ড. রাধেশ্যাম সরকার
কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরতা এবং উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ধান উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ, সবজি উৎপাদনে বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং কৃষি প্রযুক্তির বিস্তারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবু গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিসের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— খাদ্য ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের অন্যতম, তখন এ অর্জনগুলোর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে, উৎপাদনের সাফল্য থাকা সত্ত্বেও কেন খাদ্যনিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আত্মতুষ্টি কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের অগ্রগতির সহায়ক শক্তি নয়; বরং এটি অনেক সময় বাস্তব সমস্যা আড়াল করে রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নেও একই বিষয় প্রযোজ্য। উৎপাদনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে নিজেদের সাফল্যের গল্প বলা সহজ; কিন্তু সেই উৎপাদন দেশের প্রত্যেক মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে কি না তা যাচাই করা প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। খাদ্যনিরাপত্তা কেবল খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এ উপলব্ধি থেকে খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
খাদ্য উৎপাদনে আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশ ধান বা নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেই যে তার জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, তা বলা যায় না। খাদ্যনিরাপত্তা একটি বহুমাত্রিক ধারণা; যেখানে খাদ্যের প্রাপ্যতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টির ভারসাম্য ও খাদ্যের দীর্ঘস্থায়ী প্রাপ্যতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও খাদ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে এখনো অনেক ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেল, মসলা ও ডালসহ বিভিন্ন পণ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা দেশের খাদ্যব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা কিংবা বৈশ্বিক সঙ্কট দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে সহজে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সীমিত আয়তনের একটি দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করা একটি জটিল কাজ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন এবং কৃষিজমি হ্রাসে খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বিপুল কৃষিজমি আবাসন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং অধিক ফলনশীল করতে হচ্ছে। যদিও এটি স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— পুষ্টিনিরাপত্তা। বাংলাদেশের অনেক মানুষ পর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলেও পুষ্টিগত ঘাটতিতে ভুগছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে উল্লেøখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অদৃশ্য ক্ষুধার মধ্যে রয়েছেন। এ ধরনের ক্ষুধায় মানুষ খাদ্য গ্রহণ করলেও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুদের অপুষ্টি, খর্বাকৃতির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং নারীদের রক্তস্বল্পতা এর সুস্পষ্ট উদাহরণ। ফলে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও যদি পুষ্টির ভারসাম্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়।
দেশের খাদ্য ব্যবস্থার আরেকটি জটিল দিক হলো তথ্য এবং পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা। কৃষি ও খাদ্য-সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এ তথ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সঠিক, নির্ভরযোগ্য এবং সমন্বিত তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য যদি অতিরঞ্জিত, অসম্পূর্ণ অথবা বিভ্রান্তিকর হয়, তাহলে নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রেও ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক সময় উৎপাদনের সাফল্য বিশেষভাবে তুলে ধরতে গিয়ে খাদ্য বিতরণ, সংরক্ষণ এবং পুষ্টি-সংক্রান্ত বাস্তব সমস্যাগুলো প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। এর ফলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং কার্যকর, ফলপ্রসূ পরিকল্পনা গ্রহণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় একটি বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অকাল বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরা জলবায়ু ঝুঁকির কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ফসলের ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে কৃষিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। খাদ্যের সুষ্ঠু সংরক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ সংরক্ষণ এবং পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতায় নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্য অপচয় একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ অপচয় কমানো গেলে খাদ্যের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং কৃষকদের আর্থিক লাভও বাড়তে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার সাথে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী খাদ্যের দামের ওঠানামায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরো শক্তিশালী করা অত্যাবশক।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা টেকসই এবং স্থিতিশীল করতে হলে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। ধাননির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে এসে ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি ও প্রাণিসম্পদ খাতে যথাযথ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যা শুধু খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াবে না; বরং দেশের পুষ্টিনিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে। একই সাথে গবেষণা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো, জলবায়ু সহনশীল নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া অতীব জরুরি। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা আরো স্থিতিশীল, ফলনশীল এবং পুষ্টিকর হয়ে উঠবে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলবে।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির পরিবর্তে আত্মসমালোচনা এবং আত্মবিশ্লেষণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। খাদ্য উৎপাদনে অর্জিত সাফল্যকে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই, তবে সেই সাফল্যের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো আন্তরিকভাবে স্বীকার করাও সমান দরকার। আন্তর্জাতিক সূচকে অবস্থান কিংবা পরিসংখ্যানগত সাফল্যের তুলনায় দেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টি নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এবং সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান ভিত্তি হতে পারে।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা কেবল কৃষি উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি সমন্বিত সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিশ্চিত করা, তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি— এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করলে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মানুষের ক্ষুধামুক্তি নিশ্চিত না হলে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না; বরং বাস্তব সমস্যাগুলো গভীরভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়াই দেশের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা। আত্মতুষ্টির পরিবর্তে আত্মসমালোচনা এবং তথ্যনির্ভর পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এতে বাংলাদেশ শুধু খাদ্য উৎপাদনে নয়, প্রকৃত খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনেও সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। এ পথ দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।



