আসামের মুখ্যমন্ত্রীর অসংলগ্ন কথাবার্তা

শর্মার এ সব কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি পদে পদে শাসনকার্যের নিয়মনীতি পদদলিত করে চলছেন এবং জোরেশোরে নিজের মুসলিমবিদ্বেষ ঘোষণা করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু দেশে আইন ও সংবিধানের শাসন থাকা সত্ত্বেও তাকে জবাবদিহি করানোর কেউ নেই। আসামের মুসলমানরা ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছেন। তাদের পরিচিতি ও নাগরিকত্ব উভয়টাতেই বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসছে

মাসুম মুরাদাবাদী
আসাম অ্যাসেম্বলির নির্বাচন যতই কাছিয়ে আসছে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার পায়ের তলা থেকে ততই মাটি সরে যাচ্ছে। তিনি এই দিশেহারা অবস্থায় একের পর এক মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। যাতে আসামে সর্বাত্মক বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি তার ফায়দা উঠিয়ে আবারো ক্ষমতায় আসতে পারেন। এ দিশেহারা অবস্থায় তিনি এ কথা ভুলে গেছেন যে, তিনি এক সাংবিধানিক পদে বসে আছেন এবং তিনি তার রাজ্যের প্রতিটি ব্যক্তির সাথে একই আচরণ করার শপথ নিয়েছেন। ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত মুখ্যমন্ত্রী এ কথাও বলে ফেলেছেন, মুসলমানদের জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করা আমার দায়িত্ব।

তিনি এসআরআইয়ের (ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন) সময় ভোটার তালিকা থেকে চার-পাঁচ লাখ মুসলমানের নাম বাদ দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘এ মানুষগুলো এখন বাংলাদেশে ভোট দেবে।’ তিনি আসামের জনসাধারণের কাছে আবেদন করেছেন, ‘তারা যেন মুসলমানদের এমনভাবে নির্যাতন করে, যাতে শেষ পর্যন্ত তারা রাজ্য ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।’ একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এ কথাগুলো বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের বিরুদ্ধে সাবেক আইএএস কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দের দিল্লির হাউজ খাস থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেন। ওই এফআইআরে বলা হয়েছে, ‘মুখ্যমন্ত্রী শর্মা আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও হয়রানির অপরাধে লিপ্ত। সুতরাং তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’ এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের একটি কমিটিও তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সবাই জানেন, আসাম ভারতের একমাত্র রাজ্য, যেখানে সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস। এ প্রদেশে মুসলমান জনসংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মাঝামাঝি। যখন থেকে এখানে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং প্রদেশের শাসনভার হিমন্ত বিশ্বশর্মার হাতে এসেছে, তখন থেকে এখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মারাত্মক বিরোধিতা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে আসামের শাসনভার এ জন্য অর্পণ করা হয়েছে, তিনি এখানকার মুসলমানদের উৎখাত করবেন। সম্ভবত এমন কোনো দিনই অতিবাহিত হয় না, যে দিন তিনি মুসলমানদের বিরোধিতা ও শত্রুতা প্রদর্শন করে বক্তব্য দেন না। বোধ হয় মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য মুসলিম শত্রুতা অক্সিজেনের কাজ করছে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি এ কথা বলে সংবিধানের শপথ নেন, তিনি তার রাজ্যের সব নাগরিকের সাথে একই ধরনের আচরণ করবেন এবং কোনো নাগরিকের সাথে তার ধর্ম বা জাত-পাতের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না।

তিনি প্রকাশ্যে আসামের মুসলমানদের থেকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার হরণের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। আসামে অচিরেই অ্যাসেম্বলি নির্বাচন হবে। মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা চালাচ্ছেন তার রাজ্যে মুসলিম ভোট অকার্যকর করে দিতে। যাতে বিরোধীপক্ষে কোনো প্রার্থী সফল হতে না পারেন। বিগত পাঁচ বছরে শর্মার নেতৃত্বে এখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনটি বড় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মুসলমানদের গৃহহীন করা, অ্যাসেম্বলির আসনগুলোর নতুন করে সীমানা নির্ধারণ এবং ভোটার তালিকা পর্যালোচনার অভিযান। যেসব স্থানে গত নির্বাচনে বিজেপি ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে বিশাল সংখ্যক মুসলমানদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। একটি সংগঠিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মা সদ্য এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘আসামে এসআইআর কার্যক্রম চলার সময় ভোটার তালিকা থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ মিয়া মুসলমানদের নাম বাদ যাবে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর।’ এ কথা স্পষ্ট যে, মুখ্যমন্ত্রী শর্মা আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘মিয়া’ বলে সম্বোধন করে থাকেন। তিনি তাদের বাংলাদেশী অভিহিত করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে চান। অথচ বাংলাভাষী এ মুসলমানরা আসামের অধিবাসী। তাদের কাছে ভারতের নাগরিকত্বের সব প্রমাণ বিদ্যমান, তার পরও নানান বাহানায় নাগরিকত্বকে সন্দেহযুক্ত বানানো ও তাদের হয়রানি করার সরকারি সব প্রচেষ্টা তুঙ্গে। মুসলিম ভোটগুলোকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য যে নতুন সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন ৪৪টি থেকে কমে গিয়ে এখন ২২টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে মুসলিম সদস্যের সংখ্যা কমে অর্ধেকে গিয়ে দাঁড়াবে।

হিন্দি ভাষার পত্রিকা দৈনিক ভাস্কর সম্প্রতি তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি চমকে দেয়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কীভাবে আসন্ন অ্যাসেম্বলি নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনগুলোর নতুন করে সীমানা নির্ধারণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সেখানকার মুসলমান ও আদিবাসীদের ওপর। আসামের সিনিয়র সাংবাদিক আশীষ গুপ্তের বক্তব্য, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে আসামের ৬০ শতাংশ নাগরিককে প্রভাবহীন দেখা যাবে।

যদি আপনি গভীরভাবে লক্ষ করে থাকেন তা হলে দেখতে পাবেন, এ পুরো কার্যক্রম আসামের মুসলমানদের কোণঠাসা করার জন্য শুরু করা হয়েছে। প্রথমে আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের গৃহহীন ও অসহায় করার জন্য বুলডোজারের সহায়তা নেয়া হয়েছিল। আর এখন ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম নির্দ্বিধায় বাদ দেয়া হচ্ছে। সবাই জানেন, এসআইআর কর্মসূচি মুসলমানদের বিষয়টি মাথায় রেখেই শুরু করা হয়েছে। আর এর লক্ষ্য মুসলিম ভোটকে গুরুত্বহীন করা। শাসকদল বিজেপির ধারণা, মুসলমান যখন তাদের ভোটই দেবে না, তখন তাদের থেকে ভোটের শক্তি কেনই বা ছিনিয়ে নেয়া হবে না।

আসামে এসআইআর কর্মসূচি কোনো দিক-নির্দেশনায় এগিয়ে যাচ্ছে, তা রায়হানা বেগমের ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়। রায়হানা বরক্ষেত্রী আসনের সেই ১৭৬৯৯ ভোটারদের একজন, যাকে নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে তার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয়েছে। রায়হানা যে দস্তাবেজের ভিত্তিতে ২০২৫-এর জুনে জেলা পঞ্চায়েতে নির্বাচনে লড়াই করেছেন, এখন তাকেই ভুল বলা হচ্ছে। রায়হানার স্বামী জালালুদ্দিন অভিযোগ করেন, নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে আমাদের ফরম নং ৭ আগে থেকেই পূর্ণ করা ছিল, যা ভোটারের নাম বিলুপ্তকারী ফরম। চিঙ্গা আসনের রোমারি গ্রামের ভোটার জাকির হোসাইন বলেন, ‘গতবার বরক্ষেত্রী থেকে বিজেপি চার হাজার ভোটে হেরেছিল। যাদের নোটিশ করা হয়েছে, তারা সবাই মুসলমান। সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তা হলে জিতবে কে? গোয়ালপাড়া পূর্ব আসনে উচ্ছেদ অভিযান ও এসআইআর উভয়ের প্রভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী আবদুল আজিজ বলেন, যে সরকারি ভূমিগুলো উদ্ধারের নামে তাদের উচ্ছেদ করার জন্য আসামে ২০২২ সাল থেকে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাভাষী মুসলমান। এখন নাগরিকত্ব সত্যায়ন করানোর পরই উচ্ছেদকৃত লোকদের ভোটাধিকার প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। অথচ গোয়ালপাড়া পূর্ব প্রশাসনের বক্তব্য হচ্ছে, এসআইআর শুধু ভোটকেন্দ্রিক কর্মসূচি, যা কাউকে ভোট থেকে বঞ্চিত করবে না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণ নির্লজ্জভাবে এ কথা বলছেন, নোটিশ শুধু মুসলমানদের দেয়া হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য তাদের হয়রানি ও অস্থির করা।

২০২১ সালের নির্বাচনের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৪৪টি আসনের মধ্যে ৩৯টি আসনে কংগ্রেস ও ইউডিএফ সফলতা অর্জন করে। একটি আসনে সিপিএম জয়লাভ করেছিল। অবশিষ্ট আসনে জয়লাভ করেছিল এনডি। পুরো রাজ্যে মোট ৩২ জন মুসলিম প্রার্থী জয়লাভ করেছিল, তন্মধ্যে ১৫ জন কংগ্রেস ও ১৫ জন ইউডিএফের ছিল। আর বাকি দুইজন জয়ী মুসলিম প্রার্থী ছিলেন বিজেপির জোটভুক্ত দল আসাম গণ-পরিষদের। নতুন সীমানা নির্ধারণ ও এসআইআরের পর কতজন মুসলিম প্রার্থী বিজয়ী হবেন সেটি বলা মুশকিল। মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম ও শেষ ইচ্ছা এটিই যে, তিনি আসামে মুসলিম ভোটকে একেবারে ছত্রভঙ্গ করে দেবেন। এ কারণেই তিনি প্রকাশ্যে এ কথা বলছেন, তিনি ‘মিয়া’দের অস্থির করতে থাকবেন। যদি এমনটি করা না হয়, তা হলে তারা তার মাথার ওপর উঠে নাচবে। তিনি বলেন, মিয়ারা আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ জন্য আমরা তাদের হয়রানি করা অব্যাহত রাখব। তিনি এসআরআই চলাকালীন শুধু মুসলমানদের নোটিশ দেয়ার বিষয়টিও সমর্থন করেছেন। শর্মার এ সব কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি পদে পদে শাসনকার্যের নিয়মনীতি পদদলিত করে চলছেন এবং জোশোরে নিজের মুসলিমবিদ্বেষ ঘোষণা করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু দেশে আইন ও সংবিধানের শাসন থাকা সত্ত্বেও তাকে জবাবদিহি করানোর কেউ নেই। আসামের মুসলমানরা ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছেন। তাদের পরিচিতি ও নাগরিকত্ব উভয়টাতেই বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসছে।

লাক্ষ্মৌ থেকে প্রকাশিত দৈনিক আগ, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]

লেখক: ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট