মো: আমিনুল হক
একটি দেশের বিমানবন্দর হলো সেই দেশের প্রথম মুখ। বিদেশ থেকে আসা যাত্রী কিংবা দেশ থেকে বের হওয়া নাগরিক— উভয়ের কাছেই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন সেবা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ শাখা (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), বাংলাদেশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যা, জটিল নিরাপত্তা হুমকি এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এই ব্যবস্থায় স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনে স্মার্ট প্রযুক্তির সম্ভাবনা অপরিসীম, তবে এর পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে যা অতিক্রম করা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে পাসপোর্ট যাচাই, ভিসা পরীক্ষা এবং যাত্রীর তথ্য নিবন্ধনের কাজ মূলত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রতিটি পাসপোর্ট হাতে দেখেন, তথ্য যাচাই করেন এবং কম্পিউটারে এন্ট্রি দেন। এই পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ এবং মানবিক ত্রুটির শঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়, যা যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ হয় এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক ভাবমর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্মার্ট প্রযুক্তি কী এবং কেন প্রয়োজন
স্মার্ট ইমিগ্রেশন প্রযুক্তি বলতে মূলত এমন কিছু ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে বোঝায় যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বা ন্যূনতম হস্তক্ষেপে যাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করতে, তথ্য যাচাই করতে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, যেমন সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের বিমানবন্দরকে বিশ্বমানের করে তুলেছে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তির প্রয়োগ নিরাপদ, দ্রুত ও যাত্রীবান্ধব ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন ধরন ও সম্ভাবনা
বায়োমেট্রিক সিস্টেম : বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি হলো স্মার্ট ইমিগ্রেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আঙুলের ছাপ, আইরিস স্ক্যান এবং মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাত্রীর পরিচয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু হয়েছে, যেখানে বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্যভাণ্ডারকে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে সংযুক্ত করা গেলে জাল পাসপোর্ট শনাক্তকরণ এবং পরিচয় জালিয়াতি রোধ করা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
ই-গেট বা অটোমেটেড বর্ডার কন্ট্রোল : ই-গেট হলো স্বয়ংক্রিয় প্রবেশদ্বার, যেখানে যাত্রী নিজেই পাসপোর্ট স্ক্যান করেন এবং মুখমণ্ডল শনাক্তকরণের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হয়। এতে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। দুবাই ও সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে এই ব্যবস্থায় প্রতিটি যাত্রীর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডে সম্পন্ন হয়। ঢাকায় এই ব্যবস্থা চালু হলে যাত্রীর ভোগান্তি কমবে এবং কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে পারবেন।
অ্যাডভান্সড পেসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম (APIS) : এই সিস্টেমের মাধ্যমে বিমান ছাড়ার আগেই যাত্রীর তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। সন্ত্রাসী, মানবপাচারকারী বা ওয়ান্টেড ব্যক্তি যদি বিমানে উঠতে চান, তাহলে বিমান অবতরণের আগেই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সতর্ক হতে পারেন। বাংলাদেশে এই সিস্টেমের আংশিক বাস্তবায়ন হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ এখনো বাকি।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডেটা অ্যানালিটিক্স : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যাত্রীর ভ্রমণ ইতিহাস, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী শনাক্ত করা সম্ভব। এই রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতিতে নিরীহ যাত্রীদের হয়রানি না করেই সত্যিকারের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলা করা যায়।
অনলাইন অ্যারাইভাল কার্ড ও ডিজিটাল ভিসা : অনেক দেশে এখন বিমানে যে কাগজের অ্যারাইভাল কার্ড পূরণ করতে হয়, তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে আগেই পূরণ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল অ্যারাইভাল কার্ড চালু করলে কাউন্টারে সময় বাঁচবে এবং তথ্য সংরক্ষণও নির্ভুল হবে।
বাস্তব সম্ভাবনা : বাংলাদেশে স্মার্ট ইমিগ্রেশন প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক আছে। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু করেছে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে বায়োমেট্রিক তথ্য সংযুক্ত হয়েছে। এই অবকাঠামো স্মার্ট ইমিগ্রেশনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের সুযোগ আছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ছে, যা এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (ওঅঞঅ) এবং ইন্টারপোল বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন আধুনিকায়নে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সম্ভব।
চ্যালেঞ্জসমূহ
স্মার্ট প্রযুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে।
অর্থায়ন ও বিনিয়োগ : আধুনিক বায়োমেট্রিক সিস্টেম, ই-গেট স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় ডেটা ব্যবস্থাপনার জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারি বাজেটে এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা সব সময় সহজ নয়। তবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি : উন্নত প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। বর্তমান ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিলে সিস্টেম বসানো হলেও তার সুফল পাওয়া যাবে না। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে একই সাথে বিনিয়োগ করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা : ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাত্রীর সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্য যদি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়, তা হলে জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। তাই শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা স্মার্ট ইমিগ্রেশনের অপরিহার্য শর্ত।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা : নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা ছাড়া স্মার্ট প্রযুক্তি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এই অবকাঠামো আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজন আছে।
গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার : বায়োমেট্রিক ও এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন তোলে। আন্তর্জাতিক মানের ডেটা সুরক্ষা আইন এবং স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন না করলে জনগণের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।
করণীয় ও সুপারিশ : এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনকে আধুনিক করতে একটি পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। প্রথম ধাপে বিদ্যমান ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার সাথে ইমিগ্রেশন ডেটাবেজের পূর্ণ সংযোগ স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কিছু কাউন্টারে বায়োমেট্রিক যাচাইব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয় ধাপে ধীরে ধীরে ই-গেট স্থাপন এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করতে হবে।
বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগ শুধু একটি আধুনিকায়নের স্বপ্ন নয়, এটি এখন একটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা। ই-পাসপোর্ট চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই পথে যাত্রা শুরু করেছে। এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। স্পেশাল ব্রাঞ্চ পুলিশের ইমিগ্রেশন টিম যদি আধুনিক প্রযুক্তির সাথে নিজেদের পেশাদারত্বের সংমিশ্রণ ঘটাতে পারে, তা হলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব বিমানবন্দর। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে।
লেখক : এমফিল শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



