মো: শাহাদত হোসেন
শেখ হাসিনার পতনকে যেসব ঘটনা ত্বরান্বিত করেছে, সেগুলোর মধ্যে গণভবনে দেয়া শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের বাচ্চা’ শব্দযুগল স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে; কিন্তু রাজাকার বা রাজাকারের বাচ্চা বলায় আন্দোলনকারীরা এত দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল কেন?
কারণটি হলো— ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার দুঃশাসন দীর্ঘায়িত করার জন্য বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে হেনস্তা করত, ক্ষেত্রবিশেষে হত্যাযোগ্য করে তুলত।
অথচ তার আমলে তৈরি করা রাজাকারের তালিকা থেকে দেখা যায়, তার নিজের দলেই সর্বাধিক সংখ্যক রাজাকার। শুধু তাই নয়, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে রাজাকার। তার উপদেষ্টা পরিষদে রাজাকার। কিন্তু নিজের দল, আত্মীয় ও উপদেষ্টা রাজাকারদের বিরুদ্ধে তিনি কখনোই কিছু বলতেন না। এমনকি তার দলের নেতাকর্মীরা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের রাজাকার বলে তাচ্ছিল্য করলেও নিজের দলের রাজাকারদের পা চাটতে দ্বিধা করত না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এমন দ্বিচারিতা জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশের ‘রাজাকার’ বিষয়টি একটু ভেবে দেখা যেতে পারে। মূলত ১৯৭১ সালে নতুন পরিবেশ ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পেরে উঠছিল না পাকবাহিনী। ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদেরকে সহায়তা করতে আধা সামরিক রাজাকার বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭১ সালের মে মাসে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থী কর্মী নিয়ে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সারা দেশে এই বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা অধ্যাদেশে রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীর সদস্যরূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সরকারি বেতনভুক এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। ১৫ দিনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই বাহিনীর সদস্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথে রাজাকার বাহিনীর স্বাভাবিক বিলুপ্তি ঘটে।
৪০ হাজার সদস্যের রাজাকার বাহিনী ১৯৭১ সালে বিলুপ্ত হলেও স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও এই বাহিনীর দোহাই দিয়ে দেশের অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন ও হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়। বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করার ব্যাপারে এটি শেখ হাসিনার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। বাস্তবতা হলো— ১৯৭১ সালে যে ৪০ হাজার রাজাকার ছিল। ধরা যাক এখন পর্যন্ত তাদের কেউ মারা যায়নি। তারপরও ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে তারা হবে ০.০২ শতাংশ। খেয়াল করে দেখুন, মোট জনসংখ্যার মাত্র .০২ শতাংশ।
অন্য দিকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর ধরলে এবং নিয়োগকালে রাজাকারদের গড় বয়স ২০ বছর ধরলেও অধিকাংশ রাজাকার সদস্য এখন আর বেঁচে থাকার কথা নয়। তারপরও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দলের লোকজন বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের নির্যাতন করতে রাজাকার ট্যাগ ব্যবহার করত।
অথচ ২০১৯ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শেখ হাসিনা সরকার ১০ সহস্রাধিক রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সংখ্যাই ছিল বেশি। আবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলেও রাজাকার ছিল বা আছে। নিজের দলে সর্বাধিক সংখ্যক রাজাকার রেখে তিনি অন্যদের রাজাকার ট্যাগ দিতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করতেন না।
শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলার প্রতিবাদে দেশের মানুষ ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান জনপ্রিয় করে তোলে। ফলে দেশের মানুষকে রাজাকার ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়। এটিই জুলাই বিপ্লবের বড় সাফল্য।
তবে এই সাফল্যের বহু আগেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক এই বিভাজন রেখা মুছে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে রাজাকার হিসেবে কাজ করা অনেক লোককে নিয়ে তিনি উদার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেছিলেন। সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার এই প্রচেষ্টা তাকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।
কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক বিরোধিতার জায়গা থেকে পুনরায় এই রাজাকার ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি হতাশাজনক, লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। যেখানে বর্তমানে দেশে ০.০০৫ শতাংশ (দশমিক শূন্য শূন্য পাঁচ শতাংশ) রাজাকারও নেই, সেখানে গণহারে দেশের মানুষকে রাজাকার ট্যাগ দেয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ



