মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন

যিনি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং যাকে বার্তা পাঠানো হয়েছে দু’পক্ষের কথার মধ্যে গরমিল রয়েছে। প্রেরণকারী বলছেন ওয়্যারলেসে বার্তা পাঠানো হয়েছে, আর গ্রহণকারী বলছেন টেলিফোনে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাদের কথার এ গরমিলে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয় যে, আদৌ কি কোনো বার্তা পাঠানো হয়েছিল

আওয়ামী লীগ ও দলটির সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ১৯৭২ সাল থেকে দাবি করে আসছেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার আগে ইপিআর অর্থাৎ— ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, শেখ মুজিব ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ সভাপতি জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ওই ঘোষণা পাঠান।

২০১৬ সালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইপিআর (বর্তমান বিজিবি)’ প্রকাশ করা হয়। ওই বইটিতে ‘ইপিআরের ওয়্যারলেসযোগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচার’ শীর্ষক একটি অংশে লেখা হয়েছে, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী আরেফসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা পিলখানার ২ নম্বর গেটে তৎকালীন ইপিআরের সুবেদার মেজর সিগন্যাল (পরবর্তীতে শহীদ) শওকত আলীর কাছে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হস্তান্তর করেন। শওকত আলী বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা তার পিলখানার ইপিআরের ওয়্যারলেসযোগে টেলিগ্রাফিক মেসেজের মাধ্যমে কোম্পানি হেডকোয়ার্টার, চট্টগ্রামে সিগন্যালম্যান মো: আবুল খায়েরের কাছে পাঠান। বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম নস্যাৎ করার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতাকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতারের আগে অর্থাৎ— ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু তার ঘোষণায় বলেন, ‘This may be my last message, from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier to the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved’ ইপিআর সিগন্যাল সেন্টার, চট্টগ্রামে বার্তাটি গৃহীত হয়। সিগন্যালম্যান আবুল খায়ের চট্টগ্রাম ইপিআর এর বাঙালি অ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রফিককে তা হস্তান্তর করেন।’ (পৃষ্ঠা-১৫ ও ১৬)

বিজিবির দেয়া তথ্যমতে, স্বাধীনতার ওই ঘোষণার সাথে যে কয়জন লোকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তারা হচ্ছেন— কাজী আরেফ, সুবেদার মেজর শওকত আলী, সিগন্যালম্যান আবুল খায়ের ও ইপিআরের তৎকালীন ক্যাপ্টেন রফিক। কাজী আরেফ সে সময় ছিলেন স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের তিন শীর্ষ নেতার একজন। তিনি তার ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইয়ে ওই ধরনের কোনো ঘটনার উল্লেখ করেননি। তিনি লিখেছেন, ২৫ মার্চ ’৭১ সাল। রাত তখন ১১টা। আমি আর মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি) পলাশীর পশ্চিম পাশে আজিমপুর কলোনির একটি বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আশ্রয় নিলাম। বাসাটি সংগঠনের তৎকালীন ছাত্রলীগ কর্মী শিরীন আক্তারদের (পরে ছাত্রলীগ সভাপতি)। তার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী। এরই মধ্যে চতুর্দিক থেকে গোলাগুলির শব্দ আসছে। মর্টার শেলিং, মেশিনগান ও এলএমজির ব্রাশ ফায়ারের শব্দ। ভারী ট্যাংক চলার শব্দ। দু’-একটি পাল্টা বন্দুক বা ২২ বোরের রাইফেলের গুলির শব্দ। মানুষের গগন ফাটানো আর্তচিৎকার ও দূর থেকে ভেসে আসা ‘জয়বাংলা’ স্লোগান শোনা যাচ্ছে। একটু পরে পশ্চিম দিকে পিলখানার ইপিআর হেডকোয়ার্টারে ভয়াবহ আক্রমণের আওয়াজ কানে আসতে লাগল। মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে গোলাগুলি, মানুষের মৃত্যু যন্ত্রণার আর্তনাদ আর স্লোগানের আওয়াজ শুনছি। রাত ২টার পর পিলখানার গোলাগুলির আওয়াজ কমে গেল। বুঝলাম হানাদার বাহিনীর লোকেরা ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের হত্যা অথবা বন্দী করে হেডকোয়ার্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। (পৃষ্ঠা-১১৬-১১৮)

কাজী আরেফের লেখা থেকে বোঝা যায়, ইপিআর এর কোনো লোকের কাছে তিনি কোনো কিছু হস্তান্তর করেননি। করলে তিনি নিশ্চয় তা লিখতেন। কারণ ক্রেডিট নিতে কে না চান। মজার ব্যাপার হলো, মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘২৬-২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান শুনলাম।’ (পৃষ্ঠা-১২৮)

ইপিআরের তৎকালীন ক্যাপ্টেন যিনি পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম নামে খ্যাতি লাভ করেন, তিনি তার বই ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ ওই ধরনের কোনো ঘটনার উল্লেখ করেননি। পিলখানার ২৫ মার্চের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই ইপিআরের সমস্ত সৈন্য অস্ত্রাগারে তাদের সব অস্ত্র, গোলাবারুদ জমা দিয়ে ফেলল। আর এদিকে ২২ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা গোপনে ইপিআর সিগন্যাল কমিউনিকেশন সেন্টার দখল করে নিলো এবং সেখানে দায়িত্বে নিয়োজিত করল অবাঙালি বেতার কর্মীদের। ২২ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা সবগুলো গেটের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করল এবং কাউকে পিলখানার ভেতরে যেতে এবং বাইরে আসতে দিচ্ছিল না।’ (পৃষ্ঠা-৯২)

তিনি আরো লিখেন, ‘সেদিন (২৫ মার্চ) বিকেলবেলা আরো একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল, চট্টগ্রামে ইপিআরের যে দুটো সেটের মাধ্যমে আমরা ঢাকায় ইপিআর হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলাম; সে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। আমরা ঢাকার সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। এমন ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি।’ (পৃষ্ঠা-৯৪)

এখন এ প্রশ্ন স্বাভাবিক, যেখানে ইপিআরের ঢাকাস্থ সিগন্যাল সেন্টার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে এবং বিকেল থেকে চট্টগ্রামের সাথে ঢাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সেখানে রাতের বেলা কিভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠানো সম্ভব?

ইপিআরের ওয়্যারলেস সম্পর্কিত আরেকটি তথ্য পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি এইচটি ইমামের লেখা থেকে। এইচটি ইমাম অবসর-পরবর্তী জীবনে আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পিলখানা ও রাজারবাগে আকস্মিক আক্রমণের সময় পুলিশ/ইপিআর রেডিওতে উভয় স্থানের বাঙালিদের যে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে আদেশ করছিল, আমরা রাঙ্গামাটিতে বসে পুরোপুরি শুনেছিলাম। একই সাথে অবিরাম গোলাগুলির আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছিল। এ থেকেই আমরা প্রথম আক্রমণের প্রচণ্ডতা বুঝতে পারি।’ (পৃষ্ঠা-৩৪)

মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এইচটি ইমাম যদি পুলিশ বা ইপিআরের ওয়্যারলেসে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে পেতেন তাহলে নিশ্চয়ই তা লিখতেন; লুকাতেন না।

১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জানিয়েছিলেন, ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা শুরু করার পর তিনি ওয়্যারলেস চট্টগ্রামে এই বলে সিগন্যাল পাঠিয়েছিলেন, বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই খবর প্রত্যেককে পৌঁছিয়ে দেয়া হোক, যাতে প্রতিটি থানায়, মহকুমায়, জেলায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে।

এদিকে ‘গণ-মানুষের নেতা, জহুর আহমদ চৌধুরী’ শীর্ষক স্মারক গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে, শেখ মুজিব তার এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে টেলিফোনে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, এ গ্রন্থে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন; কিন্তু সে সময় এই ঘোষণার কথা দেশবাসীকে জানানোর কোনো উপায় ছিল না। তার টেলিফোন সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় নিকটতম এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি ঘোষণাটি চট্টগ্রামে দলের শীর্ষনেতা, তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু, বিশ্বস্ত সহকর্মী জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে পাঠান।

জহুর আহমদ চৌধুরীর দামপাড়া পল্টন রোডের বাসার টেলিফোনে (নং ৮০৭৮৫) রাত সাড়ে ১১টায় ঐতিহাসিক ঘোষণার সংবাদটি আসে। তার স্ত্রী ডা: নুরুন নাহার জহুর তা লিখে নেন। তারপর সেই ঘোষণার অজস্র সাইক্লোস্টাইল করা কপি শহরময় বিলি ও মাইকে প্রচার করা হয়। একই ঘোষণা ওয়্যারলেস সংযোগেও আসে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত বিদেশী জাহাজের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।’

এখন দেখা যাচ্ছে, যিনি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং যাকে বার্তা পাঠানো হয়েছে দু’পক্ষের কথার মধ্যে গরমিল রয়েছে। প্রেরণকারী বলছেন ওয়্যারলেসে বার্তা পাঠানো হয়েছে, আর গ্রহণকারী বলছেন টেলিফোনে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাদের কথার এ গরমিলে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয় যে, আদৌ কি কোনো বার্তা পাঠানো হয়েছিল?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক