একটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থানান্তর

সাঈদ আহসান খালিদ
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে সাতকানিয়া উপজেলা সদরে স্থানান্তর-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনকে সারা দেশ এবং চট্টগ্রামের অধিকাংশ আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও আপামর জনগণ বিপুলভাবে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে চট্টগ্রামের আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকে এসব আপত্তি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

জেলা সদর থেকে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থানান্তর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন, যার অভিঘাত বহুমাত্রিক হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো— এই পরিবর্তন ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রগতিশীল নাকি পশ্চাদমুখী? এতে প্রকৃত উপকারভোগী কারা, আর কারা তুলনামূলক অসুবিধার সম্মুখীন হবেন? এবং উত্থাপিত অসুবিধাগুলো কতটা যুক্তিসঙ্গত? উত্থাপিত আপত্তিগুলো বিশ্লেষণপূর্বক পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপ—

হাজতি আসামির ভোগান্তি : চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাতকানিয়ায় হাজতি আসামি পরিবহন নতুন কোনো বিষয় নয়। আন্তঃজেলা এমনকি আন্তঃবিভাগ কয়েদি পরিবহন দেশের নিয়মিত প্রশাসনিক বাস্তবতা। বর্তমানে বহু জেলা ও উপজেলায় আদালত অবস্থিত, যেখান থেকে সমপরিমাণ বা আরো দীর্ঘ দূরত্বে হাজতি আসামি আনা-নেয়া নৈমিত্তিক ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বই হলো নিরাপদ ও মানবিক পরিবহন নিশ্চিত করা। যদি কেবল দূরত্বকেই প্রধান সমস্যা ধরা হয়, তবে দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা আদালতের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

মূল প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্র কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার অজুহাতে নাগরিকের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সঙ্কুুচিত করতে পারে? উত্তর স্পষ্টতই না; বরং ফরিয়াদি ও আসামির ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করাই মানবাধিকারের মৌলিক দাবি। সুতরাং হাজতি পরিবহন কীভাবে আরো দ্রুত, নিরাপদ ও মানবিক করা যায়— আলোচনা হওয়া উচিত সেই দিকে।

আত্মসমর্পণকারী আসামির প্রসঙ্গ : আইনের দৃষ্টিতে আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্য হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়া, নির্দিষ্ট কোনো কারাগারে থাকার সুবিধা ভোগ করা নয়। জামিন না হলে কারাগারে প্রেরণ আইনগত পরিণতি; এটি কোনো শাস্তিমূলক হয়রানি নয়। বাস্তবে আদালত নিকটবর্তী হলে আত্মসমর্পণের প্রবণতা বরং বাড়ে, উপজেলা আদালতের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ।

দুর্নীতি ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ : উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থানান্তর হলে দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেন বাড়বে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো— ঘুষ ও দুর্নীতি দেশের সেবা খাতগুলোর একটি কাঠামোগত সমস্যা। এর সাথে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই; বরং সম্পর্ক রয়েছে ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা ও তদারকির সাথে।

চট্টগ্রাম জেলা আদালত কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক অফিস-আদালতগুলো কি দুর্নীতিমুক্ত? বাস্তবে দেখা যায়, শহরকেন্দ্রিক আদালতগুলোতে দুর্নীতির পরিমাণ ও ঘনত্ব উভয়ই বেশি। টাউট দমনে ব্যর্থতার দায় আদালতের আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়।

বরং জেলা সদরকেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থায় মামলা পরিচালনার ব্যয়-যাতায়াত, থাকা, আইনজীবী ফি ও সাক্ষী হাজিরা— অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহু গুণ বেশি। উপজেলা সদরে আদালত থাকলে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, ফলে বিচারপ্রার্থীর সামগ্রিক আর্থিক বোঝা হ্রাস পায়।

স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা : এই আশঙ্কা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগটি সত্য হলে দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিচারব্যবস্থা এত দিনে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ত। বাস্তবে, নিম্ন আদালতের বিচারকরা দেশের অন্যান্য সরকারি সংস্থার তুলনায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে স্বাধীনভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিশেষ কিছু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় নির্বাহী বিভাগের চাপ থাকতে পারে। তবে এ ধরনের চাপ সাধারণত টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায় ঘটে, আঞ্চলিক বা বটম-আপ প্রভাব হিসেবে নয়। এমনকি অতীতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও নির্বাহী হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছেন, যা প্রমাণ করে— সমস্যাটি আদালতের ভৌগোলিক অবস্থান নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

নথিজনিত জটিলতা ও ‘মিস কেস’ সমস্যা : মিস কেস, নথি তলব, বেইলবন্ড ও জেলখানা সমন্বয় সংক্রান্ত জটিলতা দূরত্বজনিত নয়; এগুলো মূলত দুর্বল প্রশাসনিক সমন্বয়, ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব এবং দায়িত্বহীনতার ফল। পটিয়া, বাঁশখালী বা সন্দ্বীপের অভিজ্ঞতা যদি তিক্ত হয়ে থাকে, তবে তার শিক্ষা হওয়া উচিত উন্নত পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি— আদালত বিকেন্দ্রীকরণ বাতিল নয়।

আইনজীবীদের পেশাগত অসুবিধা : একই দিনে একাধিক আদালতে মামলা থাকার বিষয়টি আইনজীবীর পেশাগত সময় ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন; এটি রাষ্ট্রের বিচার কাঠামো নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না। বিচারব্যবস্থা আইনজীবীর সুবিধার জন্য নয়, বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। আইন পেশা স্বাধীন। কোন আইনজীবী কোথায় পেশা পরিচালনা করবেন, এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিচারপ্রার্থীর নিকটবর্তী আদালতে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।

মুন্সি-নির্ভরতা ও দক্ষ আইনজীবীর অভাব : এটি আদালত বিকেন্দ্রীকরণের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে বিচারব্যবস্থা জেলা শহরে কেন্দ্রীভূত থাকার পরিণতি। উপজেলা পর্যায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা হলে বরং স্থানীয় আইনজীবীদের দক্ষতা ও বিচারিক মান বৃদ্ধি পায়— যা অতীত অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।

দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর শত শত শিক্ষার্থী আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আইন পেশায় যুক্ত হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিকেন্দ্রীকরণ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণ মেধাবী আইনজীবীরা নিজ উপজেলার আদালতমুখী হবে। মুন্সি-নির্ভর আইন পেশার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা তখন আর থাকবে না। বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় আইনজীবীদের পেশাগত বিকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচারব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক।

সাতকানিয়া আদালতের অবকাঠামো সমস্যা : এই সমস্যা বাস্তব হলেও সমাধান প্রক্রিয়া চলমান। সাতকানিয়ায় দু’টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্মাণে এক কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং রেকর্ড রুম নির্মাণে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সংস্কার ও নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যান্য লজিস্টিক্যাল সমস্যার সমাধানও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, বাজেট বরাদ্দ ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টের সাথে তুলনার অসঙ্গতি : ‘চট্টগ্রাম থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারলে সাতকানিয়ার মানুষ ৬১ কিলোমিটার যেতে পারবে না কেন’ এমন যুক্তি ভ্রান্ত। সুপ্রিম কোর্ট একটি কেন্দ্রীয় ও ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। সেখানে যাওয়া দৈনন্দিন নয়, বিশেষ পরিস্থিতিনির্ভর। অপর দিকে, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রথম ও প্রধান প্রবেশদ্বার। একজন দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতিদিনের বিচারিক কার্যক্রম ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্রীভূত রাখা ন্যায়বিচারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির পরিপন্থী।

শেষ কথা হচ্ছে, উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিকেন্দ্রীকরণ কোনো ‘রোমান্টিক চিন্তা’ নয়। এটি আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের প্রবেশগম্যতা এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও উপজেলা পর্যায়ে সিভিল ও ক্রিমিনাল কোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে— যাতে রাজনৈতিক ঐকমত্যও গড়ে উঠেছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থানান্তর সেই সংস্কার প্রক্রিয়ারই একটি বাস্তব পদক্ষেপ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়