স্বপ্ন যখন স্বয়ম্ভর ও স্বনির্ভর হওয়ার

যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনতে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনোমতে সহজসাধ্য নয় বলে সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক।

শোষণ বঞ্চনা আর বণ্টনে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রাম (১৯৭১) এবং জুলাই আন্দোলনের (২০২৪) প্রকৃত অর্জন বিবেচনায় গত সাড়ে পাঁচ দশকের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির পরীক্ষা পর্যালোচনা স্বয়ম্ভর স্বনির্ভর হওয়ার একটি প্রত্যয় ও প্রতীতি জাগাতে পারে । প্রথমে আত্মমর্যাদা বোধের উদ্বোধন প্রসঙ্গ, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারা, সমতার ভিত্তিতে দেশী-বিদেশী পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির সাথে সখ্য, স্বয়ম্ভর হওয়ার চিন্তাচেতনার চৌহদ্দিতে স্বনির্ভর-সমন্বিত উদ্যোগের প্রেরণার প্রসঙ্গ এসে যায়। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণ, শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ বিবেচনা ও ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টা সব সাফল্যের চাবিকাঠি।

মানবসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসকে সমাজবিজ্ঞানীরা জাতিগত উন্নয়নের প্রেরণা হিসেবে শনাক্ত করেন। স্থান-কাল-পাত্রের পর্যায় ও অবস্থান ভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার প্রেরণা হিসেবে দেশে দেশে জাতীয় নেতৃত্ব আর্থসামাজিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রশ্নে গোটা দেশবাসীকে ভাববন্ধনে আবদ্ধকরণের চেতনা হিসেবে স্বয়ম্ভর এবং স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্নকে সামনে আনতে চাইছেন।

স্বয়ম্ভর ও স্বনির্ভর মানুষই বড় কথা। এই মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতায় সমাজের সমূহ ক্ষতি হয়। মানবসম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি দূরের কথা সমাজ মুখথুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়তা হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ কিংবা মারণাস্ত্রে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে; আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার উদগাতাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্¦ন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমত সহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতিরাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ, না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন।

মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি এবং ভালো-মন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে।

রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে; কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে, সম্পদ প্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ, সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই- চাঁদাবাজি চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলোআনা-টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেয়া আছে; কিন্তু এই সীমা অতিক্রম করলে ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন, ভাগ ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে এই সম্পদ অবৈধ অর্জন, অধিকার বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

রাষ্ট্রের একেকটি দফতর এবং তার কর্মিবাহিনীর একেকজন সদস্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা আছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আত্মস্বার্থসিদ্ধি তথা স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিলে দফতরের ওপর অর্পিত সেবামূলক কাজ কিংবা সম্পদ উৎপাদন হয়ে পড়তে পারে সুদূর পরাহত। দায়িত্ব পালনের নামে অর্জিতব্য রাজস্ব লোপাট হলে, পারিশ্রমিক পরিশোধ বা রাষ্ট্রের ব্যয় বা দায় বেড়ে যাওয়া সত্তে¡ও রাষ্ট্রের রাজস্ব বা সেবা বা আয় না বাড়লে ডেফিশিট বাজেটিংয়ের অনিবার্য পরিস্থিতি তো সৃষ্টি হবে। ব্যক্তির সংসারে ঘাটতি অর্থনীতির যে যন্ত্রণা- রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে তা ব্যাপক বিড়ম্¦নার কারণ। নুন আনতে পানতা ফুরানোর অর্থনৈতিক অবস্থায় সবার সুচারু ভূমিকা পালন যেখানে অনিবার্য বা সেখানে দায়িত্বহীন আচরণেও দুর্নীতির খপ্পরে পড়ার অবকাশ নেই।

দেশাত্মবোধ রাজনীতি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসাবাণিজ্য উন্নয়ন ও শিল্পায়নের প্রশ্নেও বিবেচ্য। বিদেশী সামগ্রীর প্রতি আগ্রহ ও আসক্তি দেশী শিল্পপণ্যের বাজার সঙ্কুচিত করে, দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বিদেশী সামগ্রীর চাহিদায় আমদানি ব্যয় বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের ওপর চাপ পড়ে, তার চেয়ে বড় কথা- এ চাহিদার ফলে বিদেশী শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও সেখানকার কর্মসংস্থানে সহযোগিতা করা হয়। হতদরিদ্র্র ও বেকারত্বের ভারে ন্যুব্জ একটি অর্থনীতির জন্য বিদেশী বিলাসদ্রব্য, ভোগ্যপণ্য আর ফলমূল, গুঁড়া দুধ- এসবের ওপর নির্ভরশীলতা মানে, নিজেদের সার্বিক স্বার্থের সাথে প্রবঞ্চনা। বেনাপোল স্থলবন্দরে আমাদের কাস্টমস হাউজের কার্যক্রম পরিদর্শনকালে একটি আশ্চর্য বিষয় আমার নজরে আসে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও সহকারী পণ্য শুল্কায়ন ও খালাসে বেনাপোলে অপেক্ষায় অবস্থানকালে নিজেদের সাথে আনা চাল ডাল ডিম তেল নুন নিজেদের স্টোভে রান্না করে খায়। আমাকে বলা হলো, তাদের যদি কোনো আইটেম ঘাটতি পড়ে, এমনকি একটি দিয়াশলাই পর্যন্ত তারা সেটি আমাদের এখান থেকে কিনবে না; হেঁটে ভারতীয় অংশে গিয়ে সেখানকার দোকান থেকে ওই জিনিসটি কিনে আনবে। তারা বিদেশী মুদ্রা ব্যয় করবে না। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ অবশ্যই ইতিবাচক, দেশিক ও গঠনমূলক। বন্দরে সে সময় ভারত থেকে প্রত্যাগত এক বাংলাদেশী পরিবারের লাগেজ যখন আমাদের শুল্ক কর্মকর্তারা চেক করছিলেন, তখন দেখলাম বিদেশী মুদ্রা ব্যয় করে তারা এনেছেন বিদেশ থেকে আমসত্ত¡, চুলের ক্লিপ, সাবান-টুথপেস্ট সব। অথচ এসব জিনিস আমাদের দেশে সহজলভ্য। এটি মানসিকতার প্রশ্ন।

দেশের মানুষ দেশে উৎপাদিত সামগ্রী না কিনলে উৎপাদনে উন্নয়ন উৎকর্ষতা আসবে কী করে। দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করে তুলতে দেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশের বিকল্প দেখি না। যে জিনিস দেশে আছে, হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, যে সামগ্রী দেশে উৎপাদিত হয়; কিন্তু সেসবের কোয়ালিটি হয়তো ততটা উন্নত নয়, এমন কিছু সামগ্রী দেশে উৎপাদন করা সম্ভব; কিন্তু উপযুক্ত কাঁচামাল কিংবা উৎপাদন কৌশল হয়তো জানা নেই, হয়তো নেই প্রয়োজনীয় মেশিনারি কিংবা রয়েছে উৎপাদনে উপযুক্ত অবকাঠামো অপ্রতুলতা। সেসব সুযোগ, কোয়ালিটি, প্রযুক্তি, পুঁজির সমাহার ঘটিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশী শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের প্রসারে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তাতে বেকার সমস্যার সমাধান হয়, বিদেশী মুদ্রা ব্যয় কমে এবং জাতীয় আয় বাড়ে।

সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা ঠুনকো কার্যকরণকে উপলক্ষ করে নেয়া পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী ফল বয়ে আনে না। শুধু নিজের মেয়াদকালে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে, পরবর্তী জন পূর্ববর্তী জনের কার্যক্রমকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার রেওয়াজ শুরু হলে টেকসই উন্নতির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় দূরদৃষ্টি রূপকল্প প্রণয়নকারীর, প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ়প্রত্যয় প্রয়োজন হয়। সমস্যা গোচরে এলে ব্যবস্থা নিতে নিতে সব সামর্থ্য ও সীমিত সম্পদ নিঃশেষ হতে দিলে প্রকৃত উন্নয়নে পুঁজি ও প্রত্যয়ে ঘাটতি তো হবেই। তেল আনতে নুন ফুরায় যে সংসারে সেখানে সমৃদ্ধির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

সমস্যাগুলো পরস্পরের মিত্র একটার সাথে একটার যেন নাড়ির যোগাযোগ। আইনশৃঙ্খলার সাথে ব্যক্তিনিরাপত্তার, ব্যক্তিনিরাপত্তার সাথে সামাজিক নিরাপত্তার, সামাজিক নিরাপত্তার সাথে আয় উপার্জনের সব কার্যক্রমের কার্যকারণগত সম্পর্ক রয়েছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চাই আয় উপার্জনের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মক্ষমতাকে, কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা উৎপাদন ও ব্যবসাবাণিজ্যে প্রসার ঘটবে, এটিই প্রত্যাশা। সর্বত্র সেই পরিবেশের সহায়তা একান্ত অপরিহার্য, যেখানে সীমিত সম্পদের ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। একটাকে উপেক্ষা মানে, যুগপৎভাবে অন্য অনেক সমস্যাকে ছাড় দেয়া। সমস্যার উৎসে গিয়ে সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। এ কাজ কারো একার নয়, এ কাজ সবার। সমস্যার মোকাবেলায় প্রয়োজন সমাধানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা পরিপোষণে নয়।

যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনতে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনোমতে সহজসাধ্য নয় বলে সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক। এখানে দ্বিধান্বিত হওয়া দ্বিমত পোষণ কিংবা প্রথাসিদ্ধবাদী বশংবদ বেনিয়া মুৎসুদ্দি মানসিকতার সাথে আপস করার সুযোগ থাকতে নেই। এ ভূখণ্ডে যতগুলো রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্কার কর্মসূচি কিংবা ধ্যানধারণা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাদের কম-বেশি ব্যর্থতার পেছনে ঐকবদ্ধতায় ভাঙন, অন্যায় অনিয়ম দুর্নীতি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে অপারগতা ছিল মুখ্য কারণ।

লেখক : সাবেক সচিব এবং কলাম লেখক