ইরানের এই ৬৬তম দফার হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেবল সংখ্যায় বেশি নয়, বরং প্রযুক্তিতেও অনেক উন্নত। তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, ‘খাইবার-শিকান’ এবং ‘খোররামশাহর’-এর মতো সিস্টেমগুলো মূলত ‘পয়েন্ট-লঞ্চিং’ সক্ষমতা সম্পন্ন, যা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে ওস্তাদ। বিশেষ করে মাল্টি-ওয়ারহেড বা বহুমুখী বোমাবাহী এই সিস্টেমগুলো একই সাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হানতে পারে, যা ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। তেহরানের দাবি, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের ফলে তেল আবিবের বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় বাঙ্কারে কাটাতে হচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে ইহুদিবাদীদের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের একটি বড় নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। শুক্রবার দিবাগত রাত ঠিক ১টা ২০ মিনিটে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইসরাইলের বুক চিরে এক বিশাল হামলা চালিয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবর অনুযায়ী, ‘ইয়া জোহরা’ কোডনেম ব্যবহার করে চালানো এই অভিযানে কাদির, খোররামশাহর এবং খাইবার-শিকানের মতো সুপার-হেভি বা অতিভারী ও মাল্টিওয়ারহেড (বহু মুখী বোমাধারী) মিসাইল সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন নেতা ট্রাম্পের নীতি এখন সাধারণ মানুষকে বাঙ্কারে বন্দী জীবনে বাধ্য করছে।
কিন্তু যুদ্ধের এই দামামা কেবল ক্ষেপণাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। পানিপথেও ঘনিয়ে আসছে বড় বিপদ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে মার্কিন রণতরী দিয়ে পাহারার (এসকর্ট) পরিকল্পনা করছেন। এই পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ১৯৮৮ সালের সেই অভিশপ্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৮৮ সালে ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস যেভাবে ইরানি মাইনের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল, এবার বিপদ তার চেয়েও বহুগুণ বেশি। বর্তমানে ইরানের হাতে থাকা ‘ফাস্ট বোট’ বা দ্রুতগামী ছোট যুদ্ধনৌকা, ড্রোন এবং জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল মার্কিন নৌবাহিনীর বড় বড় জাহাজগুলোকে সহজেই শিকার করতে পারে।
মাইন ও ফাস্ট বোটের ‘অ্যাসিমেট্রিক’ আতঙ্ক
পানিপথে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো ইরানের ‘অ্যাসিমেট্রিক’ বা অসম রণকৌশল। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরানের শত শত ফাস্ট বোট কেবল সাধারণ নৌকা নয়, বরং এগুলোকে প্রয়োজনে ‘গাইডেড বোম্ব’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। উপকূলে লুকিয়ে থাকা এই নৌকাগুলো যখন একসাথে পতঙ্গর মতো ঝাঁকে ঝাঁকে (সোয়র্ম অ্যাটাক) আক্রমণ চালাতে পারে। এমন হামলার মুখে অত্যাধুনিক মার্কিন ডেসট্রয়ারগুলোর পক্ষে সবগুলোকে ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের অগভীর পানিতে পেতে রাখা মাইন, যা ১৯৮৮ সালের ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টসের মতো আধুনিক রণতরীকেও মুহূর্তেই পঙ্গু করে দিতে পারে।
বিমা ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা
সামরিক পাহারার আশ্বাস সত্ত্বেও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বড় বড় জাহাজ মালিক এবং অপারেটররা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কেবল নৌবাহিনীর পাহারা থাকলেই তারা জাহাজ পাঠাতে রাজি নন। কারণ, আকাশচুম্বী বিমা খরচ (ইন্স্যুরেন্স রেট) অনেক ক্ষেত্রে সামরিক সুরক্ষার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রিক শিপিং টাইকুন ইভানজেলোস মারিনাকিস বলেছেন, একটি স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য সামরিক কাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারা এই মৃত্যুপুরীতে জাহাজ পাঠাবেন না। ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, বরং এক অনিশ্চিত ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে।
সুরক্ষার কৌশল বনাম ঝুঁকি
এফটি জানাচ্ছে, যদি শেষ পর্যন্ত এসকর্ট অপারেশন শুরু হয়ও, তবে তার কৌশল হবে অত্যন্ত জটিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডাবল হালের (দ্বি-স্তর বিশিষ্ট) বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সামনে রাখা হবে যাতে মাইনের আঘাত তারাই আগে সহ্য করে। আর মার্কিন ডেসট্রয়ার বা রণতরীগুলো থাকবে একটু পাশ কাটিয়ে, যাতে তারা ড্রোন বা মিসাইল রুখে দিতে পারে। কিন্তু এতেও বিমা কোম্পানি বা জাহাজ মালিকরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
মার্কিন লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা ও মিত্রদের অনীহা
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের সামনে আরেকটি বড় বাধা হলো সম্পদের সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১৪টি ডেসট্রয়ার রয়েছে, যার একটি বড় অংশ আবার বিমানবাহী রণতরীর পাহারায় ব্যস্ত। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সফল ‘এসকর্ট’ বা পাহারা মিশন শুরু করতে অন্তত ১০ থেকে ১৬টি অতিরিক্ত রণতরীর প্রয়োজন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর সহায়তা নিতে চাইলেও মিত্র দেশগুলো এই মুহূর্তে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীকে কার্যত একাই এই বিশাল ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা তাদের সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।#



