প্রফেসর এম উমার আলী
পূর্ব ঐতিহ্যের কারণে ডাকসুকে ধরা হতো মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থানের সুতিকাগার হিসেবে এই ডাকসুর ভূমিকা ছিল অগ্রণীয়। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে, দেখা গেছে দেশের নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯, ৭১ এবং পরে স্বৈরাচারবিরোধী সব আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশংসনীয় ভূমিকা ইতিহাস ধারণ করে আছে।
৬৯-এর উত্তাল ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের রিডার, ড. জোহার আত্মদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইন্ধন হিসেবে পরিগণিত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দিকনির্দেশনা প্রদান ও অনুঘটক হিসেবে অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শহীদ ডক্টর শামসুজ্জোহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার স্মৃতি জাগরূক রাখতে তার নামে হয় জোহা হল।
স্বাধীনতার পর ইসলামী ছাত্রশিবির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠিন নির্যাতন-নিপীড়নের মাঝে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এমনকি কেউ কেউ ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার জন্য দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শিবির নেতাদের বেশ কয়েকজনকে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে, পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। কারো মাথা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। আজ অবধি এইসব খুনির বিচার হয়নি। মুখে দাড়ি থাকার অপরাধে, এমনকি এক হিন্দু দর্জি বিশ্বজিৎকেও শিবির ট্যাগ দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়। ছাত্রশিবিরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে টিকে থাকা ছিল জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার শামিল।
চব্বিশের ৩৬ জুলাই মহান আল্লাহর অশেষ করুণায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিপ্লবী অভিযাত্রায় সেই স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। স্বৈরাচারী গোষ্ঠীকে তার দেশীয় দোসররা সহায়তা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। রাব্বুল আলামিন তার নিজস্ব কৌশলে সেই ছাত্রশিবিরকেই এখন দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালীন সব শাসক গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরকে একটি অবৈধ সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করেছে। নিজ সংগঠনের পরিচয়ে ক্যাম্পাসে তাদের দাঁড়ানোরও সুযোগ দেয়া হয়নি। দীর্ঘকাল অমানবিক জুলুম ও অবিচারের পর ছাত্রশিবিরের ওপর গুপ্ত রাজনীতি করার অভিযোগ যারা উত্থাপন করে, তাদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন আসে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা খেয়াল করুন, তখন কি পাকিস্তানি জান্তা বাহিনীর সাথে সম্মুখ লড়াইয়ের পাশাপাশি গুপ্তভাবে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে হানাদারদের দেশছাড়া করার কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হয়নি? ঊনসত্তরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের এই অংশকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভারতের সাথে আগরতলায় অনুষ্ঠিত গুপ্ত রাজনীতিকে তখন বলা হতো আগরতলা ষড়যন্ত্র। ভারতের সাথে এই গুপ্ত রাজনীতির পরিণতিতেই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ হয়। সেই গুপ্ত রাজনীতি না হলে, এই উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্নরকম হতে পারত। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোকেও ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিচার করলেও প্রতিপক্ষ এটাকে অনিয়ম, অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করবে।
স্বাধীনতা-উত্তর পাকিস্তানে উর্দুকে ফ্রাঙ্কো লিঙ্গুয়া ঘোষণা করার পর থেকেই ঢাকার তমুদ্দুন মজলিস বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার জন্য যে আন্দোলন ক্রিস্টালাইজ করে তা দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত মোমেন্টাম অর্জন করতে পারেনি, যতক্ষণ না বিভিন্ন সংগঠনের গুপ্ত তৎপরতায় উত্তাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ সা:-এর মাদানি জিন্দেগিতে ইসলামের প্রকাশ্য রাজনীতি বিস্তার ও ব্যাপকতা লাভ করে। এমন অবস্থাতেও বিভিন্ন যুদ্ধের সময় তিনি গোপন ইন্টেলিজেন্সদের সহযোগিতায় গুপ্ত পন্থায় ইসলামবিরোধী শক্তির অবস্থান ও পরিকল্পনার বিষয়ে খবর সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী মোকাবেলার ব্যবস্থা নিয়ে শত্রুদলকে পরাভূত করে সাফল্য অর্জন করেছেন।
লেখক : সাবেক ভিসি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি



