ইরান যুদ্ধ মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে

সুয়েজ আক্রমণ বরং ব্রিটিশ শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দেয়। আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বিরোধিতা দৃঢ় হয়। নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বিভ্রম ভেঙে যায়। এটি ব্রিটেনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণের সূচনা করে। সুয়েজ রাতারাতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়নি। তবে এটি মারাত্মক কিছু প্রকাশ করে : রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতা এবং সংযম ছাড়া শক্তির প্রয়োগ পতন রোধ নয়, ত্বরান্বিত করে। ইতিহাস খুব কমই বিশদে পুনরাবৃত্ত হয়। তবে এটি তার যুক্তিগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটায়। এখন ইরানও ওয়াশিংটনের জন্য সুয়েজ হতে পারে

সুমাইয়া ঘানুশি
দুই দশকের বেশি সময় ধরে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি একক বিষয় নিয়ে ঘুরেছেন। তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, তদবির করেছেন এবং ওয়াশিংটন থেকে জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত মঞ্চে নাটকীয়ভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। শেষ পর্যন্ত এখন তা শুরু হয়েছে।

যে যুদ্ধ অনিবার্য বলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন, সেটি হলো ইরানের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ, যা ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তিতে পরিচালিত হবে। সেই যুদ্ধ এখন চলছে।

এটি সীমিত আক্রমণ বা শক্তির প্রদর্শন নয়। এ হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক ও বেপরোয়া সংঘর্ষ; যা আমেরিকার প্রয়োজনে নয়, কোনো হুমকির কারণে নয়, কংগ্রেস বা জাতিসঙ্ঘের অনুমোদনেও নয়; বরং আঞ্চলিক পুনর্গঠনের ইসরাইলি লক্ষ্যে পরিচালিত। বছরের পর বছর ধরে, নেতানিয়াহু ও তার ঘনিষ্ঠরা মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনের কথা প্রকাশ্যে বলে আসছেন। তাদের স্বপ্ন হলো, পুরো অঞ্চলটি একটি দাবার বোর্ডের মতো, যা সাজানো হবে ইসরাইলের ইচ্ছায়।

বৃহত্তর ইসরাইলের ভাষ্য, এখন মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় ঢুকে পড়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা এবং তাদের সুরে বলা অনেক আমেরিকান কণ্ঠস্বর আজ ‘শিয়া চরমপন্থা’ এবং আগামীতে ‘সুন্নি চরমপন্থা’র মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকির কথা খোলাখুলি বলছেন, যেন পুরো মুসলিমবিশ্ব এমন একটি লক্ষ্যবস্তু যা নিজের পালা কখন আসবে সেই অপেক্ষায় আছে। আর আমেরিকার সামরিক সমর্থন পেয়ে এখন নেতানিয়াহু ভাবছেন, ইতিহাস গায়ের জোরে তৈরি করা সম্ভব।

সেই একই পুরনো পাঠ
আমাদের বলা হয়েছে, এ যুদ্ধ হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যার সাথে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দৃঢ়তার সাথে পুনরাবৃত্তি করেছেন, ইরান একটি হুমকি, এটিকে থামাতেই হবে।

আমরা আগেও এমন কথা শুনেছি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তার মিত্র সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ কথা বলেছিলেন। আমরা ইরাকে আক্রমণ, দেশটিকে ধ্বংস করতে দেখেছি; কিন্তু পরে জানা গেছে, যুদ্ধের মূল অজুহাত ছিল মিথ্যা। সে যুদ্ধের পরিণতি তত্ত্বগত ছিল না। ছিল লাখ লাখ মানুষের জীবনহানি, আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা এবং পশ্চিমা বিশ্বাসযোগ্যতার উপর স্থায়ী কালিমা লেপন।

এখন সে চিত্রনাট্যে ধুলা জমেছে। আবার নতুন করে নতুন কাহিনী তৈরি করা হয়েছে। ওমান এবং জেনেভার আলোচনায় ইরান নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানো এবং আন্তর্জাতিক তদারকি মেনে নিতে প্রস্তুত বলেও জানায়। ফলে উত্তেজনা না ছড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু আলোচনা নাটকে পরিণত হয়। কূটনীতিকরা যখন সমঝোতার কথা বলছিলেন, তখন নীরবে সামরিক সমাবেশ ঘটানো হয়। কোরিওগ্রাফিটি খুব চেনা : মুখে শান্তির কথা বলো, পেছনে অস্ত্র শানাও।

এরপর আসে হামলা: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা করা হয়, সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ ও শহরগুলো প্রকম্পিত করা হয়। তার পরও প্রভাবশালী পশ্চিমা আখ্যানে, ইরানকে আক্রমণকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

ইসরাইল কয়েক দশক ধরে সামরিকভাবে অজেয় হিসেবে নিজের ভাবমর্যাদা গড়ে তুলেছে। বারবার আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার কাহিনী ছড়িয়েছে; কিন্তু ঐতিহাসিক রেকর্ডপত্র অনুযায়ী গল্পটা এত সরল নয়।

একার লড়াই
১৯৪৮ সালে, তথাকথিত আরব জোট অর্থবহ কোনো অর্থেই ঐক্যবদ্ধ বা সার্বভৌম ছিল না। আরব বিশ্বের বেশির ভাগ অংশ তখনো সরাসরি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসছিল।

যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিন শাসন করেছিল, তারা ট্রান্সজর্দানের আরব সৈন্যদলকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্রসজ্জা এবং নেতৃত্ব দিয়েছিল। এর কমান্ডার ছিলেন একজন ব্রিটিশ অফিসার, গ্লুব পাশা। যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্ষম এই আরব সেনাবাহিনী কোনো স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ড কাঠামোর অধীনে ছিল না।

জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনকে রক্ষা করার চেয়ে পশ্চিমতীরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। তার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই যুদ্ধের সীমা নির্ধারণ করেছিল। জর্দানের সেনাবাহিনী ইহুদিবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান ধরে রাখার সময়ও তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের গতি সমন্বিত আরব কৌশলের অনুকূলে মোতায়েনের পরিবর্তে আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অধীনে সীমিত ও পুনঃনির্দেশিত ছিল।

১৯৪৮ সালে মিসরের কর্মকুশলতা প্রভাবিত হয়েছিল সর্বোচ্চ স্তরের নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে। মিসরীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধে প্রবেশ করে দুর্বল প্রস্তুতি, বিভ্রান্তিকর কমান্ড কাঠামো এবং অপর্যাপ্ত সমন্বয় নিয়ে। কুখ্যাত ‘ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্র’ কেলেঙ্কারি পরবর্তীতে কায়রোতে তোলপাড় সৃষ্টি করে। অভিযোগ ওঠে যে, সৈন্যদের নষ্ট গোলাবারুদ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। এ বিতর্ক জনসাধারণের ক্ষোভ উসকে দেয় এবং ১৯৫২ সালে অফিসারদের অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করে।

এদিকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা আরো কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। জেরুসালেমের আশপাশে অনিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী আব্দুল কাদির আল হুসাইনি বারবার অস্ত্র ও শক্তি বৃদ্ধির আবেদন জানান; কিন্তু সে সাহায্য কখনো আসেনি। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে আল কাস্তালের যুদ্ধের আগেও তিনি গোলাবারুদের জন্য জরুরি আবেদন করেন।

মৃত্যুর দুই দিন আগে, তিনি আরব লিগের মহাসচিবকে লিখেন, ‘অস্ত্র ও সমর্থন না দিয়ে আমার সৈন্যদের চূড়ান্ত বিজয়ের দুয়ারে পৌঁছানো থেকে বঞ্চিত রাখতে আমি আপনাকে দায়ী করছি।’ তিনি ও তার সৈন্যরা শেষ গুলি অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত লড়াই করেন। যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তার বাহিনীর প্রতি কোনো ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ডের সমর্থন ছিল না; তারা মূলত একাই লড়েছিলেন।

ইসরাইলি মিথ
১৯৪৮ সালে কোনো সমন্বিত, সার্বভৌম, ঐক্যবদ্ধ আরব প্রচলিত যুদ্ধযন্ত্র ছিল না। ছিল খণ্ডিত রাষ্ট্র, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিক জটিলতা, প্রতিযোগিতামূলক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অসম সামরিক ক্ষমতা।

ইসরাইল একটি সমন্বিত প্যান-আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে পারেনি। তখনও আরব বিশ্বে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি কাঠামোর ছায়া ছিল এবং প্রায়শ সরাসরি প্রভাবাধীন ছিল। পাশাপাশি ইসরাইল উন্নত সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছে। ‘আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার’ কল্পকাহিনীটি পরে একটি জাতীয় কিংবদন্তিতে পরিণত করা হয়।

১৯৬৭ সালে, ইসরাইলের চূড়ান্ত সুবিধা আসে এক আগাম উদ্দেশ্যমূলক বিমান হামলার মাধ্যমে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্থলভাগে মিসরের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়। ফল মূলত পূর্বনির্ধারিত ছিল। সমানভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেনাবাহিনীর মধ্যেও এটি কোনো দীর্ঘস্থায়ী, ভারসাম্যপূর্ণ সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল প্রচলিত যুদ্ধ শুরুর আগে আঘাত করে পঙ্গু করে দেয়া।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধ এই মিথকে আরো জটিল করে তোলে। সেই বছরের অক্টোবরে, মিসরীয় সেনাবাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে, বার লেভ লাইন ভেঙে সিনাইতে অগ্রসর হয়; এ ছিল এক আশ্চর্যজনক আক্রমণ, যা ইসরাইলি কমান্ডকে হতবাক করে এবং ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অজেয়তার আভা তছনছ করে দেয়।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো, একটি আরব সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং দক্ষতা এমন মাত্রায় প্রদর্শন করে যা তেলআবিবকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করে। তবু সামরিক গতি কৌশলগত বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়নি।

বিশাল আমেরিকান বিমান সরবরাহ ইসরাইলি ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দেয়। এছাড়া এর অবস্থান স্থিতিশীল করে, ভারসাম্য আবারো পরিবর্তন করে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকতে এবং একটি রাজনৈতিক মীমাংসা নিশ্চিত করতে আগ্রহী হন। সেই সাথে দ্রুত আলোচনায় যোগ দেন। যা পরে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে পৌঁছায়।

একই ধরন
তারপর থেকে, ইসরাইলের প্রধান সঙ্ঘাত ছিল অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির সাথে। লেবাননে তারা হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হয় এবং প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। গাজায়, বিপুল মার্কিন সমর্থন এবং অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধশক্তি সত্ত্বেও হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি। ইসরাইল অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষের ওপর বিমান থেকে বোমাবর্ষণে। ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থিত কোনো বৃহৎ, সংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে টেকসই, আক্রমণাত্মক যুদ্ধে নয়।

আমেরিকাও ধরনটি অনুসরণ করে ২০০৩ সালে ইরাকে। ইরাক বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় ইতোমধ্যে পঙ্গু হয়ে পড়েছিল, ভেতর থেকে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সামরিক বাহিনী দুর্বল, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছিল এবং নাগরিক সমাজ ছিল ক্লান্ত। আফগানিস্তানের বিদ্রোহীরা কিন্তু মার্কিন বাহিনীকে লড়াইয়ে আসতে বাধ্য করেছিল এবং পরাস্ত করেছে। লিবিয়া, সোমালিয়া এবং সিরিয়ায় বিচ্ছিন্ন রঙ্গমঞ্চে ক্ষত-বিক্ষত কুশীলবরা জড়িত ছিল।

ওয়াশিংটন দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর নাটকের কাহিনীটি বেশ পরিচিত- সেটি হলো— দ্রুত আক্রমণ, অপ্রতিরোধ্য শক্তি প্রয়োগ এবং বিজয় ঘোষণা। কিন্তু এবারের যুদ্ধটা একেবারে আলাদা। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হচ্ছে, যে বাহিনী ধারাবাহিকতা এবং পুনরুজ্জীবনে সক্ষম একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পুরোপুরি সংহত। ইরান ২০০৩ সালের ইরাক নয়, ২০০১ সালের আফগানিস্তানও নয়।

ইরানের আছে ভৌগোলিক গভীরতা, জনসংখ্যার গুরুত্ব, সুপ্রতিষ্ঠিত সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং এ অঞ্চলের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার। এটি কয়েক দশক ধরে দেশীয় অস্ত্র শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে। এসব কিছু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের শ্বাসরোধকর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে।

ইরান হলো গভীর উপনিবেশ-বিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এক বিপ্লবের ফসল : যেটি ছিল প্রচণ্ড স্বাধীন জাতীয়তাবাদী এবং আদর্শিক চেতনানির্ভর। ইরান পশ্চিমা-সমর্থিত রাজাকে উৎখাত করেছে। অবরোধের মধ্যেও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় কয়েক দশক ধরে ব্যয় করেছে। নিজস্ব সমরাস্ত্র সরঞ্জাম তৈরি করেছে এবং নিজস্ব জোট গড়ে তুলেছে। এ দেশের নেতৃত্বকে নিছক ‘মোল্লাতন্ত্র’ বলে এক কথায় নাকচ করে দেয়া কোনো বিশ্লেষণ ছাড়া। এটি এক সঙ্কীর্ণ ব্যঙ্গচিত্র, যা বৃহত্তর আমেরিকান প্রবণতার প্রতীক। তারা বোঝে না এমন সমাজকে অবমূল্যায়নের প্রবণতা।

বাগাড়ম্বর ও বাস্তবতা
পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনে সেই ব্যঙ্গচিত্রটি প্রদর্শিত হয়েছিল যেখানে হেগসেথ ইরানি শাসন-ব্যবস্থাকে ‘পাগল’ এবং ‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামিক বিভ্রান্তির উপর নির্ভরশীল’ বলে বর্ণনা করেন। এদিকে, রুবিও ঘোষণা করেন, ইরান ‘উগ্রপন্থী ধর্মীয় নেতা’ দ্বারা পরিচালিত যারা ভূ-রাজনীতির উপর নয়; বরং ‘নিয়তিবাদী ধর্মতত্ত্বের’ (অ্যাপোক্যালিপটিক থিওলজি) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।

এ ধারণা এসেছে, খ্রিষ্টান জায়নবাদীদের সাথে জোটবদ্ধ একটি প্রশাসন এবং বাইবেলের অধিকারে নিমজ্জিত একটি অতি-ডানপন্থী ইসরাইলি সরকার থেকে; যারা ইসরাইলে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আঞ্চলিক ভূখণ্ডগত দাবির ভিত্তি হিসেবে বরাবর ধর্মগ্রন্থ ও ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির কথা বলেন।

কিন্তু এই বাগাড়ম্বরের বাইরে আরো একটি বাস্তবতা লুকিয়ে আছে : ইরান কেবল ইসরাইলের বিরুদ্ধেই লড়াই করছে না। তারা এ অঞ্চলে পুরো মার্কিন ক্ষমতাব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, যারা ইসরাইলি আধিপত্যের পৃষ্ঠপোষক, সরবরাহকারী ও গ্যারান্টর।

তেহরান ইসরাইলকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে না; বরং মার্কিন আধিপত্যের বৃহত্তর কাঠামোর সবচেয়ে সুরক্ষিত স্তম্ভ হিসেবে দেখে। বলপ্রয়োগের সীমারেখা কেবল তেলআবিবে থেমে থাকে না; এটি সরাসরি কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন এবং তার বাইরেও মার্কিন ঘাঁটির বিস্তৃত জালে আঘাত হানে যা ওয়াশিংটনের সামরিক নাগাল বজায় রাখে।

এটি কোনো আকস্মিক উত্তেজনা নয়। ইরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন সম্পদ এবং আমেরিকান বাহিনীকে আশ্রয়দানকারী উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়, তেহরান তার শত্রুকে একটি একক সেনাবাহিনী হিসেবে নয়; বরং মার্কিন লজিস্টিক এবং সামরিক আধিপত্যের উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্বব্যাপী কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে বোঝে।

ইরান এক অসম রণকৌশল বাস্তবায়ন করছে, যা উপসাগরীয় অবকাঠামো, জ্বালানি প্রবাহ এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ, যেটি বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি, বিশেষ করে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা যা ওয়াল স্ট্রিট এবং ওয়াশিংটন উভয়কে জ্বালানি দেয় তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

যদি উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব জ্বালানি ও মুদ্রাবাজার এবং জ্বালানিনির্ভর আমেরিকান আর্থিক স্থাপত্যের উপরও পড়বে।

ওয়াশিংটনের সুয়েজ
এটি এখনো ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে, যা তার সবচেয়ে বেপরোয়া এক প্রেসিডেন্ট পরিচালনা করছেন। এটি ইসরাইলের কাঙ্ক্ষিত নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম নাও দিতে পারে; বরং আরো পরিচিত একটি প্যাটার্ন অনুসরণ করতে পারে: একটি পরাশক্তির আধিপত্য হারানোর ধ্রুপদী গল্প।

আত্মবিশ্বাসের শীর্ষে থাকা সাম্রাজ্যগুলো তাদের নিজস্ব পুরান কাহিনী বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কৌশলগত জ্ঞান ভেবে ভুল করে। নিজেকে এমন বিশ্বাসে আশ্বস্ত করে যে, তাদের শক্তিমত্তা ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে পারে।

কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দুর্বলতার কারণে সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বরং সাম্রাজ্যের পতন হয় নিজেদের শক্তির আত্মম্ভরিতায়। পতন ঘনিয়ে আসে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অহঙ্কার থেকে। ব্রিটেন ১৯৫৬ সালে এই শিক্ষা পেয়েছে, তার স্থায়ী কর্তৃত্বের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে যে; তারা এখনো তার দূরবর্তী উপনিবেশগুলোর ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। লন্ডন সুয়েজ অভিযান শুরু করে। এ শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল একজন বিদ্রোহী আঞ্চলিক কুশীলবকে বশে আনা এবং সাম্রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার।

ইরান হয়ে উঠতে পারে ওয়াশিংটনের সুয়েজ
সুয়েজ আক্রমণ বরং ব্রিটিশ শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দেয়। আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বিরোধিতা দৃঢ় হয়। নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বিভ্রম ভেঙে যায়। এটি ব্রিটেনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণের সূচনা করে। সুয়েজ রাতারাতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়নি। তবে এটি মারাত্মক কিছু প্রকাশ করে : রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতা এবং সংযম ছাড়া শক্তির প্রয়োগ পতন রোধ নয়, ত্বরান্বিত করে।

ইতিহাস খুব কমই বিশদে পুনরাবৃত্ত হয়। তবে এটি তার যুক্তিগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটায়। এখন ইরানও ওয়াশিংটনের জন্য সুয়েজ হতে পারে।

লেখক : মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ, ব্রিটিশ তিউনিসিয়ান লেখিকা

(লেখাটি গত ৪ মার্চ মিডল ইস্ট আইতে প্রকাশিত)

অনুবাদ : মুজতাহিদ ফারুকী