মুসলিম বিশ্ব ও ইসলামের কাজ

আজকের মুসলিম বিশ্ব নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, উন্নত শিক্ষা, সুশাসন, ঐক্য এবং সর্বোপরি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। প্রতিটি মুসলমানকে তার নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং সব মুসলিম জাতিকে একসাথে কাজ করতে হবে। একমাত্র তখনই মুসলিম বিশ্ব আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে এবং মানবতার কল্যাণে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বিশ্বে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি, যা বিশ্ব জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি। সংখ্যায় শক্তিশালী হলেও মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে নানা জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও মুসলিম স্কলাররা বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্কটকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন।

মুসলিম বিশ্বের অবস্থা
মুসলিম বিশ্ব এবং মুসলিম মানস আজ বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত। ঐতিহ্যগতভাবে এক রজ্জুবন্ধনে জড়িত মুসলমানরা আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য প্রতিক্রিয়ার তালাশ করছে। মুসলিম বিশ্ব বহুস্তরীয় সঙ্কটের মুখোমুখি : যেমন, সক্রিয় যুদ্ধ : গাজা, সুদান, ইয়েমেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতন, সোমালিয়ায় যুদ্ধ, ইথিওপিয়া অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত, সিরিয়ায় সংঘাত-পরবর্তী অস্থিতিশীলতা। মারাত্মক মানবিক সঙ্কট : সুদান (বিশ্বের বৃহত্তম), গাজা, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প, সাহেল অঞ্চল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানান্তর : সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি : সিরিয়া (বৃহত্তম শরণার্থী সঙ্কট), রোহিঙ্গা (বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জনসংখ্যা), সুদান, সোমালিয়া। বাংলাদেশ কোনো সংঘাতের মধ্যে না থেকেও, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে। সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

বিশ্বে মুসলিম সমাজগুলো দারিদ্র্য ও শিক্ষার দৈন্যে জর্জরিত। তারা ধর্মীয় বাড়াবাড়ি ও বিপথগামী মতবাদের শিকার হচ্ছে। আরো বড় সমস্যা ধর্মীয় বিষয়ে কোনো জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা ইসলাম ও শরিয়া আইন নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করছে। সারা মুসলিম বিশ্বেই এ অবস্থা। কার্যকর মুসলিম সমাজ, প্রতিষ্ঠান, যোগ্য নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে নানা সন্দেহ ও অবিশ্বাস উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সঙ্কট লেগেই আছে
বিশ্বব্যাপী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এবং রাষ্ট্রে নানা সঙ্কট চলমান রয়েছে। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বেদনাদায়ক সমস্যা হলো ফিলিস্তিন, বিশেষত গাজার পরিস্থিতি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ২০২৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং এর ফলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি শিশু। আহত হয়েছে আরো এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার ১৯ লাখ মানুষ, যা জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ, বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অনেকে বারবার তাদের বাস্তুত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গাজা শহরে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে। সমগ্র গাজার জনগণ মারাত্মক খাদ্য সঙ্কটের মুখে রয়েছে। অপুষ্টির কারণে ৪৬৩ জন ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে ১৫৭ জন শিশু, মৃত্যুবরণ করেছে। মানুষ খাদ্য সহায়তা নিতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে। অনেক শিশু রাস্তায় ক্ষুধার কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে। শীতকালে ঝড়ো বৃষ্টি এবং শীতের তীব্রতায় অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পরও ১০০ এর বেশি শিশু মারা গেছে এবং আসল সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে গাজায় গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জাতিগত নিধন চালানোর দায়ে ইসরাইলকে অভিযুক্ত করেছে। জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিশন সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইসরাইলের গণহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ফিলিস্তিন ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সঙ্কট বিদ্যমান। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, কাশ্মিরে ভারতীয় দখলদারিত্ব এবং জিনজিয়াংয়ের উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠী নিপীড়ন, গণআটক, আত্তীকরণ এবং সাংস্কৃতিক গণহত্যার মুখোমুখি হওয়া উম্মাহর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সব জায়গায় মুসলমানরা মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নির্যাতন ও অবিচারের শিকার।

পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম ভীতি বাড়িছে। মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং মুসলিম সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এসব সঙ্কটের জন্য কিছু মৌলিক কারণকে দায়ী করা হয়েছে। প্রথমত, মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম। গবেষণায় দেখা যায়, মুসলিম দেশগুলোর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এই অশিক্ষা ও নিরক্ষরতা সমাজে পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার এবং সঠিক ইসলামী জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না এবং মুসলিম বিশ্ব এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক। প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের মধ্যে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ বৃদ্ধি এবং চরমপন্থার বিকাশে ভূমিকা রাখে। অনেক মুসলিম দেশে সম্পদের অসম বণ্টন রয়েছে, যেখানে একদল ধনী সব সুবিধা ভোগ করে এবং সাধারণ জনগণ মৌলিক চাহিদা পূরণেও সক্ষম হয় না। তৃতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে গণতন্ত্রের অভাব এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। অনেক মুসলিম দেশে সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে। এই অবস্থা রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং জনগণের অধিকার হরণের জন্ম দেয়। মানুষ যখন মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে। চতুর্থত, ধর্মীয় বিরোধ ও মতপার্থক্য মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, বিভিন্ন মাজহাব ও ফিকহি মতভেদ মুসলমানদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বাধা দিচ্ছে।

ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা যা থাকা উচিত
বিশ্বব্যাপী মুসলিম স্কলাররা সমাধানের পথনির্দেশ করেছেন। উম্মাহকে চিন্তা ও পদক্ষেপে সৃজনশীল এবং সাহসী হতে বলেছেন। প্রয়োগধর্মিতা ও প্রভাব বিস্তার করতে হলে আরো বিভিন্নমুখী কার্য সম্পাদনে ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের অবস্থান পুনঃস্থাপন করতে হবে, শুধু ঐতিহ্যের নীরব বাহক হিসেবে নয়, উম্মাহ এবং মানবজাতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার উপযোগী উদীয়মান এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন পণ্ডিত ও চিন্তাশীলদের নেটওয়ার্ক হিসেবে জেগে উঠতে হবে। এসব কাজের আনজাম দিতে যেসব কাজ করতে হবে তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে : ১. শিক্ষা। মুসলিম বিশ্বে শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত জরুরি। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স এবং মানবিক শিক্ষায় মুসলমানদের এগিয়ে যেতে হবে। এরপরই আসে ২. সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারগুলোকে জনগণের প্রভু নয়, সেবক হতে হবে। দুর্নীতি দূর করতে হবে এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ হলো ৩. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সব মাজহাব ও মতের মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে হবে। ইসলামের মূল শিক্ষা এবং আকিদায় সবাই এক। তাই সবার উচিত বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

আনোয়ার ইব্রাহিমের মতে, জ্ঞান সুসংহত করার ওপর জোর দিতে হবে যাতে এর শাখা-প্রশাখাকে এক কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায়। পরের ধাপ হলো ৪. বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎকর্ষ সাধন। মুসলিম বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎকর্ষ সাধনের জন্য বিশেষায়েত প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বিস্তৃতভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে। মুসলিম পণ্ডিত, চিন্তাবিদ এবং গবেষকদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে যারা সমসাময়িক সমস্যার ইসলামী সমাধান খুঁজে বের করতে পারবে। শুধু অতীতের ঐতিহ্য নিয়ে বসে না থেকে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ইসলামের শিক্ষা প্রয়োগ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো ৫. ইসলামের সঠিক শিক্ষা নতুন প্রজন্মকে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব। তাদের মধ্যে দ্বীনি ফরজসমূহ, ইসলামী নীতি, চরিত্র ও আদর্শ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। খোদাভীতি না থাকলে ভালো শাসক হওয়া যায় না। তাদের বোঝাতে হবে যে মানবজীবনের জন্য কল্যাণকর আদর্শ একমাত্র ইসলামী আদর্শ।

আশাবাদের আলো
বর্তমান পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, মুসলমানদের হতাশ হওয়া উচিত নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানরা বহুবার কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছে। মুসলমানদের উচিত মুসলিম কোনো দেশ যেন ভিন্ন কোনো দেশকে নিপীড়িন না করে। এজন্য প্রথমেই দরকার মুসলিম সম্মিলিত বাহিনী গঠন। তুরস্কের এরদোগান যৌথ সেনাবাহিনী গঠনের জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছেন, এখনো সফল হননি। মিসরের আল সিসিও আরব বাহিনী গঠনের জন্য সম্মেলন ডেকেছিলেন। কিন্তু ঐকমত্য না হওয়ায় সেটি গঠিত হয়নি। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি মুসলিম দেশকে তার নিজের অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে।

পরিশেষ
আজকের মুসলিম বিশ্ব নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, উন্নত শিক্ষা, সুশাসন, ঐক্য এবং সর্বোপরি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। প্রতিটি মুসলমানকে তার নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং সব মুসলিম জাতিকে একসাথে কাজ করতে হবে। একমাত্র তখনই মুসলিম বিশ্ব আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে এবং মানবতার কল্যাণে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার