ভাষার রাজনীতি রাজনীতির ভাষা

ভাষার রাজনীতির সাথে রাজনীতির ভাষার দূরতম সম্পর্ক নেই। স্বাভাবিকভাবেই দুয়ের মধ্যে যোজন দূরত্ব। দুটোকে একইভাবে দেখা কখনোই সমীচীন হবে না। ভাষার প্রচার, উন্নতি, আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। এদের পাশ কাটিয়ে কোনো শব্দকে ভাষায় আত্মীকরণ করা বা বর্জন করা উচিত নয়। ভাষাবিজ্ঞানী, ভাষা তত্ত্ববিদরা এ ব্যাপারে মতামত দেবেন। ব্যাপারটি নিতান্তই তাদের বিবেচ্য। এটিকে রাজনীতিকীকরণ করলে নিজের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভাষাবিদরাই ভাষার উন্নয়ন, অগ্রগতি, শব্দচয়নের কাজটি করলে মানানসই হয়— রাজনীতিবিদরা নয়

ভাষার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো অন্য ভাষা থেকে শব্দ আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধকরণ। পৃথিবীতে প্রচলিত প্রতিটি ভাষাই এই বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি প্রযোজ্য। নইলে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত প্রায় ২ শতাংশ দেশী শব্দ নিয়ে এই ভাষার এতদিন হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। বাংলা ভাষা টিকে আছে আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ফরাসিসহ কমবেশি পৃথিবীর তাবৎ ভাষার শব্দ চয়ন করে নিজেকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে। আত্তীকরণ করেছে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে। দরজা, জানালা, চেয়ার, টেবিল, বই, যেমন বিদেশী শব্দ, তেমনি— স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ইত্যাদিও অন্য ভাষাজাত। এদের সাথে চাপরাশি, পিয়ন, দফতরি-কেরানি কোনোটাই বাংলাভাষার নিজস্ব শব্দ নয়। নিজস্ব শব্দ নয় আমি, তুমি, সে, জাতীয় শব্দমালা। নিজস্ব এবং আহরিত শব্দমালা নিয়েই বাংলা ভাষার গর্বিত অবস্থান। রিকশা, বাস, ট্রেন, মেট্রোরেল আজ তাই বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দমালায় পরিণত। বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দের যেমন প্রাচুর্য রয়েছে; তেমনি রয়েছে ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত শব্দের সহাবস্থান। এসব শব্দ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনা প্রবাহে বাংলা ভাষায় সংযুক্ত হয়েছে। বাংলা ভাষাকে জানতে ও বুঝতে গিয়ে এসব শব্দ অস্বীকার করার অর্থ ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ রোধ করা।

আমাদের সামাজিক জীবনে বিয়েশাদি, দাওয়াত, দোয়া, মুনাজাত, মসজিদ, মন্দির, নামাজ, রোজা— এসব শব্দকে ধারণ না করলে যেমন জীবন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তেমনি বাংলা ভাষায় রচিত বাংলা সাহিত্যের অমর উপাখ্যানগুলোও অন্ধকারেই থেকে যায়। জাতীয় কবির মহররম কবিতায় ব্যবহৃত শব্দমালায় বাংলা শব্দের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। কিন্তু ফারসি শব্দমালার ছন্দময় ব্যবহারে কোনো পাঠকই এটি বুঝতে অসুবিধায় পড়েন না। বিদ্রোহী কবিতাও এই বৈশিষ্ট্যে নন্দিত। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে ব্যবহৃত সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্যে বিস্মিত হতে হয়। অথচ এতে পাঠকের বিষয়টি বুঝে ওঠার কোনো অসুবিধা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এমনিভাবে বাংলা ভাষায় অবলীলাক্রমে জায়গা করে নিয়েছে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ঐতিহাসিক পটভূমিকায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে উচ্চারিত ইনকিলাব শব্দটি পরে এ দেশের সব রকমের স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ‘বন্দে মাতরম’-এর সাথে সাথে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ আজো ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়। এই শব্দের প্রতি অবজ্ঞা তা তাচ্ছিল্য বাংলা ভাষারই অপমান নয়, অতীতের স্বাধীনতা সংগ্রামগুলোকেও অবমাননা করা হয়। ইনকিলাবের বরপুত্র হয়ে যারা ইনকিলাবকে It is not my language বলেন তাদের ক্ষেত্রে সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হালিমের লেখা, ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট। বস্তুত রাজনীতির ভাষা এবং ভাষার রাজনীতি একীভূত করে ফেললে এই দুর্দশার সৃষ্টি হয়। ভাষার রাজনীতি মানুষকে উচ্চকিত করতে ও পরিশীলিত হতে শেখায়, সমৃদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করে। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ আমাদের ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে কখনো কোথাও অন্যভাষার প্রতি বা অন্য ভাষার শব্দাবলির প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে বলে কেউ বলতে পারেন না। শুধু বাংলা ভাষার মর্যাদা উচ্চকিত করতে, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছিল এই আন্দোলন। অন্যদিকে রাজনীতির ভাষা হচ্ছে চটকদার শব্দের সমারোহ। প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যাওয়া।

ভাষার রাজনীতির সাথে রাজনীতির ভাষার দূরতম সম্পর্ক নেই। স্বাভাবিকভাবেই দুয়ের মধ্যে যোজন দূরত্ব। দুটোকে একইভাবে দেখা কখনোই সমীচীন হবে না। ভাষার প্রচার, উন্নতি, আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। এদের পাশ কাটিয়ে কোনো শব্দকে ভাষায় আত্মীকরণ করা বা বর্জন করা উচিত নয়। ভাষাবিজ্ঞানী, ভাষা তত্ত্ববিদরা এ ব্যাপারে মতামত দেবেন। ব্যাপারটি নিতান্তই তাদের বিবেচ্য। এটিকে রাজনীতিকীকরণ করলে নিজের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভাষাবিদরাই ভাষার উন্নয়ন, অগ্রগতি, শব্দচয়নের কাজটি করলে মানানসই হয়— রাজনীতিবিদরা নয়।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]