যখন সারা দেশের হাজারো মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠে ভেসে আসছে চিরন্তন সেই আহ্বান, আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম, ঠিক সেই ভোর ৬টার নিস্পন্দ প্রহরেই প্রকৃতির সব স্তব্ধতা ভেঙে একটি সংবাদ চাউর হলো। বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ সফরের যতি টেনে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন এক অনন্ত অসীমের পথে।
ভোরের শীতল হাওয়া যেন হঠাৎ আরও ভারী হয়ে উঠল। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা মুনাজাতের সুর আর মানুষের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। যে মানুষটি চার দশক ধরে এ দেশের মানুষের আবেগ আর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তিনি আজ জগতের সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। সব মায়া ও পার্থিব লড়াই ছাপিয়ে তিনি আজ চলে গেছেন এমন এক দেশে, যেখানে কোনো কাঁটাতার বা কারাপ্রাচীর নেই।
মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য, কিন্তু কিছু প্রস্থান কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষের বিদায় হয়ে থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি ইতিহাসের মহাপ্রস্থান বা একটি মহাকালের অবসান। কোনো কোনো মানুষের জীবন এমনভাবে একটি জাতির উত্থান, পতন, সংগ্রাম আর আবেগের সাথে জড়িয়ে যায় যে তাদের মৃত্যু মানে কেবল একটি হৃদস্পন্দনের থেমে যাওয়া নয়। এটি আসলে একটি গোটা সময়কালের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তার সময়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গত চার দশকে এ দেশের ধূলিকণা থেকে শুরু করে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখর পর্যন্ত তার যে পদচারণা, তা আজ এক ধূলিধূসর পাণ্ডুলিপির শেষ পাতায় গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের চোখের সামনে আজ স্মৃতির মিছিল। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে সেনানিবাসের অন্দরমহল, তারপর রাজপথের উত্তাল স্লোগান এবং শেষে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তার আরোহণ। এই যাত্রাটি মসৃণ ছিল না। ছিল কাঁটা বিছানো এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ। তার স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিলেন রাজনীতি থেকে এই পরিবারের চিহ্ন মুছে যাবে। কিন্তু ঠিক তখনই এক শান্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চেহারার উদয় হয়েছিল। তিনি খালেদা জিয়া। সেই শুরু। তারপর থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনিবার্য ধ্রুবতারা। কখনো তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকেছেন এবং কখনো তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের নীতিনির্ধারণ করেছেন। আবার কখনো তাকে দেখা গেছে কারান্তরালে, নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে।
রাজনীতির এই ধূসর পাণ্ডুলিপিটি যখন আমরা ওল্টাতে শুরু করি, সেখানে কোনো রাজকীয় অভিষেক দেখি না। সেখানে আমরা দেখি এক গভীর শোকের ছায়া। ১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর গোটা দেশ যখন স্তম্ভিত, তখন তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া ছিলেন কেবলই শোকাতুর এক জননী। কিন্তু মহাকাল তার জন্য অন্য এক ভাগ্য লিখে রেখেছিল। সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির মতো একটি বিশাল দলকে টিকিয়ে রাখার দায় এসে পড়ে তার কাঁধে। ঘরোয়া গৃহবধূ থেকে জনসভার মঞ্চে আসার এই রূপান্তরটি ছিল অবিশ্বাস্য। কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারলেন, তা আজকের দিনে সমাজতাত্তি¡ক গবেষণার বিষয় হতে পারে।
এই পথচলাতেই জন্ম নেয় সেই অমর বিশেষণ অর্থাৎ আপসহীন। আশির দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন রাজপথ প্রকম্পিত হতো স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগানে, তখন তিনি ছিলেন এক অটল হিমালয়ের মতো। ক্ষমতার প্রলোভন কিংবা জেল ও জুলুমের ভয় তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ নয় বছর তিনি কেবল মাঠের রাজনীতিই করেননি। তিনি মানুষের হৃদয়ে এক অজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন। আমরা দেখেছি কিভাবে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি জাতিকে একতাবদ্ধ করার কৃতিত্ব তার প্রাপ্য। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যখন তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন তা কেবল একটি দলের বিজয় ছিল না। সেটি ছিল একজন নারীর অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার তিনটি মেয়াদ ছিল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত এবং সামাজিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসার এবং গ্রামবাংলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তার নেয়া পদক্ষেপগুলো আজও দৃশ্যমান। তবে এই ক্ষমতার গদি সবসময় কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না।
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন তাকে সপরিবারে কারারুদ্ধ করা হয়, তখন থেকেই তার জীবনের পাণ্ডুলিপিতে নতুন এক বিষণœ অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেলেও জীবনের শেষ ১৫ বছর তার জন্য ছিল নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষার নামান্তর। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যখন তিনি আবারও কারাগারে গেলেন, তখন তার বয়স এবং শারীরিক অবস্থা কোনোটিই অনুকূলে ছিল না। নাজিমুদ্দিন রোডের সেই পুরনো জীর্ণ কারাগারের নির্জন কক্ষে তিনি যে নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছেন, তা কল্পনা করলে শিউরে উঠতে হয়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যিনি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন, তার জন্য সেই নির্জনতা ছিল এক চরম নিষ্ঠুরতা।
২০২০ সালের পর থেকে তিনি যখন গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় গৃহবন্দী বা কার্যত অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন, তখন থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের প্রদীপটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে শুরু করে। রাজনীতি থেকে তিনি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কিন্তু মানুষের মন থেকে তার নাম মুছে যায়নি। বড় ছেলে সুদূর প্রবাসে এবং ছোট ছেলে কবরে। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় নির্বাসন আর কী হতে পারে? এই নিঃসঙ্গতা কোনো আদালতের দেয়া সাজা নয়। এ ছিল নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস। তার এই বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় মনস্তত্তে¡র এক গভীর ক্ষতের উন্মোচন।
গত কয়েক বছরে হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তিনি যখন লড়াই করছিলেন, তখন বাইরে বইছিল সময়ের অন্য এক হাওয়া। ক্ষমতার দাপট আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে আমরা হয়তো ভুলে গিয়েছিলাম যে এই মানুষটি কেবল একটি দলের প্রধান ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই মাটির সাধারণ মানুষের এক বিশাল অংশের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। তার চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই আশ্রয়ের ছায়াটিও আজ দীর্ঘতর হয়ে মিলিয়ে গেল।
বিবেকের আদালতে দাঁড়ালে আজ একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। আমরা কি তার প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি? যে নারী জীবনের বেশির ভাগ ব্যয় করেছেন এই দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, তার শেষ দিনগুলো কি আরো একটু মর্যাদাপূর্ণ হতে পারত না? রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার যে হাত বাড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল, সেখানে আমাদের দৈন্য আজ ইতিহাসের পাতায় বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকবে। তিনি যখন জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিদেশের উন্নত চিকিৎসার জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন, তখন আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যে অনমনীয় রূপ ফুটে উঠেছিল, তা সভ্য সমাজের জন্য সুখকর উদাহরণ নয়। ইতিহাসের বিচার বড় কঠিন। আজ যারা নীরব, কাল হয়তো তারাই এই বঞ্চনার গল্পগুলো লিখবেন অন্য কোনো কালিতে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল জাতীয়তাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন এ দেশের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং মাথা উঁচু করে বাঁচবে। এই চেতনার মূলে ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি তার গভীর অনুরাগ। তার শাসনকালে যখন গ্রামের কোনো অজপাড়াগাঁয়ে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু হয়েছিল, তখন তিনি কেবল সাক্ষরতার হার বাড়াতে চাননি বরং তিনি চেয়েছিলেন একটি প্রজন্মের মেরুদণ্ড শক্ত করতে। আজ যখন সেই প্রজন্মের মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা হয়তো সরাসরি তার নাম নেয় না, কিন্তু তাদের সাফল্যের মূলে ওই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ছোঁয়া রয়ে গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হারিয়েছেন অনেক। স্বামীর অকাল মৃত্যু, নিজের সন্তানদের নির্বাসন এবং ছোট ছেলের কফিন যখন তার সামনে এলো, তখন তিনি যে স্থিরতা দেখিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইতিহাসের পাতায় তার মূল্যায়ন হয়তো হবে নানাভাবে। কেউ তাকে দেখবেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এবং কেউ হয়তো তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবেন। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তার যে সহনশীলতা এবং আপসহীন মনোভাব, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি এমন এক সময়ে আমাদের ছেড়ে গেলেন যখন দেশ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। তার চলে যাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত আমাদের কাউকেই বিজয়ী করে না। এটি বরং আমাদের ইতিহাসকে আরও বেশি ধূসর আর কলঙ্কিত করে তোলে।
মহাকাল এখন তার জন্য অপেক্ষা করছে। যে পাণ্ডুলিপিটি আজ ধূসর হয়ে গেছে, তা এখন ইতিহাসের আর্কাইভে জমা হবে। আগামী প্রজন্ম যখন এই সময়কার ইতিহাস পড়বে, তারা দেখবে একজন নারী কিভাবে এক হাতে সংসার এবং অন্য হাতে একটি দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তারা পড়বে তার সেই নিঃসঙ্গ দিনগুলোর কথা যখন জানালার ওপারে কেবল মেঘলা আকাশ ছাড়া আর কেউ ছিল না তার সাথে কথা বলার। তার জীবনের প্রতিটি ভাঁজ থেকে আগামীর প্রজন্ম খুঁজে পাবে সংগ্রামের প্রেরণা এবং ত্যাগের মাহাত্ম্য। তিনি এখন সব হিসাব ও নিকাশের ঊর্ধ্বে। মহাকাল আজ তার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে আমাদের এই বার্তাই দিয়ে গেল যে মানুষ নশ্বর কিন্তু মানুষের সম্মান ও মর্যাদাবোধ অবিনশ্বর। মহাকাল আজ তাকে সেই সব পাথরচাপা কষ্ট থেকে মুক্তি দিলো। ধূসর পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠায় আজ রক্তের অক্ষরে নয় বরং চোখের জলের কালিতে লেখা হলো যে মা বিদায় নিলেন।
মহাকাল কাউকে কেড়ে নেয় না বরং কাউকে কাউকে নিজের বুকের ভেতর আগলে রাখে চিরকালের জন্য। বেগম খালেদা জিয়া আজ সেই ইতিহাসের অক্ষয় ভাণ্ডারে প্রবেশ করলেন।
রক্ত ও মাংসের মানুষটির বিদায় হলেও যে আদর্শ আর অদম্য সাহসের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি এই চার দশক পথ চলেছেন, তা তাকে সমসাময়িক রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অবিনশ্বর উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে, যখনই কোনো নারী তার অধিকারের লড়াই করবে কিংবা কোনো জাতি তার গণতন্ত্রের পথ খুঁজবে, তখনই এই কিংবদন্তির পদচিহ্নগুলো আলো হয়ে জ্বলবে। বেগম খালেদা জিয়া আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি আজ এক অবিনাশী ইতিহাসের নাম।
লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট



