মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঞ্চল। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, জাতিগত বহুত্ব, সীমান্তসংলগ্ন অবস্থান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট— সবমিলিয়ে এই অঞ্চল সবসময়ই জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বহু উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম তার কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে মসৃণভাবে এগোতে পারেনি। নতুন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় এই এলাকা একটি বড় পরীক্ষাক্ষেত্র।
বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিযাত্রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এক দিকে সম্ভাবনার উর্বর ক্ষেত্র, অন্য দিকে দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত দ্বিধা ও বাস্তবায়ন-সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান— এই তিন পার্বত্য জেলা দেশের প্রায় এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হলেও অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচকে এখনো জাতীয় গড়ের নিচে অবস্থান করছে। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি সম্ভাবনা, পর্যটন আকর্ষণ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনা কেন এখনো কাজে লাগানো গেল না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে রাজনৈতিক আস্থার সঙ্কট এবং দীর্ঘ দিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির একটি কাঠামো তৈরি করেছিল; কিন্তু প্রায় তিন দশক পরও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধারা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, প্রশাসনে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিধিত্ব কাঠামোয় ভারসাম্য আনা— এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি। ফলে আস্থার সঙ্কট কাটেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির গণ্ডি থেকে বের করে একটি সময়সীমাভিত্তিক ও ফলাফলনির্ভর কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেয়া। কেবল কমিটি গঠন বা বৈঠক আয়োজন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রতি ছয় মাস অন্তর বাস্তবায়ন অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংসদে তা নিয়ে আলোচনা করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। একই সাথে স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রতিনিধিত্ব কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা যেতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সশস্ত্রগোষ্ঠীর তৎপরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত স্থানীয় জনগণের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাস্তবতা হলো— শুধু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল— এক দিকে আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা, অন্য দিকে সংলাপ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সঙ্ঘাতের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ না ওঠে, সে দিকেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সাথে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তা জনগণের মধ্যে ভীতি দূর হয়ে আস্থা সৃষ্টি করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট হলো ভূমি ইস্যু। অধিকাংশ সঙ্ঘাতের শিকড়ই জমি নিয়ে বিরোধে নিহিত। প্রথাগত জুম চাষের জমি, বনভূমি, সংরক্ষিত এলাকা এবং বসতভিটা— সবমিলিয়ে মালিকানার প্রশ্ন এখানে অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছে। ভূমি কমিশন গঠন করা হলেও বিরোধ নিষ্পত্তির গতি অত্যন্ত ধীর। হাজারো আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ ভূমি ব্যবস্থাপনা। স্যাটেলাইট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে জমির সীমানা নির্ধারণ, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি চালু করলে সমস্যার জট কমানো সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো তার প্রকৃত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং বিনিয়োগ পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূল নয়। অথচ কৃষি, ফলমূল, বনজসম্পদ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এখনো বহু পাহাড়ি এলাকা সারা বছর সড়ক যোগাযোগের আওতায় নেই। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ পান না। তাই সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অল-ওয়েদার সড়ক, বিদ্যুৎ এবং ডিজিটাল সংযোগের সর্বজনীনতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গম এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ ও বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের আনারস, কাজুবাদাম, আদা, হলুদ ইতোমধ্যে বাজারে চাহিদা তৈরি করেছে। কিন্তু সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না। কোল্ড স্টোরেজ, প্রসেসিং জোন এবং রফতানি সহায়তা দিলে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় সম্ভব। একই সাথে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং শিল্প গড়ে তোলা এবং সরাসরি বাজার সংযোগ তৈরি করা জরুরি। হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, পর্যটন খাতকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে পর্যটন বাড়লেও তা অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত। ফলে পরিবেশের ক্ষতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই একটি সমন্বিত ইকো-ট্যুরিজম নীতি প্রণয়ন করে স্থানীয় জনগণকে এর মূল অংশীদার করা প্রয়োজন। এতে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতাও জোরদার হবে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পিছিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার বেশি, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ কম এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সীমিত। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ডিজিটাল অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সবশেষে, সামাজিক সংহতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি ও বাঙালি— উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই প্রয়োজন সংলাপ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সম-অধিকারের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন।
সত্য কথা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নীতির অভাব নেই; অভাব রয়েছে বাস্তবায়নের দৃঢ়তায়। অতীতে বহু পরিকল্পনা নেয়া হলেও ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। নতুন সরকারের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে একটি কার্যকর পরিবর্তন আনার।
সময়ের দাবি স্পষ্ট— প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কঠোর জবাবদিহিতা। নতুন সরকার যদি সাহসী, বাস্তবমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর সমস্যার প্রতীক থাকবে না; বরং হয়ে উঠবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক



