যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলায় ইরানের নাগরিকসহ বহু হতাহত বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন যা চলছে তা সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতি, যা বিশ্ব নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। মার্কিন ও ইসরাইলি আক্রমণের জবাবে ইরান বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এতে কেবলই ইসরাইল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরান ২৭টিরও বেশি মার্কিন ঘাঁটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা বলেছে। এ ধরনের বড় পরিসরে জবাবি হামলা ঐতিহাসিকভাবে বিরল। উভয়পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জড়িয়েছে। এর মানে এই সংঘাত সীমান্তে ও সীমিত পরিসরে থাকেনি। একটি সক্রিয় ও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অনেক দেশ, ভূরাজনৈতিক অঞ্চল ও সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য বানানো হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ওপর বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। বেসামরিক হতাহত বাড়ার আশঙ্কা আছে। ট্রমা কেয়ার স্বল্পতা, রক্ত ও ওষুধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়তে পারে বিশেষত শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশান্তরী হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী চাপ বাড়লে আঞ্চলিক মানবিক ব্যবস্থাপনায় টান পড়বে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসঙ্ঘ ও রেডক্রসের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি-তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই মূল্যের প্রভাব পড়ছে। দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে যদি সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হয় বা হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিকভাবে জ্বালানি, শেয়ার বাজার ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা বাড়ছে। অনেক দেশ এখন কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে, কারণ সঙ্ঘাত দীর্ঘ হলে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা সঙ্কট
বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অস্থিতিশীল হলে তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে। লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদনে চাপ, পরিবহন খরচ, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, বীমা খরচ বাড়বে। সরবরাহ বিলম্বিত হবে ফলে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সঙ্কট তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। তরল গ্যাসের স্পট মার্কেটেও দাম বাড়তে পারে। সরকার হয় বিদ্যুতের দাম বাড়াবে, নয়তো ভর্তুুকি বাড়াবে। জ্বালানি ভর্তুকি বাড়লে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে, উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কুচিত হতে পারে, ঋণ গ্রহণ বাড়তে পারে, এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। অর্থনৈতিক প্রভাব-তেল, সার, খাদ্যশস্য সব কিছুর দাম বাড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আরো তীব্র হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে, বাড়তি আমদানি বিল পরিশোধে ডলার চাহিদা বাড়বে। রিজার্ভ কমে গেলে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে।
রফতানি খাতে ঝুঁকি : রফতানি খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা তৈরী পোশাক শিল্পের ওপর, আর এই খাতের প্রধান বাজার হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক ধাক্কা বা মন্দা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।
যদি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমে যায়, তাহলে পোশাকের ক্রয়াদেশ হ্রাস পাবে। এর ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাবে, নতুন বিনিয়োগ স্থগিত হতে পারে এবং অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমিক ও নারী কর্মীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে।
ক্রয়াদেশ ও উৎপাদন কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও হ্রাস পাবে, যা দেশের রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে রফতানি বাজার বহুমুখীকরণ যেমন এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকায় বাজার খুঁজতে হবে। পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে উচ্চমূল্যের ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক তৈরির কৌশল নিতে হবে। স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন জোরদার, আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিকল্প উৎস (রেমিট্যান্স, আইটি রফতানি) শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশের রফতানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে যার জন্য আগাম নীতি প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
প্রবাসী শ্রমিক ও রেমিট্যান্স : বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে কাজ বন্ধ বা স্থানান্তরের ঝুঁকি থাকবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে বড় ধাক্কা দেবে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য : বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ নীতির আলোকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে; অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সাথে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। যদি কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সঙ্ঘাত তাহলে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একদিকে পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্ব ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতাএই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি জটিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হতে পারে
১. জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে, রফতানি, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ২. বহুপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার করতে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে মানবিক ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরা। ৩. নিরপেক্ষতা ও মানবিক অবস্থান বজায় রাখা সঙ্ঘাতে সরাসরি পক্ষ না নিয়ে শান্তি ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেয়া। ৪. অর্থনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বাজার ও জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা। যুদ্ধ তীব্র হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কেবল নীতিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত টিকে থাকার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যুদ্ধকেন্দ্রিক বৈশ্বিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, বহুস্তরীয় ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ। জ্বালানি নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাস জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা থেকে তরল গ্যাস ও তেল আমদানির বিকল্প চুক্তি করতে হবে। স্পট মার্কেটের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি টেকসই হবে। কৌশলগত জ্বালানি মজুদ নীতিমালা করতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করতে হবে। শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে, অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িক সীমিত করতে হবে। রফতানি প্রণোদনা বাড়াতে হবে।
খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি, চাল, গম, ভোজ্যতেল, শাকসবজি ও ডালজাত পণ্যের স্টক বাড়ানো। পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ মজুদ তৈরি রাখা, যাতে বিদেশী সরবরাহে বিঘ্ন হলেও চরম সঙ্কট না হয়। মধ্যপ্রাচ্য বা রাশিয়া থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কানাডা থেকে বিকল্প চ্যানেল তৈরি করতে হবে। ভোজ্যতেলের জন্য মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনার সাথে চুক্তি করা যেতে পারে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উচ্চফলনশীল বীজ, সেচ ও কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কৃষকের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা ও তার পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্পের স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে হবে, জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামালসহ শিল্প খাতের স্থানীয় অংশীদারত্ব ও বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে। আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। জরুরি উৎপাদন পরিকল্পনা, খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি, সার ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্যের জন্য ন্যূনতম উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। শিল্প উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো অটোমেশন ও নিরাপদ রাখতে হবে।
যুদ্ধ যদি এক বছরের বেশি স্থায়ী হয় এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। এজন্য আমাদের কাঠামোগত অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হবে।
লেখক : সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি



