ডা: মো: এনামুল হক
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারী প্রশ্ন যেন এক দীর্ঘ বিতর্কের নাম। সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে নারীকে ঘিরে ধারণা, মূল্যবোধ ও অধিকারও পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক যুগে এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে ঋবসরহরংস বা নারীবাদ। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার প্রশ্নটি নতুন নয়; বরং এটি মানবসভ্যতার প্রাচীন সঙ্কটগুলোর একটি। আর সেই সঙ্কটের এক গুরুত্বপূর্ণ সমাধান নিয়ে এসেছিল ইসলাম।
রাসূল মুহাম্মদ সা:-এর আগমনের পূর্ববর্তী যুগকে আরব ঐতিহাসিকরা ‘জাহিলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলে অভিহিত করেছেন। সে সময় আরব সমাজে নারী ছিল সামাজিকভাবে অবমানিত ও অধিকারবঞ্চিত। কন্যাসন্তান জন্ম নিলে অনেক পরিবার লজ্জা ও অপমানের ভয়ে তাকে জীবন্ত কবর দিতো। নারীর কোনো উত্তরাধিকার ছিল না, কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না; বরং অনেক ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য করা হতো।
এই চিত্র কেবল আরব সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পৃথিবীর বহু সমাজেই নারীকে অবমাননাকর অবস্থায় রাখা হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, মধ্যযুগীয় ইউরোপের বহু খ্রিষ্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক নারীকে ‘পাপের দরজা’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন ইহুদি ঐতিহ্যের কিছু ব্যাখ্যাতে ও মধ্যযুগীয় রাব্বিনিক সাহিত্যে (বিশেষত ঞধষসঁফ) নারীর মর্যাদা সম্পর্কেও এমন কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়, যেগুলো আধুনিক দৃষ্টিতে সমালোচিত হয়েছে। ইড়ড়শ ড়ভ এবহবংরং-এর কাহিনীতে দেখা যায়, হাওয়া (ঊাব) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার ঘটনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
একইভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু প্রাচীন সামাজিক রীতিতেও নারীর স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল এক ভয়াবহ প্রথা— সতীদাহ। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে তার স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের স্বেচ্ছায় নয়; বরং সামাজিক চাপ বা জোরপূর্বক সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করা হতো। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সতীদাহের ঘটনা এতটাই প্রচলিত ছিল যে, পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন আইন করে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, বহু তরুণী নারী স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথেই সমাজের চোখে ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়তেন এবং সেই অমানবিক প্রথার শিকার হতেন।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেই মানব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। সপ্তম শতকে আরবের মরুভূমিতে আবির্ভূত হন নবী মুহাম্মদ সা:। তার কাছে পাঠানো ঐশী দ্বীন যা নারীকে স্পষ্ট ভাষায় মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দেয়। কুরআন ঘোষণা করে— ‘সমস্ত মানুষ এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি’। এই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল মানবসমাজে নারী-পুরুষের মৌলিক সমতার ধারণা। নারীকে দেয়া হয় উত্তরাধিকার, সম্পত্তির মালিকানা, বিয়ে সম্মতির অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা। ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন।
নবী মুহাম্মদ সা: শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি; তিনি বাস্তব সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজা রা: ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তার আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে আয়েশা রা: ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক অনন্য উদাহরণ। তার কাছ থেকে অসংখ্য সাহাবি ইসলামী শিক্ষা লাভ করেছেন। সাহাবিদের যুগে নারীরা শুধু গৃহজীবনে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা সমাজকল্যাণ, শিক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছেন। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা করেছেন, কেউ জ্ঞানচর্চায় অবদান রেখেছেন। ইতিহাসবিদরা প্রায়ই উল্লেখ করেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন একটি সময় খুব কমই এসেছে, যখন নারী এত সম্মান ও নিরাপত্তা একসাথে উপভোগ করেছে।
কিন্তু ইতিহাসের ধারায় সব সমাজ সেই আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি। যখন কোনো সমাজে ঈমান, নৈতিকতা ও ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন নারী আবারো অবমাননার শিকার হয়। মুসলিম নামধারী অনেক সমাজেও অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে নারীর প্রতি অবিচার দেখা গেছে। এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুতির ফল। পশ্চিমা বিশ্বেও নারীর প্রতি অবিচারের ইতিহাস কম নয়। শিল্পবিপ্লবের যুগে নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তারা দীর্ঘদিন কম মজুরি ও কঠিন শ্রমের শিকার হয়েছেন। সেই বৈষম্যের প্রতিবাদ থেকেই আধুনিক নারীবাদের জন্ম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নারীবাদের একটি অংশ ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরোধিতায় রূপ নেয় এবং বিশেষভাবে ইসলামের নৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করতে শুরু করে।
আধুনিক পশ্চিমা সমাজে নারীর স্বাধীনতার ধারণা অনেক সময় চরম ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে স্বাধীনতা প্রায়ই ব্যাখ্যা করা হয় সীমাহীন ভোগবাদ, শরীরী উন্মুক্ততা, সামাজিক নিয়মের অবজ্ঞা হিসেবে। একই সাথে আধুনিক পশ্চিমা আলোচনায় লিঙ্গ পরিচয়ের পুনর্নির্মাণ, ট্রান্সজেন্ডার বিতর্ক, সহবাস-ভিত্তিক সম্পর্ক বা সমলিঙ্গ বিয়ের মতো বিষয়গুলোও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। কিন্তু এই স্বাধীনতার মধ্যেও নতুন ধরনের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, একক মাতৃত্ব বাড়ছে, মানসিক চাপ ও নিঃসঙ্গতা বেড়ে যাচ্ছে। অনেক নারী একই সাথে কর্মজীবন, পরিবার ও সন্তান পালনের ভার বহন করতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকেই মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়ন মানেই ধর্মীয় ও পারিবারিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। ফলে নারীবাদের নামে কখনো কখনো এমন ধারণাও প্রচারিত হয়, যা ইসলামের সামাজিক কাঠামো ও সমাজের নৈতিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের আলোচনায় প্রায়ই মনে হয়, সমাজ ও পরিবারের যে কাঠামো ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটিই যেন প্রধান বাধা। এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় আমাদের সমাজেও।
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। ইসলাম নারীকে একদিকে সম্মানিত মা, অন্যদিকে মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শালীনতা ও নৈতিকতার কাঠামোর ভেতরে থেকে নারী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, ব্যবসায়-বাণিজ্যে অংশ নিতে পারে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে নেতৃত্ব দিতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ইসলামী সমাজ পশ্চিমা ধারণার সব উপাদান গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তখনই অনেকের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে— নারী অধিকার নাকি এখানে নেই।
অথচ বাস্তবে অসংখ্য নারী ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যেই নিরাপত্তা ও সম্মান অনুভব করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— অধিকার বলতে কি কেবল সেই ধারণাগুলোকেই বোঝানো হবে, যা পশ্চিমা সমাজে প্রচলিত? নাকি অধিকার এমন এক ধারণা, যা সমাজের নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিকশিত হয়? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরো জটিল হয়ে ওঠে। এ দেশের বহু ইসলামপন্থী সংগঠন ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নারীরা সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করছেন, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন। তবু কিছু বুদ্ধিজীবী মহল এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রায়ই ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে নারী অধিকার অস্বীকারের অভিযোগ তোলে।
এই দ্বৈত বাস্তবতা সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ একই সময়ে আমরা এমন ঘটনাও দেখি, যেখানে মতের অমিলের কারণে নারীকে প্রকাশ্যে আঘাত করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাদের কারণে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কিংবা সমাজে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। তবু বিস্ময়করভাবে কখনো কখনো সেই একই সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদেরকেই নারীর প্রকৃত রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে এবং প্রচলিত আধুনিক নারী সেই ভক্ষকদের কাছেই নিজেদের নিরাপদের বয়ান তোলে।
ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক সত্য শিখিয়ে দেয়— নারীর মর্যাদা কেবল স্লোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক ভিত্তি, পারিবারিক স্থিতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। ইসলাম সেই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোই মানবসমাজকে উপহার দিয়েছে। অতএব নারীর মর্যাদা নিয়ে সমসাময়িক বিতর্কের ভিড়ে হয়তো নতুন করে ফিরে দেখা দরকার সেই ইতিহাসকে— যেখানে অন্ধকার যুগের অবমাননা পেরিয়ে নারী প্রথমবারের মতো মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা পেয়েছিল ইসলামের আলোয়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ



