ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে যে ২ পথে হাঁটছেন ট্রাম্প

সংঘর্ষ বৃদ্ধির মধ্যেই প্রশাসনের অভ্যন্তরে উদ্বেগ বাড়ছে যে এর পরে যে কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |ফাইল ছবি

ইরানের সাথে সংঘাত থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায়, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে বলেই আপাতভাবে মনে হচ্ছে। তার ভাষায় অবশ্য এ যুদ্ধ ‘ধীরে ধীরে শেষ করা’।

তবে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কোন কৌশল তিনি নিচ্ছেন, তা এখনো অস্পষ্ট। তিনি একেকবার একেকরকম কথা বলছেন, যা দেখে মনে হচ্ছে তিনি নিজেই এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি যে ঠিক কোন কৌশলটা সব থেকে ভালো কাজে আসবে; সংঘাতের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করা, না কি তেহরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা।

মঙ্গলবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একসাথে দুটি কৌশলই নিতে পারে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থল সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয়, আবার মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সরকারের সামনে একটি নতুন ১৫-দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করে।

বুধবার হোয়াইট হাউস ইরানের প্রতি আহ্বান জানায় যাতে ওই শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করে। একইসাথে এই হুমকিও দেয়া হয় যে, ওই শান্তি পরিকল্পনায় রাজি না হলে দেশটির ওপরে কঠোরতম হামলা চালানো হবে।

এর ফলেই ট্রাম্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এমন বাইরের কিছু মিত্ররা জানিয়েছেন যে, সংঘর্ষ বৃদ্ধির মধ্যেই প্রশাসনের অভ্যন্তরে উদ্বেগ বাড়ছে যে এর পরে যে কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

‘ওরা খুবই অস্বস্তিতে আছে, কারণ এটা স্পষ্ট যে ট্রাম্প এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেননি,’ বলেন এমন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি ট্রাম্প প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তার প্রশাসনে কাজ করেছিলেন। ওই সাবেক কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে দিতে অনিচ্ছুক।

বুধবার হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভুয়া আশ্বাস দেন না, তিনি চরম আঘাত হানতে প্রস্তুত। ইরান যেন আবারো ভুল না করে।’

শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে যে আসলেই দেশ দুটি গুরুতর কূটনৈতিক আলোচনায় জড়িত কিনা।

যে যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে আর যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ সৃষ্ট করেছে, সেই সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প যেসব বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটাই অবশ্য তার কাজের স্বভাবসিদ্ধ ধরন।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্রই নির্ধারক শক্তি। কিন্তু ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে যে, এই সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।

হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষা কি নিশ্চিত করা যাবে?

যুদ্ধের থেকে ট্রাম্প যেসব বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিলেন, তার বাইরেও এই প্রশ্নের জবাব এখনো নেই যে কিভাবে হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সমুদ্র পথ দিয়েই বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করে।

যুদ্ধের তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপরে ইরানের হামলা কিভাবে বন্ধ করা যেতে পারে, সে প্রশ্নের কোনো জবাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনো নেই। এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার ন্যাটোর মিত্র দেশগুলো ও অন্যদের প্রতি ট্রাম্প সাহায্যের জন্য যে আহ্বান করেছিলেন, তাতেও কেউ সাড়া দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা স্টিফেন হ্যাডলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের জন্য সমস্যা হলো হরমুজ প্রণালী। তিনি যদি এটি ইরানের হাতে ছেড়ে রাখেন, তবে তার পক্ষে বিজয় দাবি করা কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশের সাথে পরামর্শ করতে ট্রাম্পের ব্যর্থতার কারণে এখন মিত্রদের সাহায্য পেতে প্রশাসনের এত সমস্যা হচ্ছে।’

প্রশাসনের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসার সাথে সাথেই যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে ওয়াশিংটনে অনিশ্চয়তা বুধবার আরো বেড়ে যায়।

স্পিকার মাইক জনসন ক্যাপিটল হিলে সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নিচ্ছে’। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি একটা সংক্ষিপ্ত নির্দেশ জারি করেই এই পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

হোয়াইট হাউস যে আত্মবিশ্বাসী, মাইক জনসনের কথায় তার প্রতিফলন পাওয়া যায়।

স্থল সেনা পাঠানো নিয়ে রিপাবলিকানরাই দ্বিমত

ইরানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর যে ঘোষণা ট্রাম্প দিয়েছেন, এমন খবরে তার রিপাবলিকান পার্টিরই কয়েকজন সহকর্মী প্রকাশ্যই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিং থেকে বেরিয়েই সাউথ ক্যারোলিনার কংগ্রেসওম্যান ন্যান্সি মেস ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘ইরান নিয়ে হাউস আর্মড সার্ভিসেস ব্রিফিং থেকে সবেমাত্র বেরিয়ে এসেছি। আমি আবারো বলতে চাই, আমি ইরানে স্থল সেনা পাঠানো সমর্থন করব না, এই ব্রিফিংয়ের পরে তো আরো নয়।’ সামাজিক মাধ্যম এক্সের একটি পোস্টে একথা লিখেন তিনি।

‘পরিকল্পনার ছাপ দেখতে পাচ্ছি না’

শান্তি পরিকল্পনায় ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার অনুমতি দেয়ার মতো দাবিগুলো রয়েছে বলে জানা গেছে।

গাজা ভূখণ্ড ও ইউক্রেনে মার্কিন মধ্যস্থতা চালিয়েছিলেন যে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার– তারাই এখন ইরানের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওই দুই ক্ষেত্রে যে ধরনের শান্তি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তার সাথে এবার দেয়া শান্তি প্রস্তাবগুলোর মিল আছে। ব্যবহার করেছেন তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল।

ইরানের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট করে দেয়া হয়, তেহরান বিশ্বাস করে যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যুদ্ধের গতিপথের ওপর তাদের সমান, অথবা বেশই নিয়ন্ত্রণ তাদের রয়েছে। যদিও ট্রাম্প জোর দিয়েই বলছিলেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে জয়ী হয়েছে’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য তেহরানের নিজস্ব দাবি রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ কখন বন্ধ হবে, সেই সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে এবং তার নিজস্ব শর্ত পূরণ করেই সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পশ্চিমা জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার পরিকল্পনা ইরানের নেই।

হোয়াইট হাউস হয়তো ভাবছে যে ইরানে স্থল সেনা পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য ইরানের ওপরে চাপ দিতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করতে পারবে। তবে ৮২ এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সীমিত সংখ্যক সেনা পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালীর ওপরে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, নাকি সংঘাতের বৃহত্তর গতিপথই পাল্টে দিতে পারবে ওই বাহিনী, তা স্পষ্ট নয়।

বারাক ওবামার প্রশাসন ও ট্রাম্পের প্রথম দফায় কাজ করেছেন, সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, স্থল সেনা পাঠিয়ে যুদ্ধ আরো বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে যুদ্ধের জন্য প্রশাসনের ‘কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই’।

তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, দীর্ঘ চিন্তাভাবনা করে নেয়া কোনো পরিকল্পনার ছাপ আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি না।’

সূত্র : বিবিসি