খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রাসঙ্গিকতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুনর্গঠন, সংস্কার, খাত-ভিত্তিক গতিশীলতা আনতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি সঞ্চারক। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বাজারভিত্তিক, রফতানিনির্ভর উন্নয়ন মডেলের দিকে অগ্রসর হয়। বিশেষত নব্বইয়ের দশকে সীমিত উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির ভারে জর্জরিত অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে। তার সরকার শিল্পায়ন, রফতানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উপর জোর দেয়, ফলে বেসরকারীকরণ, টেলিকম, ব্যাংক এবং বীমা খাতে ব্যাপক সংস্কার হয়। একইসাথে দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নেও মনোযোগ দেয়া হয়। খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু খাতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও সংস্কার করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেসরকারি খাত, আর্থিক খাত, বৈদেশিক বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি।

বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার : রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাশাপাশি ব্যক্তি খাত হলো অর্থনীতির মূল। খালেদা জিয়ার শাসনামলে অগ্রগতি হয় পোশাক শিল্পের। নারীদের বিরাট অংশের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রূপান্তর দৃশ্যমান হয়। যদিও এ শিল্পের সূচনা হয়েছিল আশির দশকে, তবে নব্বইয়ের দশকে এসে এটি কাঠামোগত সহায়তা পায়।

এই সময় থেকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, নগদ প্রণোদনা এবং বাণিজ্যিক সহজীকরণমূলক নীতির মাধ্যমে রফতানিকারকদের কার্যকর সহায়তা দেয়া হয়। এ সময় বেশ কিছু সমস্যার বাস্তবভিত্তিক সমাধান করা হয়। শিল্প ক্ষেত্রে কোনো উচ্চাভিলাষী কৌশল ছিল না; বরং বাস্তব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান। ফলে বাংলাদেশ দ্রুত বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। এ সাফল্য পরবর্তী দশকগুলোতেও দেশের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) চালু ছিল অর্থনীতিতে যুগান্তরকারী সিদ্ধান্ত। এটি ছিল একটি টেকসই সিদ্ধান্ত। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পিরিয়ড়। এ সময় দেশের জিডিপি ৫.৪ থেকে ৬.৬ পর্যন্ত উন্নীত হয়।

বাজারভিত্তিক সংস্কার : বিশ্বব্যাংক ও আইএমফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে খালেদা জিয়া বাজার অর্থনীতির দিকে দেশ চালিত করেন, যা ছিল তৎকালীন সময়ের একটি বড় পরিবর্তন।

শিল্পায়ন ও রফতানি : কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে রফতানি ও শিল্পায়নের পথে যাত্রাকে উৎসাহিত করা হয়, যা গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখে। এ সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়। রফতানিতে প্রাণ ফিরে আসে।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য : ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতি গ্রহণ করা হয়।

গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

আর্থিক খাত : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অক্ষুণ্ন রেখেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য খাত উন্মুক্ত করা হয়, যা প্রতিযোগিতা ও আধুনিক ব্যাংকিং চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে। নব্বইয়ের পর খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় আসেন তখন আর্থিক খাত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন (১৯৯১) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন (১৯৯৩) প্রণয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকাঠামো জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়। একই সাথে বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। শুধু তাই নয়, এসব সংস্কার উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো, ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং তদারকি শক্তিশালী করা। যদিও পরবর্তীতে এটি পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, তবু একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও মানব উন্নয়ন : দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে বৃত্তি ও উপবৃত্তি (যেমন— খাদ্য কর্মসূচি) চালু করা হয়।

প্রযুক্তি ও যোগাযোগ : টেলিযোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়। টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নতি হয়।

বৈদেশিক বিনিয়োগ : কাফকো সার প্রকল্পের মতো বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হয়, যা বৈদেশিক বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনে। এ সময় বিশেষ করে সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক জোন তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পায়। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির পরিসর সম্প্রসারিত হয়। একই সাথে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার করার চেষ্টা করা হয়। এসব উদ্যোগ সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি শক্ত করতে ভূমিকা রাখে।

বেসরকারি খাতের বিকাশ, রফতানি বৃদ্ধি এবং গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তবে, নীতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাবের মতো কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও সমালোচিত হয়। খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ১৯৯১ সালের ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন আইন প্রণয়ন। যা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর। সীমিত ও অকার্যকর করকাঠামোর পরিবর্তে একটি আধুনিক, ব্যাপক ভিত্তির রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়া হয়। যদিও বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে। তবু যে যাই বলুন— এই উদ্যোগ রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি শক্ত করেছে। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো বিনিয়োগে এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছিল অপরিহার্য।

বেগম জিয়ার শাসনামলে নারী শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও শিক্ষা অব্যাহত রাখার নীতির ফলে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করে।

আজকের এই সময়ে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলেও সমাধানের নানা সুযোগও রয়েছে। তবে এখনো সমস্যা রয়েছে ব্যাংক খাতে, রয়েছে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থা সংস্কারের গতি ব্যাহত করছে। এসব সমস্যা কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি। এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কার কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

মূলত খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক চিন্তা ছিল একটি রূপান্তরধর্মী প্রক্রিয়া, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আধুনিক, বাজার-ভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সাথে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে বেসরকারি খাত ও মানব উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও জ্বালানি সঙ্কট থাকলেও, অন্যদিকে পোশাক রফতানি, প্রবাসী আয় এবং আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো খাতগুলোতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা একে একটি রূপান্তরকামী মিশ্র অর্থনীতিতে পরিণত করছে, যদিও স্থিতিশীলতা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছে; নতুন এই সরকারের সামনে আছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তাই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থনীতির সমস্যা ও সম্ভাবনার দিকে নজর রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের রেমিট্যান্সের গতি বৃদ্ধি ও প্রবহমান রাখতে দক্ষ জনশক্তি ও কর্মীবাহিনী প্রবাসে পাঠাতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়া হুন্ডি বা অন্য কোনো মাধ্যমে যাতে ফান্ড স্থানান্তরিত না হয়; সেদিকে নজর জোরালো করতে হবে। রফতানিতে শুধু পোশাক খাত নয়, আরো অন্যান্য সম্ভাবনাময়ী পণ্যের রফতানি বাড়াতে হবে। আজকের বাংলাদেশে নানা সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো দুর্নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। আমাদের সম্পদ আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে সৎ, মেধাবী ও দক্ষ যোগ্যতাসম্পন্ন জনশক্তি প্রয়োজন। প্রয়োজন সুনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার
[email protected]