচ্ছে।
ফলে বিশ্ব এখন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা একক কোনো কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয় না; বরং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা, সমঝোতা এবং কৌশলগত ভারসাম্যের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি বিশ্ব
গোলাগুলি থেমে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের প্রকৃতি বদলে গেছে- এখন এটি সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্তরে আরো গভীরভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্তর্নিহিত উত্তেজনা বহাল রয়েছে এবং আরো জটিল হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইসরাইল, ইরান এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিজেদের অবস্থান নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হচ্ছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তিও তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পুনর্বিন্যাস আনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক জোটগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে পুরনো আনুগত্যের পরিবর্তে নতুন স্বার্থভিত্তিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, স্থায়ী শান্তির প্রশ্ন। যতক্ষণ না ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়, ততক্ষণ এই অঞ্চলে প্রকৃত স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন। কেবল যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক সমঝোতা নয়; বরং ন্যায্য রাজনৈতিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র ভিত্তি হতে পারে।
এই নতুন বাস্তবতা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শক্তির ভারসাম্য, রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং ন্যায়ের প্রশ্নের সমন্বয়ে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]



