খেলাপি ঋণ কেন হয়

সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলো দুই-তিন বছর কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সময় পেলে হয়তো সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। ব্যাংকিং খাতের অবশ্যই প্রকৃত চিত্র প্রকাশ থাকা উচিত। এই সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো প্রভিশনের ব্যাপারে বিশেষ ছাড়ের বিষয় চিন্তা করাও দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সুযোগ করে দেয়া দরকার। ব্যাংকগুলো অর্থনীতির ফুয়েল। এদের টিকে থাকা জরুরি। ব্যাংকিং খাতকে গতিশীল করতে ঋণখেলাপির দিকে বেশি নজর দেয়া দরকার। ঋণের তদারকি ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। এগুলোকে কোনোভাবেই স্বল্প দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা উচিত হবে না

ওমর বিশ্বাস
ব্যাংকিং খাতে ঋণ বা বিনিয়োগ খেলাপি একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম। ঋণ বা লোন প্রচলিত ব্যাংকে ব্যবহার হয় এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ বা ইনভেস্টমেন্ট বলা হয়। এরা নন-পারফর্মিং হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো ঋণ বা বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার পেছনে এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। এটি ইচ্ছাকৃত হতে পারে বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। কেস টু কেস ব্যাসিস ধরলে হাজারটা কারণ পাওয়া যায়। সেগুলো কেস ব্যাসিস সমাধানও করা হয়। কিন্তু জটিলতা হয় ইচ্ছাকৃত বা উইলফুল ডিফল্টারের ক্ষেত্রে। এর কারণগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে আলোচিত হয়ে আসছে এবং খেলাপি ঋণ বিশ্লেষণে সে আলোকেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করে থাকে। এগুলো বিবেচনা করা হতো সময়, প্রকৃতি, পরিস্থিতি ইত্যাদির উপর।

কিন্তু খেলাপির পেছনের রাজনৈতিক কারণটা ইউ you))-এর মতো উহ্য থেকেছে প্রায় সময়। ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বৃহৎ— সর্বত্র যার যেখানে সুযোগ আছে সে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। আর বর্তমান সময়ে এই প্রক্রিয়ায় ঋণ নেয়াটা ব্যাংকগুলোর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকগুলোর দায় পরিশোধ না করা— এই দু’টি দিক এখন ঋণখেলাপির বড় কারণ। অথচ এই দু’টিকে এখনো শক্তভাবে অ্যাড্রেস করা হয়নি। ফলে এদের থেকে ঋণ আদায় করাটাই খেলাপির পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে ঋণখেলাপির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী, এই ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে ৩১.২০ শতাংশ। এটি ডিসেম্বর ২০২৪ প্রান্তিকে ছিল তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে ১৯.৯ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকে ছিল ৩৬.৩ শতাংশ, যা ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫-এ এসে যে পরিমাণ বেড়েছে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। স্বভাবতই ডিসেম্বরের শেষে এসে ব্যাংকগুলো তাদের খেলাপির পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করে থাকে। সে দিক দিয়ে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের খেলাপি ঋণের পরিমাণকে একটি অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কেননা, খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। এটি হু হু করেই বাড়ছে। ভয়াবহ চিত্র হলো— ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি খেলাপি ঋণ আছে।

কারা ঋণখেলাপি?
ঋণ বা বিনিয়োগ চুক্তির শর্তের আলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গৃহীত ঋণ বা বিনিয়োগ ফেরত দিতে যারা ব্যর্থ হয়, তারা ঋণখেলাপি। নির্ধারিত দিনের মধ্যে পরিশোধ না করলে এটি অনাদায়ী বকেয়া হিসেবে গণ্য হয় বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয় এবং তিন মাস অতিক্রান্ত হলে সেটি খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। এটি যেকোনো ধরনের ঋণ, কিস্তি বা বিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ঋণখেলাপি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হতে পারে।

একজন ভালো গ্রাহকও এ পর্যায়ে খেলাপি হয়ে যেতে পারে। কেউ পরিবেশ পরিস্থিতির শিকার হয়ে বা প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে ঋণখেলাপি হয়।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে রেগুলেটরি বডি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ নির্দেশনা আছে। তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করার কথা বলা আছে। আরো বলা আছে— ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবের বিপরীতে আরোপিত বা অনারোপিত কোনো সুদ মওকুফ করা যাবে না এবং ওই হিসাব পুনঃতফসিলও করা যাবে না। অথচ ইচ্ছাকৃত খেলাপির সার্বিক দিকটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তালিকা প্রণয়ন ও ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

খেলাপি ঋণ থেকে বের হয়ে আসার উপায় কী?
আমাদের দেশে ঋণখেলাপির প্রকাশ অনেকটা ব্যালান্সশিটের উপর নির্ভর করে। ফলে এই সুযোগটি নিয়ে থাকে গ্রাহকরা। অনাদায়ী এই টাকার পরিমাণ যত বেশি থাকবে, একটি ব্যাংক তত দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হয়। তার সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মূলধন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তখন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উপর বিশেষ নজর দিতে গিয়ে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করতে হয়। বিষয়টি একটু অলিখিতভাবেই থাকে। ঋণ পুনঃতফসিল করা হয় এবং এ ক্ষেত্রে যে ডাউন পেমেন্ট পাওয়া যায়, সেটি বড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুনঃতফসিলের ভবিষ্যৎ তাৎক্ষণিক বিবেচ্য হিসেবে থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলের প্রলেপে এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পায় না। খেলাপি নিয়ে ব্যাংকগুলো অনেক সময় কঠোর পথে যেতে পারে না। খেলাপিরা দেশের শত্রু বলেও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আসলে কার্যকর কিছু হয়নি। এর থেকে বাস্তবতার আলোকেই বেরিয়ে আসা জরুরি।

অনেকে আবার ইচ্ছা করে ঋণ পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করে, অনীহা দেখায়। এরা ব্যাংকগুলোর সাথে ঝামেলাও করে। তারা নানা অজুহাতে সুবিধা চায়। সেগুলোকে নিজেদের ঋণ মওকুফের হাতিয়ার বানায়।

যদি সিস্টেম ও আইনের প্রয়োগ ঠিকভাবে হতো তা হলে খেলাপির সংখ্যা অনেক কমে আসত এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা কমে যেত। কেননা, এর আইন আছে, এরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের কাছ থেকে কোম্পানি নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা পেতে পারে। এরা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মান পাওয়ার যোগ্য হবে না। এমনকি এরা গাড়ি, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির থেকেও বঞ্চিত হতে পারে। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্সে নিষেধাজ্ঞা, বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাও পেতে পারে। এরা তালিকা থেকে অব্যাহতি পেলেও পরবর্তী পাঁচ বছর কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না। কাগজে-কলমে যাই থাকুক, বাস্তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ হতে দেখা যায় না। ফলে এদের সংখ্যা বাড়ে। প্রতিকার হয় না। বড় বড় গ্রাহক ঋণের সুদ মওকুফ করে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রে ছোট গ্রাহকরা বঞ্চিত হয়। তারা আটকে যায় ব্যাংকের নিয়মের জালে। এটি ঋণ আদায়ের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি হতে পারে না। ব্যাংকগুলোকে অতীতে দেখা গেছে গ্রাহকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে। অথচ এটিকে অনেক গ্রাহক ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা মনে করেছে এবং সেভাবেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ গ্রাহকের আমানতের টাকায় ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ দিয়ে থাকে।

অনেকেই মনে করেন, ব্যাংকের টাকা একবার নিলে আর দিতে হবে না। ধারণাটির মাধ্যমে অনেকে টাকা নেন এবং দিতে চান না। আমাদের খেলাপির কারণগুলোর মধ্যে এ ধারণাটিও সুপ্তভাবে আছে। ফলে অনেকেই রিকভারির কাজে নিয়োজিত ব্যাংকারদের উল্টো হয়রানি করে থাকে। এরা যেভাবে হোক ঋণ পেয়েছে। এই পাওয়াটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যদিও একসময় এসে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ভালো কার্যকর পদক্ষেপ ও আইনের সহায়তার ফলে নিরুপায় হয়ে এরা বুঝতে পারে, ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে হয়। এটি পাবলিক মানি। আমানতের টাকা। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ। ঋণ বা বিনিয়োগ বিতরণের সময় পর্যালোচনার সুস্থ কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এরকম ভাবার সুযোগটুকু এই শ্রেণীর গ্রাহকরা পেতো না।

ব্যাপক ঋণখেলাপির ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যায়। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সমস্যা এখানে আরো বেশি হয়। তারা একবার মুনাফা বা লাভ ধার্য করার পর খেলাপির কারণে সেখান থেকে আর নতুন করে মুনাফা নিতে পারে না। তারা ক্ষতিপূরণ ধার্য করে থাকে। সেটিও আবার মুনাফায় নিতে পারে না। ফলে যত দিন অনাদায় থাকে, তত দিন তারা নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ পায় না। এতে ভবিষ্যৎ মুনাফার আশা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের বিনিয়োগের অর্থ আদায় হওয়ার আগ পর্যন্ত সব নন-পারফরমিংই থেকে যায়।

সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলো দুই-তিন বছর কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সময় পেলে হয়তো সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। ব্যাংকিং খাতের অবশ্যই প্রকৃত চিত্র প্রকাশ থাকা উচিত। এই সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো প্রভিশনের ব্যাপারে বিশেষ ছাড়ের বিষয় চিন্তা করাও দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সুযোগ করে দেয়া দরকার। ব্যাংকগুলো অর্থনীতির ফুয়েল। এদের টিকে থাকা জরুরি।

ব্যাংকিং খাতকে গতিশীল করতে ঋণখেলাপির দিকে বেশি নজর দেয়া দরকার। ঋণের তদারকি ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। এগুলোকে কোনোভাবেই স্বল্প দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা উচিত হবে না।

লেখক : কবি, ব্যাংকার

[email protected]