পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার যে দীর্ঘ ইতিহাস

তালেবানের সাথে কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে আসছিল পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ওইসব অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কাবুলের একটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপরে আকাশ পথে হামলার জেরে অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েকমাস ধরে চলতে থাকা উত্তেজনা আরো বেড়ে গেছে।

ওই মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার মানুষের চিকিৎসা চলছিল। ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বেশ কিছু লাশ শনাক্ত করার অবস্থায়ও নেই বলে জানিয়েছে কাবুলের ফরেন্সিক মেডিসিন ডিরেক্টরেটের কয়েকটি সূত্র।

ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপরে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করে পাকিস্তান বলছে, তারা সামরিক স্থাপনা আর সন্ত্রাসবাদের সহায়তাকারী অবকাঠামোগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ওই চিকিৎসা কেন্দ্রটির কাছাকাছি থাকেন এমন বাসিন্দারা বলছেন, সোমবার (১৬ মার্চ) স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ প্রচণ্ড জোর বিস্ফোরণের আওয়াজ পান। এরপরে বিমান ও আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থার আওয়াজও শুনেছেন তারা।

মাদকাসক্তি-মুক্তি কেন্দ্রটির রোগীদের আত্মীয়-স্বজনরা সেখানে জড়ো হয়ে মরিয়া হয়ে নিজের প্রিয়জনদের অবস্থা জানার চেষ্টা করছিলেন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান সীমান্তের কাছাকাছি থাকা পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনাগুলো আক্রমণ করে। এর আগে, অক্টোবর মাসে অবশ্য দেশ দু’টি সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করেছিল।

পাকিস্তান পরের দিন আফগানিস্তানের কাবুল, পাকতিকা আর কান্দাহারের মতো শহরগুলোর ওপরে ধারাবাহিক হামলা চালাতে থাকে। সীমান্তের দুই প্রান্তের গুলি বিনিময়ে আফগানিস্তানের দিকে এখনো পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন নিহত ও অন্তত ১৯৩ জন আহত হয়েছেন বলে আফগানিস্তানে অবস্থিত জাতি সংঘের সহায়তা মিশন জানিয়েছে।

অস্থিরতার ইতিহাস

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে অশান্ত হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার আগে কাবুলের তৎকালীন সরকার নিয়মিতভাবেই ইসলামাবাদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলত যে তালেবান যোদ্ধারা যাতে আফগান বাহিনীর ওপরে হামলা চালাতে পারে, তার জন্য পাকিস্তান সহযোগিতা করছে। ওই সব হামলার পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাটিতেই হতো বলেও অভিযোগ ছিল।

সেই সময়ে তালেবানের সাথে কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে আসছিল পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ওইসব অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পথ মসৃণ করে দিয়েছিল যে দোহা চুক্তি, তা চূড়ান্ত করতে আলোচনায় সহযোগিতা করেছিল পাকিস্তান। এরপরেই দ্রুত তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে।

তালেবান যখন প্রথম দফায় আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, সেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে, যে কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পাকিস্তান সেগুলোর অন্যতম।

তবে তালেবান যখন দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরল, তখনও যেভাবে দু’টি দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভঙ্গুরই রয়ে গেছে।

পাকিস্তানের অভিযোগ, ‘পাকিস্তানি তালেবান’ বলে পরিচিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালাচ্ছে সেদেশের ভেতরেই তাদের ঘাঁটিগুলো থেকে। আফগান তালেবান সেগুলো থামাতে সচেষ্ট নয়।

সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক মাসুদ খান বলেন, ‘আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান ফিরে আসার পরে পাকিস্তান আশা করেছিল যে টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলো আগের মতো সমর্থন পাবে না এবং সীমান্ত সমস্যার উন্নতি হবে। তবে বাস্তবে তা হয়নি।’

এটা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নয়।

বিশ্লেষক ও সাংবাদিক শামি ইউসুফজাই বলেন, ‘অন্যান্য সরকারের মতো চিরাচরিতভাবে সরকার বলতে যা বোঝায়, আফগান তালেবান তো আর সেরকম নয়। টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলোর সাথে ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত একটি গোষ্ঠী হিসেবে তারা ক্ষমতায় এসেছে।’

শামি ইউসুফজাই আফগানিস্তান আর পাকিস্তান সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তার কথায়, ‘যদি পাকিস্তান বিশ্বাস করে যে আফগান তালেবান টিটিপিকে খতম করে দেবে বা তাদের বিতাড়িত করবে, সেই আশা করাটা অবাস্তব।’

গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি দিল্লি সফর করেন। তার পরেই পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের সাথে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুণঃস্থাপিত হয়।

ওই অক্টোবর মাসেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খ্বাজা মুহাম্মদ আসিফ জিও সংবাদ চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেছিলেন যে তারা ‘দিল্লির হয়ে এক ছায়াযুদ্ধে নেমেছে’।

ভারত অবশ্য সবসময়ে অস্বীকার করে থাকে যে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তারা কোনো পাকিস্তান-বিরোধী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়। তবে ভারত আর আফগানিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক বরফ গলে যাওয়াটাকে পাকিস্তানের কাছে ‘প্রতীকী পরাজয়’ বলে মনে করেন ইউসুফজাইয়ের মতো বিশ্লেষকরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে ভারত একদিকে ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে চাইছে, অন্যদিকে তালেবান চাইছে যে এই অঞ্চলে দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার অবস্থার অবসান করা।

কিন্তু ইউসুফজাই বলছেন, বিষয়টা অত সহজ নয়, ভারতের পক্ষে তালেবান সরকারকে বাস্তবে সমর্থন দেয়ার সীমাবদ্ধতা আছে, কারণ কাবুল একটি কঠোর জিহাদি আদর্শগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশ চালায়।

এটা ইসলামাবাদের কাছে কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

সূত্র : বিবিসি