এবারের গণভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল জনগণের সরাসরি রায়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গণাভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে চার কোটি ৮২ লাখের বেশি। ‘না’ ভোট পেয়েছে দুই কোটি ২০ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ, ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট। এত বড় ব্যবধান কাকতালীয় নয়। এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক নির্দেশনা। জনগণ বলেছে— সংবিধান সংস্কার চাই। জনগণ বলেছে— জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। গণতান্ত্রিক তত্ত্বে এর অর্থ খুব পরিষ্কার। যখন জনগণ সরাসরি কথা বলে, তখন মধ্যস্থতার সুযোগ কমে যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেছিলেন, সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরযোগ্য নয়। গণভোট সেই সার্বভৌমত্বের সরাসরি প্রকাশ। বাংলাদেশের সংবিধানও সেটিই বলে। ৭(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট— ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। এই জনগণই জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন ছিল একটাই— এই বাস্তবতাকে কিভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে স্থায়ী করা যায়। দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, সংবিধান নিয়ে ঐকমত্য নয়, বাড়ছে বিভাজন। বিএনপি সংবিধানকে দেখছে নিজেদের স্বার্থের আয়নায়। ফলে সংবিধান রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি না হয়ে দলীয় ব্যাখ্যার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এটাই আমাদের দীর্ঘ দিনের রোগ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট ভেন ডাইসি বলেছিলেন, সংবিধান টিকে থাকে ঐকমত্যের ওপর, কৌশলের ওপর নয়। আমরা উল্টো পথে হাঁটছি।
বিএনপি শুরু থেকেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারাবাহিকতার কথা বলেছে। তাদের যুক্তি-শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত নির্বাহী ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না। এই যুক্তির পেছনে একটি পরিচিত মানসিকতা কাজ করে। আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে অনীহা। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। ১৯৭২ সালের সংবিধান একাধিকবার বিকৃত হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী তা ধ্বংস করেছে। পরবর্তী সামরিক ও আধা সামরিক শাসন তা আরো দুর্বল করেছে। আজ সেই সংবিধান আর আগের মতো নেই। তাকে পবিত্র গ্রন্থ বানানোর সুযোগও নেই। গণভোটের আগে ও পরে বিএনপি একাধিকভাবে আলোচনাকে জটিল করেছে। কখনো বলেছে, সংস্কারের আগে আইন হবে। কখনো বলেছে, গণভোটের কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে মূল প্রশ্ন আড়ালে গেছে। জনগণ কী চায়— এই প্রশ্ন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল একটিই। ক্ষমতাকাঠামো সংস্কার নিয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। দার্শনিক বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল ইচ্ছাকৃতভাবে। লক্ষ্য ছিল— কমন মিনিমাম গোল; কিন্তু একটি বড় ঘাটতি শুরু থেকেই ছিল। পদ্ধতির প্রশ্ন। সংস্কার কিভাবে বাস্তবায়িত হবে— এটা শুরুতেই নির্ধারিত হয়নি। ফলে পরে গিয়ে জটিলতা বেড়েছে। তখন অনেকেই বলেছেন, বাস্তবায়ন কাঠামো ছাড়া সংস্কার কাগজেই থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত সংস্কার পরিষদের প্রস্তাব এসেছে; কিন্তু ততদিনে রাজনৈতিক অনাস্থা গভীর হয়েছে।
গণভোট ও নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে বিএনপি একটি প্রতীকী; কিন্তু গুরুতর বার্তা দিয়েছে। এটি কেবল একটি শপথের প্রশ্ন নয়। এটি গণভোটের রায় মানার প্রশ্ন। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গণভোটে জনগণের সম্মতি পেয়েছে। এই আদেশের অংশ হিসেবেই সংস্কার পরিষদ। শপথের ফরমও আদেশের অংশ। অর্থাৎ, শপথ না নেয়া মানে গণভোটে অনুমোদিত একটি আদেশ আংশিকভাবে অস্বীকার করা।
এটাই প্রথম উপেক্ষা। দ্বিতীয় উপেক্ষা আরো স্পষ্ট। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতোই। আজ শপথ না নেয়ার মাধ্যমে কার্যত ‘না’ জয়ী হলে যে পরিস্থিতি হতো, সেই পরিস্থিতিই তৈরি করা হচ্ছে। এটি দ্বৈত মানদণ্ড। এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট।
সংস্কার পরিষদ ব্যর্থ হলে একমাত্র পথ ১৪২ অনুচ্ছেদ; কিন্তু এই পথ দুর্বল। এই অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক কাঠামো বদলানো যায় না। আদালতের ইতিহাস সেটিই বলে।
অষ্টম সংশোধনী বাতিল হয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের ফলই ছিল এক দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসন। এই অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা আত্মঘাতী। জুলাই সনদে যে মৌলিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা ১৪২ অনুচ্ছেদে টিকবে না।
১৮০ দিনের সময়সীমা কোনো খেয়ালখুশি সিদ্ধান্ত নয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে দ্রুত সুফল দেয়া। পরবর্তী নির্বাচনকে আরো স্বাধীন করা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিত্তি দেয়া। যদি সরকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সত্যিই জনগণের পক্ষে থাকে, তাহলে এই সময়সীমাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। সংসদের প্রথম দিনেই শপথ নিয়ে বিরোধ একটি সতর্কসঙ্কেত। এটি বড় বাধা নয়; কিন্তু অবহেলা করলে বড় সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়।
তরুণদের ক্ষোভ কেন যুক্তিসঙ্গত
জুলাই বিপ্লব কোনো দলীয় ঘটনা ছিল না। এটি ছিল প্রজন্মগত বিস্ফোরণ। যাদের নেতৃত্বে সেই অভ্যুত্থান হয়েছে, তারা আজও স্পষ্ট। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এই দাবি আবেগের নয়। এটি রাজনৈতিক ন্যায্যতার দাবি। ঠিক এই জায়গায় এসে বিএনপির অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আর সেই প্রশ্ন তুলেছে কারা? জামায়াতে ইসলামী। এনসিপি। ডাকসু এবং সর্বোপরি-জুলাইয়ের তরুণ প্রজন্ম।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়াকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি অবজ্ঞা বলেছেন ডা: শফিকুর রহমান। তিনি কথার ফুলঝুরি করেননি। সোজাসাপ্টা বলেছেন, এটি জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। এই বক্তব্য এসেছে সংসদের ভেতর থেকে। শপথকক্ষের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, জামায়াতসহ ১১ দল দু’টি শপথ নিতেই গিয়েছিল। কারণ তাদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার। এই নির্বাচনই হতো না যদি না জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হতো। এটা ইতিহাস। এটা অস্বীকার করা যায় না। জামায়াতের অবস্থান তাই প্রতীকী নয়। এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
অনেকে বলছেন, এটি কেবল একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়। এই যুক্তি ভ্রান্ত। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫-এর অংশ। এই আদেশ গণভোটে অনুমোদিত। অর্থাৎ জনগণ এটিকে বৈধতা দিয়েছে। তাই শপথ না নেয়া মানে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে যাওয়া নয়। এটি গণভোটের রায়কে পাশ কাটানো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ক্ষমতা আসে মানুষের সম্মতি থেকে, প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর থেকে নয়। এখানে ঠিক সেটিই ঘটছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরো কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। এটি আইনি সঙ্কট তৈরি করেছে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে একটি যুক্তি। বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। গণভোট মেনেছে। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তাহলে আজ এই ব্যাখ্যা কেন? গণভোট সংবিধানে নেই— এই যুক্তি এখন কেন? এই প্রশ্ন অমূলক নয়। কারণ জুলাই সনদই গণভোটকে বৈধতা দিয়েছে। সব দল তা মেনে নিয়েই মাঠে নেমেছে। এখান থেকে সরে আসা মানে নিজের স্বাক্ষর অস্বীকার করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়াটি এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) থেকে। ডাকসু খোলাখুলি বলেছে— শপথ না নিয়ে বিএনপি জনগণের প্রত্যক্ষ রায় উপেক্ষা করেছে। ডাকসুর বিবৃতি রাজনৈতিকভাবে পরিণত। তারা সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ স্মরণ করিয়েছে। ক্ষমতার মালিক জনগণ। ডাকসু মনে করিয়ে দিয়েছে, এই জনগণের অভিপ্রায়েই স্বৈরাচারী সরকার বিদায় নিয়েছিল।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে। তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। এই ধারাবাহিকতার শেষ ধাপই ছিল জুলাই সনদ এবং তার বাস্তবায়নের পথ। এই পথ থেকে সরে যাওয়া পুরো প্রক্রিয়ার বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তরুণদের ক্ষোভ কেন যৌক্তিক? এই প্রতিক্রিয়াগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একই সূত্রে গাঁথা। জুলাই বিপ্লবের তরুণরা কোনো দল চায় না। তারা চায় কাঠামোগত পরিবর্তন।
স্বচ্ছতা। জবাবদিহিতা। ক্ষমতার ভারসাম্য। এই আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করলে রাজনীতি আবার পুরনো খাতে ফিরবে। ইতিহাস বলছে, যখনই কেউ জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে। এটি হুমকি নয়। এটি পর্যবেক্ষণ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অন্তত এক হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। ৪০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। চোখ হারিয়েছেন পাঁচ শতাধিক তরুণ। তারা কোনো দলের জন্য শহীদ হননি। শহীদ হয়েছেন একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর আশায়।
বিভক্ত জাতি এগোয় না। এই সত্য নতুন নয়। আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের। ঐকমত্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। গণভোটের রায়কে সম্মান করা। বিএনপির জন্য এখনো দরজা খোলা। শপথ নেয়া সম্ভব। সমাধান সম্ভব। গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করে কোনো সংস্কার টেকে না। গণভোটের রায় মেনেই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে। এটাই জুলাইয়ের অঙ্গীকার। এটাই জনগণের নির্দেশ।
জুলাইকে সম্মান করা মানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। এর মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই। শপথ নেয়া এখনো সম্ভব। সমাধান এখনো সম্ভব; কিন্তু সময় নষ্ট হলে ক্ষতি সবার। বিশেষ করে তরুণদের। যারা জীবন দিয়েছেন। রক্ত দিয়েছেন। তাদের কাছে এখনো একটাই প্রশ্ন— আপনারা কি জুলাইকে সম্মান করবেন, নাকি এড়িয়ে যাবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



