সঙ্কটের সময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় আইনের প্রতি তার আনুগত্যে। কারণ স্বাভাবিক সময়ে সংবিধান মানা সহজ; কঠিন সময়ে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত একটি মৌলিক প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে- রাষ্ট্র কি আইন অনুসরণ করছে, নাকি বাস্তবতার চাপে আইনের অর্থ পরিবর্তিত হচ্ছে?
একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার বৈধতা আসে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিচারিক সিদ্ধান্তে এর অর্থ স্পষ্ট : একটি গঠিত বেঞ্চ, শুনানি এবং লিখিত ও স্বাক্ষরিত রায়। এই মৌলিক উপাদানগুলো ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তকে বিচারিক কার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। প্রকাশ্য রেকর্ডে যদি এসবের সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়- এটি আইনগত স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
তবে এখানে বিতর্কের শেষ নয়। রাষ্ট্র কখনো শূন্যে থাকে না। বাস্তবতার চাপে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অনেক সময় বাস্তবে বিদ্যমান ক্ষমতা (ডি ফ্যাক্টো অথরিটি) এবং অপরিহার্যতার নীতি (ডকট্রিন অব নেসেসিটি) প্রয়োগ করা হয়। এ নীতিগুলো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে চালু রাখার সুযোগ দেয়; কিন্তু তা কোনো অবস্থাতে পূর্ণাঙ্গ বৈধতা তৈরি করে না। অন্য কথায়, এগুলো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সমাধান, স্থায়ী নীতির বিকল্প নয়।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্রিক বাস্তবতা- যেখানে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব বহন করে। এ পদক্ষেপ বাস্তবতার দিক থেকে কার্যকর হতে পারে; কিন্তু এর সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। এখানে বাস্তবতা ও আইনের মধ্যে সূক্ষ্ম টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে গণভোট একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যখন নাগরিকরা সরাসরি কোনো প্রশ্নে মত দেন- যেমন ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ বিষয়ে হ্যাঁ বা না- তখন সেটি আর কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না; এটি একটি প্রত্যক্ষ জনসমর্থিত অবস্থানে রূপান্তরিত হয়। জনগণের প্রকাশিত ইচ্ছা উপেক্ষা করা শুধু একটি আইনি ত্রুটি নয়, এটি রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্কটও তৈরি করতে পারে। গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু তার ফল উপেক্ষা করার মতো নয়।
বিশেষত যখন নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়, তখন এর তাৎপর্য আরো গভীর হয়ে ওঠে। এক দিকে নাগরিকরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছেন, অন্য দিকে একই সাথে একটি নির্দিষ্ট নীতিগত প্রশ্নে সরাসরি মতামত দিচ্ছেন। এই দ্বৈত প্রক্রিয়া ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য একটি বাস্তব চাপ সৃষ্টি করতে পারে- যেখানে তারা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বাধ্য না হলেও, রাজনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী জনমতের কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হয়। এখানে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন উঠে আসে- এটি কি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর একটি পূর্বনির্ধারিত নীতিগত চাপ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা ছিল?
একই সাথে, গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট রাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- কিন্তু সেই বার্তাকে কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব এখনো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে যায়। এখানে আইনের সাথে বাস্তবতার সঙ্ঘাত নয়; বরং একটি নতুন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনগণের সরাসরি অনুমোদন উপেক্ষা করা মানে রাষ্ট্র নিজেই নিজের বৈধতার ভিত্তি দুর্বল করা।
সরকারের দায়িত্ব হলো গণভোটের ফল শুধু কার্যকর করা নয়; বরং সেটিকে সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে এনে একটি বৈধ, টেকসই এবং গ্রহণযোগ্য রূপ দেয়া। এ প্রক্রিয়ায় সংসদ, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য- সবকিছুর সমন্বয় অপরিহার্য।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার একটি সুস্পষ্ট পথরেখা অনুসরণ করতে পারে। প্রথমত, সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে গণভোটের ফলকে একটি দৃঢ় আইনি কাঠামো দেয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধনের বৈধ পথ অনুসরণ করতে হবে- কোনো শর্টকাট নয়। তৃতীয়ত, একটি উচ্চপর্যায়ের সংবিধান ও আইন পর্যালোচনা কমিশন গঠন করে নীতিগুলো সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কাজ শুরু করা যেতে পারে। চতুর্থত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। পঞ্চমত, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিতে পারেন। পাশাপাশি গণভোটের সীমা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ খোলা রাখা- এসব একটি দায়িত্বশীল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ।
রাষ্ট্রের জন্য বাস্তবায়ন কাঠামো
প্রশ্ন, শুধু কী করা উচিত তা নয়- কিভাবে করা উচিত তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করতে পারে :
১. সংসদের মাধ্যমে বৈধতা নিশ্চিত করা : গণভোটের ফলকে কার্যকর করতে সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে জনমত একটি আইনি কাঠামো পায়।
২. সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা অনুসরণ করা : যদি কোনো অংশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে বৈধ সংশোধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে- কোনো শর্টকাট নয়।
৩. উচ্চপর্যায়ের সংবিধান ও আইন পর্যালোচনা কমিশন গঠন : বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন করে নীতিগুলো সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ তৈরি করা যেতে পারে।
৪. ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন : হঠাৎ বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করা উচিত, যাতে ঝুঁকি কমে। সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
৫. সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ গ্রহণ : প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিতে পারেন।
৬. গণভোটের সীমা পরিষ্কার করা : গণভোটের কোন অংশ নির্দেশনামূলক এবং কোন অংশ বাস্তবায়নযোগ্য- তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
৭. রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ : সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণে একটি কাঠামোগত সংলাপ প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি।
৮. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা : বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে আস্থা বজায় থাকে।
৯. বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ খোলা রাখা : যেকোনো পদক্ষেপ আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য হতে হবে- এটি আইনের শাসনের ভিত্তি।
১০. মূলনীতি : জনমতকে সম্মান করা হবে, কিন্তু সংবিধানের ভেতরে থেকে- সংবিধানের বাইরে নয়।
এ পন্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- এটি একই সাথে জনমত ও সংবিধান- দু’টিকে সম্মান করে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ, রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন কঠিন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নকে জটিল করতে পারে। তবু এটি সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ- কারণ এটি সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে নয়, বরং সংবিধানের ভেতরে থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
সবশেষে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- ব্যতিক্রমকে যদি আমরা স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করি। প্রক্রিয়া ছাড়া সিদ্ধান্ত, ভিত্তি ছাড়া কর্তৃত্ব এবং আইনি কাঠামো ছাড়া বৈধতা- এ প্রবণতা যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে সংবিধানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমাধান টেকসই হয় না- কারণ তখন সমাধান নয়, সমস্যাই স্থায়ী হয়ে যায়।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


