আকাশে তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে দক্ষিণ ইসরাইলের শান্ত মরুশহর বিয়ারশেবার আকাশ চিরে ধেয়ে এলো আগুনের গোলা। নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে। এক লহমায় বদলে গেল দৃশ্যপট। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের মাটিতে হওয়া মার্কিন ও ইহুদিবাদী আগ্রাসনের মোক্ষম জবাব দিতে বেছে নিল ইসরাইলের গর্ব সমর প্রযুক্তির আসল মস্তিষ্ককে। মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখটি ইহুদিবাদী গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাসে এক কালো দিন হিসেবে খোদাই হয়ে রইল। ইরানের নিখুঁত মিসাইল হামলায় ধুলোয় মিশে গেছে দখলদার বাহিনীর অন্যতম প্রধান প্রযুক্তিকেন্দ্র গাভ ইয়াম অ্যাডভান্সড টেকনোলজি পার্ক।
এই গাভ ইয়াম পার্কটি কেবল কতগুলো কাঁচঘেরা দালান নয়। দক্ষিণ ইসরাইলের এই চত্বরটি মূলত তেল আবিবের প্রতিরক্ষা কবজ তৈরির কারখানা। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে ইরানের মূল লক্ষ্য ছিল এই পার্কের ভেতরে থাকা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের অত্যন্ত গোপনীয় গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র।
রাফায়েল হলো ইসরাইলের অস্ত্র ও সাইবার প্রযুক্তির তিন প্রধান স্তম্ভের একটি। বছরের পর বছর ধরে তারা এই বিয়ারশেবা কেন্দ্রে বসে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র তৈরির নীল নকশা সাজিয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, গাভ ইয়াম পার্কটি হলো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ‘মস্তিষ্ক’। ইরান কেন বারবার এই জায়গাকেই লক্ষ্যবস্তু করতে চায়, তার মূল কারণ হলো- এখানেই তাদের শত্রু শিবিরের সবচেয়ে আধুনিক সাইবার অস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি হয়।
ইরানের এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের পেছনে ছিল গভীর কৌশল। রাফায়েলের এই কেন্দ্রটি তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করছিল। প্রথমত তারা তৈরি করছিল মানুষের সাহায্য ছাড়াই হামলা চালাতে পারে সক্ষম এমন সব সয়ংক্রিয় ড্রোন বা অটোনোমাস গ্রাউন্ড অ্যান্ড এয়ার সিস্টেম। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের মাটিতে চালানো হামলায় এই ঘাতক ড্রোনগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, এখান থেকেই ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় সাইবার হামলা চালানোর ছক কষা হতো। আর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল আয়রন ডোম এবং ডেভিডস স্লিংয়ের মতো ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করা।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে রাফায়েলের উন্নত ল্যাবরেটরি এবং অত্যন্ত দামি যন্ত্রপাতিগুলোর আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। এই পার্কটির পাশেই রয়েছে বেন গুরিয়ান ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়টিই মূলত ইসরাইলি সেনাবাহিনী বা আইডিএফের জন্য দক্ষ সাইবার যোদ্ধা এবং ইঞ্জিনিয়ার সরবরাহ করে। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে যে অজেয় দুর্গ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল ইরানের ক্ষিপণাস্ত্রে তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে ইরান কেবল সামরিক ঘাঁটি নয় বরং যুদ্ধের পেছনের আসল নকশাকারদের আস্তানায় আঘাত হানছে। এই হামলায় রাফায়েলের গবেষণা কেন্দ্রের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। এর ফলে ইহুদিবাদী ইসরাইলের নতুন প্রজন্মের সাইবার অস্ত্র বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতা বড়সড় ধাক্কা খেল। হামলার এই নিখুঁত লক্ষ্যভেদ প্রমাণ করে, ইরানের গোয়েন্দা নজরদারি এখন শত্রু শিবিরের প্রতিটি অলিগলি চেনে। যুদ্ধের দামামা যারা বাজিয়েছিল তাদেরই ঘরের ভেতর ঢুকে উপযুক্ত সময়ে মরণকামড় দিয়েছে তেহরান। ভোরের সেই অগ্নিবৃষ্টি বুঝিয়ে দিল যে ইরানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের সমর মানচিত্রের সংজ্ঞাই আগাগোড়া বদলে যেতে পারে।
ভোরের এই লেলিহান শিখা কেবল আজকের ধ্বংসলীলাই নয়, বরং মনে করিয়ে দিচ্ছে ঠিক আট মাস আগের এক অভিশপ্ত রাতের কথা। সেবার ঠিক একইভাবে ইরানের নিখুঁত নিশানায় ধুলোয় মিশে গিয়েছিল ইসরাইলের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ‘ওয়াইজম্যাগ’ গবেষণাগার। সেই যুদ্ধে ওয়াইজম্যাগ ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে ইহুদিবাদী শক্তির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল, আজ ৩ মার্চের এই হামলা যেন তারই চূড়ান্ত পেরেক ঠুকে দিলো।
সেদিন ওয়াইজম্যাগ হারানো ছিল ইসরাইলি গোয়েন্দা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব বরণ করার মতো; আর আজ গাভ ইয়াম পার্কের এই পতন তাদের ভবিষ্যৎ মারণাস্ত্র তৈরির মেরুদণ্ডটাই ভেঙে দিলো। এই দুই মহাপ্রলয়ের যোগসূত্র এক নির্মম সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে- ইরানের ধৈর্য যখন হারায়, তখন কোনো আধুনিক ঢাল বা ‘আয়রন ডোম’ ইটের টুকরোর মতো ধসে পড়া আটকাতে পারে না। ৩ মার্চের এই আগুনের কুণ্ডলী প্রমাণ করে দিল যে, ওয়াইজম্যাগ থেকে শুরু হওয়া সেই ধ্বংসের মহাকাব্য আজ গাভ ইয়ামের ধ্বংসস্তূপে এসে এক পূর্ণ ও নাটকীয় সমাপ্তি পেল। যুদ্ধের দামামা যারা বাজিয়েছিল, আজ তাদেরই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলো মরুভূমির বালিতে চিরতরে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।



