বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনায় একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে— জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই সনদের কি আদৌ কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি আছে? সমালোচকদের একটি অংশ বলছেন— সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করা যায় না; এ জন্য প্রক্রিয়াটি অবৈধ। কিন্তু এ যুক্তি কি সংবিধানের প্রকৃত চেতনা ধারণ করে? নাকি এটি সংবিধানকে জনগণের ওপর বসানোর একটি ভুল প্রচেষ্টা? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে আমাদের সংবিধানের মৌলিক ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে— জনসার্বভৌমত্ব বা জনগণের সর্বোচ্চ ক্ষমতার (পপুলার সভরেইনটি) ধারণায়।
সংবিধান : প্রভু নয়, জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ (এক্সপ্রেশন অব দ্য পিপলস উইল) বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) ও ৭(২) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে— সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর সংবিধান সেই ইচ্ছার গভীর ও আনুষ্ঠানিক প্রকাশ (সোলেম এক্সপ্রেশন)। অর্থাৎ সংবিধান জনগণের ইচ্ছার লিখিত রূপ। এ কারণে ৭(১) ও ৭(২) কেবল সাধারণ বিধান নয়— এগুলো বাংলাদেশের মৌলিক কাঠামো (বেসিক স্ট্রাকচার)।
আইন দর্শনের দৃষ্টিতে : গ্র্যান্ডনর্ম (মূলনীতি) ও জনগণের ইচ্ছা— আইন দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। অস্ট্রিয়ান আইনতাত্ত্বিক হানস কেলসেন তার বিখ্যাত গ্র্যান্ডনর্ম (মূলনীতি/ফাউন্ডেশন্যাল নর্ম) তত্ত্বে বলেন, প্রতিটি আইনি ব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি থাকে— একটি ‘মৌলিক নিয়ম’ যার ওপর পুরো আইনি কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি তখন হয়ে যায় : সেই গ্র্যান্ডনর্ম কী? সংবিধান নিজে, নাকি সংবিধানকে বৈধতা দেয়া জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা (কালেক্টিভ উইল অব দ্য পিপল?)
যদি সংবিধান জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হয় (আর্টিক্যাল-৭ অনুযায়ী), তাহলে যুক্তিগতভাবে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা সেই মৌলিক ভিত্তি— যার উপর সংবিধান দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ, যখন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে জনগণ সংগঠিতভাবে তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করে— গণ-অভ্যুত্থান (পপুলার আপরাইজিং), গণভোট (জনমত প্রকাশ) বা জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে— তখন সেটিকে আইনি কাঠামোর বাইরে একটি বিচ্যুতি হিসেবে না দেখে; বরং সেই গ্র্যান্ডনর্মের পুনঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এভাবে দেখলে, জুলাই সনদ কোনো ‘এক্সট্রা কনস্টিটিউশনাল’ (সংবিধানের বাইরের) ঘটনা নয়; বরং আইনি বৈধতার মৌলিক উৎস-জনগণের ইচ্ছার একটি নবায়িত রূপ।
১৫তম সংশোধনী বাতিলের পর : আর কোনো সাংবিধানিক ‘প্যারাডক্স/বিরূপ অবস্থা’ নেই। একসময় একটি সাংবিধানিক ‘প্যারাডক্সের’ কথা বলা হতো। ৭ অনুচ্ছেদে জনগণকে সর্বোচ্চ বলা হলেও, ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৭ক ও ৭খ কিছু মৌলিক অংশকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করে সেই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের রায়ে ১৫তম সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল হওয়ায় সেই বাধা আর কার্যকর নেই। ফলে আজ বাস্তবতা অনেক বেশি পরিষ্কার— জনগণের ইচ্ছা সর্বোচ্চ। সেই সাথে ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করার কোনো কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা আর বিদ্যমান নেই।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : একটি ‘কনস্টিটিউশনাল মোমেন্ট’ (সাংবিধানিক মুহূর্ত)— আইনবিদদের ভাষায়, ইতিহাসে কিছু সময় আসে যখন একটি ব্যাপক গণ-আন্দোলন সংবিধানকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা বা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করে। এ সময়গুলোকে বলা হয় ‘কনস্টিটিউশনাল মোমেন্ট’ (সাংবিধানিক মুহূর্ত)। এটি কোনো অরাজকতা (অ্যানার্কি/বিশৃঙ্খলা) নয়; বরং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া (রিকগনাইজড ডেমোক্র্যাটিক প্রসেস)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা এর উদাহরণ দেখি। যেমন— কলম্বিয়া (১৯৯১), নেপাল (২০০৬-পরবর্তী সময়) যেখানে গণ-আন্দোলনের চাপে প্রচলিত সংশোধন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে মৌলিক পরিবর্তন (ফান্ডামেন্টাল চেঞ্জ) আনা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পরবর্তীতে সেগুলোকে গণভোট (রেফারেন্ডাম), নির্বাচিত পরিষদ, ইলেক্টেড পার্লামেন্ট বা নির্বাচিত সংসদ ও আদালতের মাধ্যমে বৈধতা দেয়া হয়। এগুলো দেখায়— গণ-অভ্যুত্থান নিজে সংবিধান নয়; কিন্তু এটি সংবিধান পরিবর্তনের বৈধ ভিত্তি (লেজিটিমেট বেসিস) তৈরি করতে পারে— যদি পরবর্তী ধাপগুলো গণতান্ত্রিক ও আইনি পথে সম্পন্ন হয়।
জুলাই সনদ : সংবিধানের সম্প্রসারণ (এক্সটেনশন অব দ্য কনস্টিটিউশন)— জুলাই সনদকে অনেকে এক্সটেনশন অব দ্য কনস্টিটিউশন (সংবিধানের বাইরের) বলে অভিহিত করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এটি সংবিধানের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন একটি ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ পায়। রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছায় (পলিটিক্যাল কনসেনসাস)। গণভোটে জনগণ সরাসরি মতামত দেয়। সেই সাথে পরবর্তী বাস্তবায়নে সংসদ ও আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হয়; তখন এটি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের একটি সক্রিয় প্রয়োগ হয়ে ওঠে। এটি জনগণের কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার তথা সংবিধান রচনার ক্ষমতার প্রকাশ।
আদালতের ভূমিকা : ইতিহাস নির্ধারণের মুহূর্তে (মোমেন্ট অব হিস্ট্রিক্যাল ডিটারমিনেশন)— এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আদালত কিভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন? যদি আদালত ৭(১) ও ৭(২)-এর আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করেন, তাহলে একটি শক্তিশালী যুক্তি দাঁড়ায়— জনগণের ইচ্ছা সংবিধানের উৎস। তাই সেই ইচ্ছার নতুন প্রকাশ উপেক্ষা করা যায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হলে জুলাই সনদ কোনো ‘বহিরাগত ব্যত্যয়/বাহ্যিক বিচ্যুতি নয়; বরং সংবিধানের একটি জীবন্ত ও বিকাশমান রূপ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।
সমালোচকদের যুক্তি : একটি অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি— যারা বলছেন ‘সংবিধানের বাইরে কিছু করা যাবে না’, তারা সংবিধানকে একটি স্থির দলিল হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আধুনিক সাংবিধানিক তত্ত্ব অনুযায়ী, সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল, যা জনগণের ইচ্ছার সাথে সাথে বিকশিত হয়। এখানে ‘কনস্টিটিউশনাল সুপ্রিম্যাসি’ (সংবিধানগত সর্বোচ্চত্ব) জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়।
শেষ কথা : সংবিধানের শক্তি কোথায়— জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল বার্তা ছিল ক্ষমতার উৎস জনগণ। সংবিধান সেই সত্যকে স্বীকৃতি দেয়। তাই সংবিধান ও জনগণকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো একটি ভুল ধারণা। বাস্তবতা হলো— জনগণের ইচ্ছা সংবিধানকে বৈধতা দেয়। আর সংবিধান সেই ইচ্ছাকে কাঠামো ও স্থায়িত্ব (স্ট্রাকচার অ্যান্ড স্ট্যাবিলিটি) প্রদান করে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন সঙ্ঘাত নয়; বরং সমন্বয়— যেখানে জনগণের ইচ্ছা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আইনি বৈধতা একসাথে কাজ করে। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যেখানে জনসার্বভৌমত্ব সুসংগঠিত ও গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ পায়, সেখানে সংবিধান নতুন জীবন পায়।
লেখক : শিক্ষক, আইন বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম



