বেগম খালেদা জিয়া : এক অনমনীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন- তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনমনীয় স্মারক। তার সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ়তার স্মৃতি দেশের গণতান্ত্রিক, আধিপত্যবাদবিরোধী পথ অনুসরণের চেতনাকে দীর্ঘদিন দিকনির্দেশনা দেবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হলেই এক ধরনের নীরব দৃঢ়তার অনুভব হয়। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সংগ্রাম এবং একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক। তার রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতি মানে শুধু ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের ইতিহাস নয়, বরং প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ, অনমনীয় অভিযাত্রা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হলেও, খুব দ্রুতই তিনি নিজস্ব পরিচয়ে আবির্ভূত হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর যে শূন্যতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। একটি পুরুষশাসিত, সামরিক ছায়াচ্ছন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন নারী নেত্রীর সামনে আসা তখনো ছিল এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ।

আশির দশক : স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি

আশির দশকের বাংলাদেশের রাজনীতি মানেই ছিল সামরিক শাসন, মৌলিক অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রের ক্রমাগত সঙ্কোচন। এরশাদ শাসনামলে সংসদ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলো ছিল কার্যত নিয়ন্ত্রিত। এই সময়েই বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠেন।

এই আন্দোলনে তার ভূমিকা অনেক সময় ছিল নীরব, কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক। ১৯৮৩-৯০ সালের আন্দোলনে তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, গৃহবন্দী হয়েছেন, সভা-সমাবেশে বাধার মুখে পড়েছেন। তবু আপস করেননি। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’- এই দুই শব্দেই সীমাবদ্ধ ছিল তার রাজনৈতিক কৌশল, কিন্তু এই স্পষ্টতা আন্দোলনকে দিয়েছে দিকনির্দেশনা।

১৯৮৭ সালের সংসদ বর্জন, ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনের বিরোধিতা এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ইতিহাসে অমোচনীয়। সেই সময় আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তিনি দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। একজন নারী নেত্রী হিসেবে রাজপথে দৃঢ় অবস্থান নেয়া, সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকা এগুলো শুধু রাজনৈতিক সাহস নয়, সামাজিক রীতিনীতিরও চ্যালেঞ্জ ছিল।

১৯৯১ : সংসদীয় গণতন্ত্র ও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়কার রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দৃঢ়তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনমনীয়তা এবং বিরোধী কণ্ঠের প্রতি তুলনামূলক সহনশীলতা তাকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বের প্রতীক করে তোলে। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকারিতা ও গণমাধ্যমের তুলনামূলক স্বাধীনতা- এই সময়গুলোকে অনেকেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শ্বাস নেয়ার সময় হিসেবে বিবেচনা করেন।

সংঘাত, ক্ষমতা ও আপসহীন রাজনীতি

১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সঙ্কট, তত্ত¡াবধায়ক সরকার আন্দোলন এবং ২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা- এই প্রতিটি অধ্যায়ে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখা গেছে আপসহীন অবস্থানে। তার রাজনীতি কখনোই ‘মধ্যপন্থা’র ছিল না; বরং ছিল স্পষ্ট মেরুকরণে বিশ্বাসী। এর ফলে তিনি যেমন প্রবল সমর্থন পেয়েছেন, তেমনি সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।

তার নেতৃত্বশৈলী অনেক সময় ‘কঠোর’, ‘অনমনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের মতো একটি সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই অনমনীয়তাই তাকে টিকিয়ে রেখেছিল।

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়া : একটি পৃথক মূল্যায়ন

বেগম খালেদা জিয়াকে শুধু বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী বা স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের মুখ হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে এবং এই সময়গুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কিছু মৌলিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আবার কিছু বিতর্কও উঠেছে। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকার মূল্যায়ন তাই হওয়া উচিত পৃথক, ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়-প্রসঙ্গনির্ভর।

প্রথমত, ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘ সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের পর নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা কেবল সাংবিধানিক সংস্কার ছিল না; এটি ছিল জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রতীক। এই সিদ্ধান্তে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয় ও অনমনীয়। ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত রাখার সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তিনি তা করেননি- যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল উদাহরণ।

রাষ্ট্র পরিচালনায় তার শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে কার্যকর রাখার চেষ্টা। বিচার বিভাগের আপেক্ষিক স্বাধীনতা, সংসদীয় বিতর্কের সুযোগ এবং গণমাধ্যমের বিস্তৃত পরিসর- এই সময়গুলোতে রাষ্ট্রীয় পরিসরে বহুমত ও বিরোধী কণ্ঠ টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। যদিও এই স্বাধীনতা ছিল সীমাবদ্ধ ও অসম্পূর্ণ, তবুও পরবর্তী সময়ের তুলনায় এটি ছিল বেশি দৃশ্যমান।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকার বাজারমুখী সংস্কারের পথে হাঁটে। বেসরকারীকরণ, শিল্পখাতে উদারীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা তার শাসনামলের অন্যতম দিক। তৈরী পোশাক শিল্পের বিস্তার, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কিছু সূচনা এই সময়েই হয়। তবে একই সাথে দারিদ্র্যবিমোচন, আয় বৈষম্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশ্নে তার সরকার কাক্সিক্ষত সাফল্য দেখাতে পারেনি- এমন সমালোচনাও রয়েছে।

২০০১-০৬ মেয়াদে তার দ্বিতীয় শাসনামল ছিল অনেক বেশি জটিল। এই সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর প্রেক্ষাপট, অভ্যন্তরীণভাবে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাজনৈতিক সহিংসতা রাষ্ট্র পরিচালনাকে কঠিন করে তোলে। যদিও পরবর্তী সময়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও কঠোর অবস্থান নেয়া হয়, তবু এই ইস্যুতে সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা ছিল প্রশাসনিক দুর্বলতা। রাষ্ট্রযন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থতা- এই অভিযোগগুলো তার সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে এটিও সত্য যে, এসব সমস্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সঙ্কটের অংশ, যা কোনো একক শাসকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

পররাষ্ট্রনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া তুলনামূলকভাবে সার্বভৌমত্ব- সংবেদনশীল অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ভারতের সাথে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং ওআইসি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক। বিশেষত মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার করার ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও সক্রিয় ছিলেন।

সবমিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার মূল্যায়ন একরৈখিক নয়। তিনি যেমন সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নেত্রী, তেমনি তার শাসনামল ছিল রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত। কিন্তু তিনি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা সামরিক কর্তৃত্বে রূপ দিতে চাননি। তার নেতৃত্ব ছিল রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক সঙ্ঘাতপূর্ণ কিন্তু অপরিহার্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করাই হবে ইতিহাসের প্রতি সবচেয়ে ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি।

কারাবন্দিত্ব, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা : এক অবিচল অধ্যায়

বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ মানেই কেবল ক্ষমতার দিনগুলোর আলো-ছায়া নয়। বরং তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে করুণ, আবার একই সাথে সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায় হলো দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব, অবহেলা-ঘেরা অসুস্থতা এবং পরিকল্পিত রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতায় ঠেলে দেয়ার এক নিষ্ঠুর সময়কাল। এই অধ্যায়টি তার নেতৃত্বের জৌলুশ নয়, বরং তার চরিত্রের গভীরতা ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রকৃত মাপকাঠি।

ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। এই বন্দিত্ব ছিল কেবল শারীরিক নয়, ছিল রাজনৈতিক ও মানসিকও। আদালত, প্রশাসন ও প্রচারণার সমন্বিত চাপে তাকে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেষ্টা চলেছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতাই তাকে পরিণত করেছিল এক ধরনের নীরব প্রতিরোধের প্রতীকে। ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি ক্ষমতার ভাষায় কথা বলেননি; বরং নীরবতার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন।

এই সময় তার শারীরিক অসুস্থতা ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া, বয়সজনিত জটিলতা এবং মানসিক চাপ- সব মিলিয়ে তার স্বাস্থ্য ছিল গুরুতর ঝুঁকিতে। তবুও এই অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি কোনো রাজনৈতিক আপসের বার্তা দেননি। সহজ মুক্তির বিনিময়ে নীরব সমঝোতার পথ তার সামনে খোলা ছিল- এমন বিশ্বাস বহুজনের। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। এখানেই তার রাজনৈতিক চরিত্রের অনমনীয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পর্বে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন এক ধরনের নৈতিক প্রতীক- যিনি ক্ষমতা হারিয়েও মাথা নত করেননি, যিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও ভেঙে পড়েননি। তার বন্দিত্ব রাজনীতিকে আরেকবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় : ক্ষমতা না নৈতিকতা- কোনটি দীর্ঘস্থায়ী? তার জীবন এই প্রশ্নের এক নিঃশব্দ কিন্তু গভীর উত্তর দেয়।

রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা ছিল এই অধ্যায়ের আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। বহু পুরনো সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক মিত্র ও সুবিধাভোগী মানুষ একে একে দূরে সরে যান। দলের ভেতরেও তার কণ্ঠ অনেক সময় সরাসরি উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা তাকে দুর্বল করেনি; বরং তাকে আরো সংযত ও আত্মমুখী করেছে। তিনি কথা বলার বদলে অপেক্ষা করেছেন, অভিযোগের বদলে নীরবতা বেছে নিয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন প্রচারবিমুখ, আড়ালপ্রিয় ও সংযত। এই বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক জীবনের শেষভাগে এসে আরো প্রকট হয়। তিনি খুব কম কথা বলতেন, সংবাদ সম্মেলন বা দীর্ঘ বক্তব্য এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তার এই নীরবতাই হয়ে উঠত রাজনৈতিক ভাষা। কখনো এই নীরবতা ছিল প্রতিবাদের, কখনো প্রত্যাখ্যানের, আবার কখনো ছিল সময়ের জন্য অপেক্ষা করার এক গভীর সঙ্কেত।

এই নীরবতা ছিল কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং ছিল আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক শালীনতার প্রকাশ। উচ্চস্বরে অভিযোগ বা আবেগের আশ্রয় না নিয়ে তিনি ইতিহাসের কাঠগড়ায় নিজেকে স্থিরভাবে দাঁড় করিয়েছেন। এ কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার এই অধ্যায়- কারাবন্দিত্ব, অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতা- তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ব্যক্তিগত স্মৃতি : একজন রিপোর্টারের চোখে

আমার রিপোর্টিং জীবনে বহুবার ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার বাইরে বেগম খালেদা জিয়ার কর্মসূচি কাভার করার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় পবিত্র মক্কায় ওআইসির স্পেশাল সামিট কাভার করা। প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই মক্কা ও মদিনা সফরে তার সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা, ওমরাহ, তাওয়াফ, নবীজী সা:-এর রওজা মোবারক জিয়ারত এবং রিয়াজুল জান্নাতে নামাজ আদায়ের দৃশ্য খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এ সময় পরম করুণাময়ের ওপর তার অবিচল আস্থা ও নির্ভর করার অনন্যতা দেখা যায়। বিমানে তিনি আমাকে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, যা দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয়। সেই সাক্ষাৎকারে ক্ষমতার অহঙ্কার নয়, বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহির ভাষাই প্রাধান্য পেয়েছিল।

এক অনুপস্থিত উপস্থিতি

আজ যখন বাংলাদেশের রাজনীতি চরম মেরুকরণ, সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক।

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন- তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনমনীয় স্মারক। তার সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ়তার স্মৃতি দেশের গণতান্ত্রিক, আধিপত্যবাদবিরোধী পথ অনুসরণের চেতনাকে দীর্ঘদিন দিকনির্দেশনা দেবে।

তার বিদায়ে একটি অধ্যায় শেষ হলো, কিন্তু ইতিহাসে তার উপস্থিতি থেকে যাবে অনড়, অনমনীয় ও অবিচল।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত