হরমুজের ফাঁদে তেলের দুনিয়া

যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহেই হরমুজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রায় চার বছর পর আবার ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালী |সংগৃহীত

বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার ইতিহাসে কয়েকটি জায়গার নাম বারবার ফিরে আসে। কিন্তু পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত সরু নৌপথ হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ খুব কম পথই আছে। হরমুজ প্রণালীর কথা উঠলেই জ্বালানি দুনিয়ার মানুষজনের চোখের সামনে একটি অদ্ভুত মানচিত্র ভেসে ওঠে। পারস্য উপসাগরের বিশাল পানিরাশি ধীরে ধীরে এসে একটি সরু দরজায় গলা আটকে যায়। সেই দরজাটিই হরমুজ।

জাহাজের পথ এতটাই সংকীর্ণ যে অনেক জায়গায় দু’পাশের দূরত্ব কয়েক ডজন কিলোমিটারের বেশি নয়। কিন্তু এই সরু পথ দিয়েই প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল আর বিপুল পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পৃথিবীর বাজারে পৌঁছায়। তাই জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বহু বছর ধরে এটিকে বলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘চোকপয়েন্ট’।

শব্দটির আক্ষরিক মানে গলা চেপে ধরা জায়গা। যুদ্ধবিদ্যার ভাষা থেকে নেয়া এই ধারণা বোঝায় এমন একটি সংকীর্ণ পথ যেখানে বিপুল প্রবাহ এসে বাধ্য হয়ে জট বাঁধে এবং সামান্য আঘাতেই পুরো প্রবাহ থেমে যেতে পারে। হরমুজ ঠিক তেমনই এক জায়গা।

পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো; সৌদি আরব, কুয়েত সংযুক্ত, আরব আমিরাত, কাতার ও ইরাক- তাদের জ্বালানি রফতানির বড় অংশ এই এক দরজা দিয়েই বাইরে পাঠায়। ফলে পৃথিবীর জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এসে নির্ভর করে পড়ে একটি মাত্র সরু পানিপথের ওপর। এখানেই বিপদের শুরু। কারণ যে পথ এত গুরুত্বপূর্ণ সেটিই আবার সবচেয়ে দুর্বল। দু’পাশেই সামরিক উত্তেজনা। আকাশে যুদ্ধবিমান। সাগরে টহল জাহাজ। আর নিচে দিয়ে ধীর গতিতে চলেছে তেলবাহী বিশাল ট্যাংকার।

এই দৃশ্য বহু বছর ধরে বিশ্লেষকদের মনে একই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে। যদি কখনো এই সরু দরজাটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কী হবে। তখন কি পৃথিবীর জ্বালানি সরবরাহ হঠাৎ করে থমকে দাঁড়াবে। এই প্রশ্নই দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি দুনিয়ার এক অদৃশ্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই দুঃস্বপ্নকে বাস্তবের খুব কাছে এনে দিয়েছে।

এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন তাত্ত্বিক ছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ সেই প্রশ্নকে বাস্তবে এনে দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহেই হরমুজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রায় চার বছর পর আবার ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি বিশদ প্রতিবেদনে এই সঙ্কটের পটভূমি তুলে ধরেছেন দুই অভিজ্ঞ সাংবাদিক রেবেকা এফ এলিয়ট এবং ভিভিয়ান নেরেইম। রেবেকা এলিয়ট নিউইয়র্ক টাইমসের জ্বালানি-বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি শিল্প নিয়ে কাজ করছেন। আর ভিভিয়ান নেরেইম সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থান করে আরব উপদ্বীপের দেশগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একটি অস্বস্তিকর সত্য। বিপদের কথা সবাই জানত। কিন্তু বাস্তবে সেই বিপদ এড়ানোর মতো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

পারস্য উপসাগরের দেশগুলো পৃথিবীর অন্যতম বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইরাক মিলিয়ে যে পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন করে তার বড় অংশই রফতানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই পানিপথটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ প্রতিদিন এখান দিয়ে যায়। ফলে এই সরু পানিপথ কার্যত বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার গলা আকড়ে ধরে রাখা একটি সংকীর্ণ দরজা।

সমস্যা হলো এই দরজাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রণালিটি খুব সরু। দু’পাশেই সামরিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেকোনো সংঘাত খুব সহজেই এখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। তাই বহু বছর ধরেই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা হরমুজকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কেন্দ্র হিসেবে দেখেছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো এতদিন পরও এর কার্যকর বিকল্প তৈরি হয়নি। কেন হয়নি তার উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমটি ভৌগোলিক বাস্তবতা। দ্বিতীয়টি আঞ্চলিক রাজনীতি। তৃতীয়টি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। এই তিনটি বিষয় মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

ভৌগোলিক বাস্তবতা দিয়ে শুরু করা যাক। পারস্য উপসাগর এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে বেশিভাগ তেলক্ষেত্র উপসাগরের ভেতরের দিকে। ফলে সেগুলো থেকে জ্বালানি রফতানি করতে হলে প্রায় অনিবার্যভাবেই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে উপসাগরের চারপাশের দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি স্থলপথে বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন।

তার ওপর রয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। উপসাগরের দেশগুলো একদিকে মিত্র, আবার অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা অনেক সময় একই জোটে থাকলেও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে। ফলে যৌথ অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রায়ই আটকে যায়।

অর্থনৈতিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প পাইপলাইন তৈরি করতে হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাছাড়া একটি পাইপলাইন যদি একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে যায় তাহলে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ে। স্বাভাবিকভাবে অনেক দেশই এই ধরনের প্রকল্পে আগ্রহ দেখায়নি।

কিছু দেশ অবশ্য বিকল্প পথ তৈরি করার চেষ্টা করেছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। তারা পাইপলাইন তৈরি করে তেলের একটি অংশ হরমুজ এড়িয়ে অন্য পথে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এই পাইপলাইনগুলোর সক্ষমতা খুব সীমিত। ফলে সেগুলো কখনোই হরমুজের প্রকৃত বিকল্প হয়ে ওঠেনি।

উদাহরণ, কাতারের কথাই ধরা যায়। কাতার পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানিকারক। কিন্তু দেশটির স্থল সীমান্ত রয়েছে কেবল সৌদি আরবের সাথে। কয়েক বছর আগে আঞ্চলিক বিরোধের জেরে সৌদি আরব কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল এবং সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও পরে সেই সঙ্কটের সমাধান হয়েছে, কিন্তু আস্থার সঙ্কট পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে কাতারের জন্য অন্য দেশের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।

লন্ডনভিত্তিক তেল কোম্পানি বিপির সাবেক প্রধান নির্বাহী জন ব্রাউন এই বাস্তবতাকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন এখানে পুরোপুরি নিরাপদ কিছু নেই। কেউ যদি খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে তাহলে তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ক্ষতি করার অনেক উপায় রয়েছে।

আরেকটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে বিশ্লেষকদের আশ্বস্ত করেছিল। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার। তাই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজকে খোলা রাখবে।

পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী জ্বালানি ইতিহাসবিদ এবং এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল ইয়ারগিন বলেন, এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা সবাই জানত। কিন্তু সেটিকে খুব সম্ভাব্য বলে মনে হয়নি। কারণ সবাই ধরে নিয়েছিল তেলের ভোক্তা দেশগুলো শেষ পর্যন্ত এই পথকে রক্ষা করবে।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়ে সংঘাতের সূচনা করে। সেই মুহূর্ত থেকে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দেয়ার সম্ভাবনার গালভরা কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইরানের জবাবি হামলার ফলে জাহাজ ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ তেল হরমুজ দিয়ে যেত এখন তার ১০ শতাংশেরও কম চলাচল করছে।

একই সময়ে কাতারও প্রাকৃতিক গ্যাস তরল করে রফতানি করার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কার্যত আটকে যায়। তেল গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্য রফতানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেক দেশ দ্রুত জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু সেই মজুত ট্যাংকগুলোর জায়গাও সীমিত। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।

এমন দশায় অনেক দেশ উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির হিসাবে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের একটু বেশি সময়ের মধ্যেই ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব মিলিয়ে দৈনিক কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী পুরো অঞ্চল মিলিয়ে দৈনিক অন্তত এক কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন কমে গেছে। এটি বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ।

এবারে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। তেল শোধনাগারগুলোও কম ক্ষমতায় চলছে। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে পেট্রোল ডিজেল ও জেট জ্বালানির উৎপাদনও কমে গেছে।

ইরাকের ব্যাংক রাবি সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান শোয়ান ইব্রাহিম তাহা বলেন, তেলের দাম যতই বাড়ুক তাতে লাভ নেই যদি বিক্রি করা না যায়। বিক্রি করা না গেলে মাটির নিচে রেখেই দেয়াই ভালো।

উপসাগরের ছয়টি প্রধান জ্বালানি উৎপাদকারী দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল নামে একটি জোটে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের মধ্যে সহযোগিতা সীমিত।

এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা একটি যৌথ রেল নেটওয়ার্ক গড়ার কথা বলছে। সেই প্রকল্পও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সেখানে যৌথ জ্বালানি রফতানি অবকাঠামো তৈরি করা আরও কঠিন বিষয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা গেছে। তারা ভিন্ন ভিন্ন তেল নীতি অনুসরণ করেছে। আবার ইয়েমেনের সংঘাতেও তারা ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে।

এই বাস্তবতার মাঝেও কিছু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে সাধারণত যে তেল রফতানি হয় তার এক চতুর্থাংশের কিছু বেশি এখনো অন্য পথে বের হতে পারছে।

এর একটি কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পাইপলাইন। আবুধাবি থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত এই পাইপলাইনটি ২০১২ সালে চালু হয়। এটি হরমুজ এড়িয়ে তেল রফতানির সুযোগ দেয়।

তবে এই অবকাঠামোও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ইরান এই পাইপলাইনের দুই প্রান্তের স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।সবচেয়ে বড় বিকল্প পথটি সৌদি আরবের পূর্ব পশ্চিম পাইপলাইন। আশির দশকে ইরান ইরাক যুদ্ধের সময় এই পাইপলাইন তৈরি করা হয়। তখন ট্যাংকার যুদ্ধ নামে পরিচিত সংঘাতে উপসাগরের জাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে পড়েছিল।

এই পাইপলাইন লোহিত সাগর পর্যন্ত তেল নিয়ে যেতে পারে এবং দৈনিক সাত মিলিয়ন ব্যারেল তেল বহনের ক্ষমতা রয়েছে। তবে এর একটি অংশ সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর জন্য বাস্তবে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন ব্যারেল সক্ষমতা থাকে।

সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন এইচ নাসের বলেন হরমুজ বন্ধ হতে শুরু করার সাথে সাথেই পূর্ব পশ্চিম পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দেন হরমুজে প্রবেশাধিকার না থাকলে বৈশ্বিক তেল বাজার ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

অন্যদিকে ইরান কিছু ট্যাংকারের মাধ্যমে এখনো তেল সরাতে সক্ষম হয়েছে। এতে আমিরাতের কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমিরাত-ঘনিষ্ঠ লেবানিজ ভাষ্যকার নাদিম কোটেইচ প্রশ্ন তুলেছেন ইরান যদি তেল বিক্রি করতে পারে তাহলে অন্যরা কেন পারবে না।

শুক্রবার রাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি জানান, দ্বীপটির তেল অবকাঠামো নষ্ট করা হয়নি ‘শালীনতার’ কারণে।

যুদ্ধ যদি শেষও হয় তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হবে না। ইরানের ভেতর থেকে নতুন বিদ্রোহী গোষ্ঠী উঠে আসতে পারে। তারা জাহাজ চলাচলে হামলা চালাতে পারে। এতে নাবিকদের জীবন এবং মূল্যবান জাহাজ ঝুঁকিতে পড়বে। এমন দুঃস্বপ্নও দেখছে অনেকে।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হাউছি গোষ্ঠী গত কয়েক বছরে লোহিত সাগরে এরকম হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে তারা সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে যাওয়া জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।

এস অ্যান্ড পি গ্লোবালের ড্যানিয়েল ইয়ারগিন বলেন হরমুজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতি সত্যিকারের দুঃস্বপ্নের মতো। এখন দেশগুলো কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটিই বড় প্রশ্ন।

সম্ভবত এই সঙ্কট নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে। যদি হরমুজ দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ থাকে তাহলে অনেক দেশ নতুন পাইপলাইন তৈরির কথা ভাবতে পারে।

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, তেল উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাসও লাগতে পারে।

আমিরাত-ভিত্তিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি ক্রিসেন্ট পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী মাজিদ জাফর বলেন, এতদিন যে বিপদের কথা সবাই বলে আসছিল সেটিই এখন বাস্তবে ঘটেছে। এখন দেখতে হবে পৃথিবী এই নতুন বাস্তবতার সাথে কিভাবে মানিয়ে নেয়।