সংসদ সদস্যদের শপথ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের শপথ অনুষ্ঠানটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংসদ ভবনে পরিচালনা করেন। যেহেতু নির্বাচনের ফল ঘোষণা-পরবর্তী বিজয়ীদের নামের তালিকা গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে বিগত দ্বাদশ সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার কর্তৃক সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব হয়নি, সঙ্গত কারণে তিন দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে শপথ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন তা সাংবিধানিক ও যথার্থ মর্মে বিবেচিত হয়

শপথগ্রহণ ছাড়া একজন সংসদ সদস্য পদে আসীন হন না। একজন সংসদ সদস্য তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত শপথগ্রহণে ব্যর্থ হলে তার আসন শূন্য ঘোষিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সংসদের স্পিকার উক্তরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার আগে যথার্থ কারণে বর্ধিত করতে পারেন।

শপথগ্রহণের আগে আসন গ্রহণ বা ভোট দিলে একজন সংসদ সদস্য অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হন। এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৬৯ এ সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে— কোনো ব্যক্তি এ সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করার এবং শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দান করার আগে কিংবা তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য নন বা অযোগ্য হয়েছেন জেনে সংসদ সদস্যরূপে আসন গ্রহণ বা ভোটদান করলে তিনি প্রতিদিনের অনুরূপ কার্যের জন্য প্রজাতন্ত্রের নিকট দেনা হিসেবে উসুলযোগ্য এক হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

সংসদ সদস্যের পদ সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত পদ। এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এর দফা (১) এ বলা হয়েছে— তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত যেকোনো পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যভার গ্রহণের পূর্বে উক্ত তফসিল অনুযায়ী শপথগ্রহণ বা ঘোষণা করবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দান করবেন।

অনুচ্ছেদটির দফা (২) এ বলা হয়েছে— এ সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছে শপথগ্রহণ আবশ্যক হলে অনুরূপ ব্যক্তি যেরূপ ব্যক্তি বা স্থান নির্ধারণ করবেন, সেরূপ ব্যক্তির নিকট সেরূপ স্থানে শপথ গ্রহণ করা যাবে।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে দফা (২ক) সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধন) আইন, ২০০৪-এর মাধ্যমে সন্নিবেশিত হয়। সন্নিবেশিত দফাটিতে বলা হয়, অনুচ্ছেদ ১২৩ দফা (৩) এর অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের ফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এ সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে বা না করলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এর পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন, যেন এ সংবিধানের অধীন তিনি এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।

অনুচ্ছেদটির দফা (৩) এ বলা হয়েছে— এ সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথগ্রহণ আবশ্যক, সে ক্ষেত্রে শপথগ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবে।

একজন সংসদ সদস্য সংসদের সাধারণ নির্বাচন অথবা আসন শূন্য হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন উভয় ক্ষেত্রে স্পিকারের পরিচালনায় শপথ পাঠ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তাকে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করতে হয়— ‘আমি ..., সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করতে যাচ্ছি, তা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করব এবং সংসদ সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবো না।

স্পিকার এ যাবৎকাল পর্যন্ত সংসদে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সংসদ ভেঙে যাওয়ার বিধান থাকলেও স্পিকার পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পরবর্তী সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা অবধি পদে বহাল থাকেন। একইসাথে স্পিকার কর্তৃক নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। তাছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকটি বিদায়ী স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং সে বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন-পরবর্তী তিনি বৈঠক ত্যাগ করেন।

অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। সে সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ায় দলটির সংসদ সদস্যরা তাকে স্পিকার পদে নির্বাচিত করেন। পরবর্তীতে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হলেও সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পূর্ববর্তী স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ায় একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথগ্রহণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের জটিলতা দেখা দেয়নি এ কারণে যে, আওয়ামী লীগ মনোনীত স্পিকার শপথ পাঠ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

দ্বাদশ সংসদে আওয়ামী লীগের স্পিকার ছিলেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার ছিলেন সামসুল হক টুকু। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করলে তা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হয়। সুতরাং ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বর্তমানে স্পিকার পদে বহাল নেই। তার সময়ে কর্মরত ডেপুটি স্পিকার সামসুল হক টুকু বর্তমানে মামলা সংশ্লেষে কারান্তরীণ থাকায় এবং তিনি ডেপুটি স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ না করায় পদে বহাল আছেন, এমনটি অনুমিত হয়। সে ক্ষেত্রে তিনি স্পিকারের পদে অভিষিক্ত হয়েছেন মর্মে ধারণা করা যায়।

স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ করলেও তাদের উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হয়। স্পিকার শিরীন শারমিনের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হলেও তিনি বর্তমানে কোথায় কী অবস্থায় আছেন— সে বিষয়ে দেশবাসী অবগত নয়। ডেপুটি স্পিকার সামসুল হক টুকু মামলা সংশ্লেষে কারান্তরীণ থাকায় তার পক্ষেও শপথ পাঠ পরিচালনা সম্ভব নয়।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ দফা (২ক) অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এ সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে বা না করলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এর পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে ওই শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন, যেন এ সংবিধানের অধীন তিনি এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।

সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে— স্পিকার কর্তৃক সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে। অনুচ্ছেদ ১৪৮ দফা (২ক) তে এতদুদ্দেশ্যে যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তির যে উল্লেখ রয়েছে তারা হলেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফল ঘোষণা-পরবর্তী বিজয়ীদের নামের তালিকা গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশিত হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এর পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে অর্থাৎ— ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার যারা এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি শপথ পাঠ পরিচালনা না করান; সাংবিধানিকভাবে তিন দিন অতিক্রান্তের পর শপথ পাঠ পরিচালনার দায়িত্ব প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর বর্তায়।

সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফল গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম বৈঠক আহ্বানের বিধান রয়েছে। এ বৈঠকসহ সংসদের সব বৈঠক অনুষ্ঠান বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী তার এতদসংক্রান্ত কার্য সম্পন্ন করে থাকেন। প্রথম বৈঠকটিতে যিনি শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। সুতরাং ধারণা করা যায়, বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠক প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে কখনো সংসদের সাধারণ নির্বাচনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কর্তৃক সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। তা ছাড়া অনুচ্ছেদ ১৪৮-এ দফা (২ক) সন্নিবেশন-পরবর্তী নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের শপথ অনুষ্ঠান অষ্টম সংসদের বিএনপি মনোনীত স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে পরিচালিত হলেও দশম. একাদশ ও দ্বাদশ নির্বাচনে ফল ঘোষণা-পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ মনোনীত স্পিকার কর্মরত থাকায় অন্য কোনো বিকল্প ভাবার অবকাশ দেখা দেয়নি, অর্থাৎ— প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের শপথ অনুষ্ঠানটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংসদ ভবনে পরিচালনা করেন। যেহেতু নির্বাচনের ফল ঘোষণা-পরবর্তী বিজয়ীদের নামের তালিকা গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে বিগত দ্বাদশ সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার কর্তৃক সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব হয়নি, সঙ্গত কারণে তিন দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে শপথ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন তা সাংবিধানিক ও যথার্থ মর্মে বিবেচিত হয়।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]