হামলায় ভবন ধ্বংস হতে পারে, ইরানিদের আত্মপরিচয় মুছে ফেলা যাবে না

সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে এবং ব্যক্তিদের নির্মূল করতে পারে। কিন্তু এটি জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। ১৯৫৩ সালের শিক্ষা এখনো প্রতিধ্বনিত হয়। ইতিহাস যদি কিছু শেখায়, তা হলো স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপগুলো প্রায়শই দশকের পর দশক ধরে অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনে। এখন পরবর্তী অপশন বেছে নেওয়া কঠিন। উন্মুক্ত সঙ্ঘাতের পথে এগিয়ে যাওয়া, অথবা উত্তেজনা থামানো এবং কূটনীতিতে ফিরে আসা-ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সীমা পেরুনোর আগেই

সৈয়দ হোসেন মুসাভিয়ান

১৯৫৩ সালের শিক্ষা এখন আগের চেয়েও বেশি অনুরণিত হচ্ছে, কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা দশকের পর দশক ধরে অপ্রত্যাশিত পরিণতির ঝুঁকি তৈরি করছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নতুন করে যৌথ সামরিক হামলা ইতোমধ্যেই অস্থিতিশীল সঙ্ঘাতের মধ্যে নাটকীয়ভাবে বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

এর আগে ২০২৫ সালের হামলার পর থেকে কয়েক মাসের উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা এই অঞ্চলকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে যখন অগ্রগতির লক্ষণ দেখা গেছে বলে জানা গেছে, ঠিক তখনই বলপ্রয়োগের ঘটনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বৈধতা, যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে জরুরি প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে যে এবারের মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক অভিযান জাতিসঙ্ঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসঙ্ঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুসারে, আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে অথবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া, যেকোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি বা বলপ্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি এবং আন্তর্জাতিক আইনবিদরা দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে আসছেন যে প্রতিরোধমূলক বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ জাতিসঙ্ঘ সনদের আওতাবহির্ভূত।

ওয়াশিংটন এবারই প্রথম ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে আচরণের জন্য অভিযুক্ত হয়েছে এমন নয়। ২০১৮ সালে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ইউরোপীয় সরকার এবং রাশিয়া ও চীনসহ অন্যান্য স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এই প্রত্যাহারের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল।

এখন, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলার মাধ্যমে, ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘ সনদের মূল নীতিগুলো লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশেষ করে সার্বভৌমত্ব, বলপ্রয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক চেতনা
বর্তমান ঘটনাবলীর ওপর ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করে।

সেই হস্তক্ষেপের পরিণতি কয়েক দশক ধরে ইরানের রাজনৈতিক চেতনাকে প্রভাবিত করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সরাসরি প্রভাব পড়ে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব এবং তার পরপরই তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং জিম্মি সঙ্কট, ইত্যাদি ঘটনার কারণ এই প্রেক্ষাপট না জানলে বোঝা সম্ভব নয়।

সাত দশকেরও বেশি সময় পরে, ১৯৫৩ সালের ছায়া এখনো মার্কিন-ইরান সম্পর্কের ওপর ঝুলছে। কিন্তু এবার, ঝুঁকি আরো বেশি বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে। অভিযানের সময়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে।

এখন পছন্দটি স্পষ্ট : খোলামেলা সংঘর্ষের পথে এগিয়ে যাওয়া অথবা উত্তেজনা থামিয়ে কূটনীতিতে ফিরে আসা-অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আগে।

একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্যবস্তু করা একটি গভীর উত্তেজনার লক্ষণ। এটি প্রতিরোধ ক্ষমতা বা সীমিত সামরিক লক্ষ্যের বাইরে চলে যায় এবং প্রকাশ্য শাসন-পরিবর্তন নীতির ক্ষেত্রে প্রবেশ করে। তাই ধরে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত যে, এই পদক্ষেপের নেতিবাচক পরিণতি ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের চেয়েও বিস্তৃত এবং সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক হামলা এবং এই সপ্তাহান্তে শুরু হওয়া আক্রমণ, উভয়ই এমন মুহূর্তে ঘটেছিল যখন আলোচনা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল।

ওমান ছিল একজন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী, পরোক্ষ আলোচনার সুবিধা প্রদানকারী। ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয় যে সামরিক পদক্ষেপ কূটনৈতিক গতির সাথে মিলে গেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, কূটনীতি কার্যকরভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, সম্ভবত অনির্দিষ্টকালের জন্য।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, আমেরিকা প্রকৃত কূটনীতি হিসেবে আলোচনা চালায়নি, বরং যুদ্ধ-প্রস্তুতির আড়াল হিসেবে আলোচনার সুযোগ নিয়েছে। আলোচনার শিখরে যখন বোমা পড়ে, তখন আস্থার সব জায়গা ভেঙে যায়।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পরিণতি ইরানের একজন রাজনৈতিক নেতার হত্যার চেয়েও অনেক গুরুত্ববহ হবে। শিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে তিনি রাজনৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিছু শিয়া ধর্মগুরু ইতোমধ্যেই প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন, ইরানের কোমে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ নাসের মাকারেম শিরাজি বলেছেন, খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেয়া ‘বিশ্বের সব মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য।’

পাকিস্তান ও ইরাকে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই হামলা হয়েছে, যার ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ওয়াশিংটন এখন বিশ্বব্যাপী শিয়া জনগোষ্ঠীর কিছু অংশের দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক বৈরিতার সম্ভাবনার মুখোমুখি হতে হবে। এটি এমন একটি সঞ্চারমান গতি যা কেবল সামরিক উপায়ে মোকাবেলা করা যাবে না।

অসাধারণ কৌশলগত খরচ
সামরিক আক্রমণের কারণে সরকারের পতন কোনো সহজ বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ফলাফল বয়ে আনে না। এমনকি যদি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব তেহরানে রাজনৈতিক রূপান্তর আনতে সফল হয়ও, তবুও অপরিসীম কৌশলগত মূল্য চুকাতে হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো, এই অঞ্চলজুড়ে প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হয়েছে। আমেরিকান মর্যাদার ওপর এর প্রভাব ১৯৭৯-৮১ সালের জিম্মি সঙ্কটের ফলে সৃষ্ট প্রতীকী ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সময়ে, ইসরাইল এবং ইরান এমন এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে যাকে কেবল অস্তিত্বগত সঙ্ঘাতের পর্যায়েই বর্ণনা করা যেতে পারে। ইরান মারাত্মক সামরিক ক্ষতি সহ্য করেছে, অন্যদিকে ইসরাইল ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার ভূখণ্ডে সবচেয়ে তীব্র হামলার মুখোমুখি হয়েছে।

ইরানের ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরাইলের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরও তার নিরাপত্তা স্থাপত্যের দুর্বলতাগুলো প্রকটিত করে দিয়েছে। প্রতিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু- অভেদ্যতার ধারণা উভয় পক্ষকেই নাড়া দিয়েছে।

তবুও খামেনির হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, রূপান্তর প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশা ভুল প্রমাণ হতে পারে।

মার্কিন-ইসরাইলের এই মনোভাব বেশ কয়েকটি কারণে উদ্বেগজনক। প্রথমত, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে তারা ইরানের শাসন কাঠামোর মধ্যে একটি লাল রেখা অতিক্রম করেছে। দ্বিতীয়ত, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, এর লক্ষ্য হলো শাসনব্যবস্থার পতন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সঙ্ঘাতকে অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ইরানের প্রতিক্রিয়াকে জাতীয় অস্তিত্বের প্রতিরক্ষা হিসেবে অভ্যন্তরীণভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, যেমনটি আশা করা হয়েছিল, সঙ্ঘাতটি আঞ্চলিক হয়ে উঠেছে। ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সংঘর্ষের ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হয়েছে। এই গতিপথটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক : উত্তেজনা পাল্টা-উত্তেজনা তৈরি করে, কারণ প্রতিটি পক্ষই তাদের পদক্ষেপকে প্রতিরক্ষামূলক বলে ন্যায্যতা দেয়। প্রতিটি বিনিময়ের সাথে ভুল গণনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা এতে জড়িয়ে পড়ে। কূটনৈতিক স্থান সঙ্কুচিত হয়।

আরও বিপর্যয় রোধ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এখনই তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই সঙ্ঘাত যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এটি নিয়ন্ত্রণ করা তত কঠিন হবে।

সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে এবং ব্যক্তিদের নির্মূল করতে পারে। কিন্তু এটি জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। ১৯৫৩ সালের শিক্ষা এখনো প্রতিধ্বনিত হয়। ইতিহাস যদি কিছু শেখায়, তা হলো স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপগুলো প্রায়শই দশকের পর দশক ধরে অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনে।

এখন পরবর্তী অপশন বেছে নেয়া কঠিন। উন্মুক্ত সঙ্ঘাতের পথে এগিয়ে যাওয়া, অথবা উত্তেজনা থামানো এবং কূটনীতিতে ফিরে আসা-ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সীমা পেরুনোর আগেই।

লেখক : ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির প্রাক্তন প্রধান এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং রিসার্চ সহযোগী

‘মিডল ইস্ট আই’ থেকে অনুবাদ মুজতাহিদ ফারুকী