ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি, যা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন নিশ্চিত হলে ব্যাংক খাত কার্যকরভাবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আনে। ব্যাংকগুলো সুশাসিত হলে আমানতকারীরা নিরাপদ বোধ করেন। একই সাথে দেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী হয়।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি ও তদারকি জোরদারের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আইনি ব্যবস্থা কঠোর করা প্রয়োজন। বিগত সময়ে ব্যাংক খাতে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থপাচারের মূলে রয়েছে সুশাসনের অভাব ও দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব। স্বৈরাচারী সরকারের মদদে খেলাপি ঋণ যেমন বেড়েছে, তেমনি অর্থ লোপাটের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে। তৈরি হয়েছে শূন্যতা। গ্রাহকের মধ্যে দেখা দিয়েছিল আস্থাহীনতা। যার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার যদি ব্যাংক খাতের সংস্কারগুলো চালিয়ে নিয়ে গতিশীল না করে এবং বিগত সময়ের মাফিয়াদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে; তাহলে দেশের অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে আবার গভীর গর্তে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুশাসনের বিকল্প নেই।
সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৩— এই ১৫ বছরে ২৪টি বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আত্মসাতের অর্থের পরিমাণ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশ বা জিডিপির ২ শতাংশের সমান। সিপিডি মনে করে, ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা আনতে একটি সুনির্দিষ্ট, সময়োপযোগী, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন জরুরি। গত ১৬ বছরে ব্যাংক খাতে যে লুটতরাজ ও অর্থপাচার ও অনিয়ম হয়েছে, তার মূল কারণ সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে যে ভয়াবহ লুটতরাজ হয়েছে তা নজিরবিহীন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত এস আলম নামে এক শিল্পগোষ্ঠী একে একে আটটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলে নেয়। গ্রুপটি রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকগুলো দখলে নেয়। ব্যাংকগুলো দখলে নিয়ে নামে-বেনামে ভুয়া ডকুমেন্ট দেখিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে ইসলামী ব্যাংক থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৫ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়। এভাবে ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দুই লাখ ২৫ হাজার ২৯ কোটি টাকা নামে-বেনামে বের করে নেয়।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দেশের সবচেয়ে বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক। ২০২৩-২৪ সালের পর থেকে সুশাসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়ায় ব্যাংকটি ১.৮৩ লাখ কোটি টাকার বেশি আমানতের মাইলফলক অর্জন করে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগিতা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু সংস্কার কর্মসূচিতে এ ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়ে এখনো শীর্ষে আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে ব্যাংকটি নিয়ে আবার আগের লুটেরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অপচেষ্টা করছে। নতুন করে আলোচনায় চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর সম্ভাব্য পুনঃপ্রবেশের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই পুনঃপ্রবেশ যদি বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তা হলে ইসলামী ব্যাংকের জন্য তা হতে পারে আরেকটি বড় ধাক্কা। এ ধরনের অশনি সঙ্কেতে পুরো ব্যাংক খাত আবারো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি : বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার পদক্ষেপ নেয়। এখন এ পদক্ষেপের বাকি কাজটুকু এগিয়ে নিয়ে গ্রাহকদের কল্যাণ ও ব্যাংক খাতের প্রাণসঞ্চার করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা : বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংক খাতের সার্বিক দুরবস্থায় সুশাসনের ঘাটতি অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের শীর্ষ মহলের যোগসাজশ ব্যাংক খাতে ভয়াবহ দুর্নীতির ঘটনাতে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছে। এ খাতের ভঙ্গুরতার পেছনে দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থা, বিধিবিধান অমান্য করা, অকার্যকর তদারকি এবং ব্যাংক মালিকদের অতিরিক্ত প্রভাবও কম দায়ী নয়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাংকগুলো গ্রহণযোগ্য করপোরেট সুশাসনের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়নি। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি হ্রাস ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা।
খেলাপি ঋণ আদায়/নিয়ন্ত্রণ : ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ঋণখেলাপি হওয়ার পথ রুদ্ধ করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের পুনঃতফসিল ও নবায়নে ব্যাংকের নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করতে হবে। এ খাতে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি ও স্বচ্ছতার অভাব প্রকট। চলমান প্রথা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর প্রতি নজরদারি ও জবাবদিহি ছাড়া বড় ঋণ পেতে বেশি সুযোগ করিয়ে দেয়ায় খেলাপি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও ব্যাপক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সাথে এই উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গত অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া বিস্তারিত সংস্কারের পথনকশা প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিল। তা কার্যকর ও বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ রোধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইউনিটের ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করাও বাঞ্ছনীয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির মতে— বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে জাতীয় বাজেটের প্রায় সমান, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। সিপিডি এ তথ্য তুলে ধরে ব্যাংক খাতের সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দুর্নীতি হ্রাসে পদক্ষেপ : দুর্নীতি থাকলে সুশাসন সম্ভব নয়। আবার দুর্নীতি রোধ করতে সুশাসন থাকা চাই। আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দুর্নীতির মহোৎসব দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে। দুর্নীতি রোধে অর্থপাচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মহাজনি ঋণ, জালিয়াতি বা সুপারিশভিত্তিক ঋণ বন্ধ করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা (যেমন— ক্রেডিট স্কোরিং) চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
দুর্নীতির সাথে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা, ঋণগ্রহীতা বা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক, যার মধ্যে জরিমানা, চাকরিচ্যুতি ও আইনি পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার



