ট্রাম্পের হুঙ্কার বনাম তেহরানের তুরুপের তাস

ইরান যুদ্ধের গোলকধাঁধায় কি পথ হারাচ্ছে ওয়াশিংটন?

রণাঙ্গনে হয়তো একেকটি লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে ধ্বংস হচ্ছে, কিন্তু এই যুদ্ধের শেষ কোথায় বা এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী, তা আজও কুয়াশাচ্ছন্ন। একদিকে তেলের বাজারের হাহাকার, অন্যদিকে মিত্রদের সাথে টানাপড়েন—সব মিলিয়ে ট্যাকটিক্যাল জয়ের আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে কৌশলগত অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়ায়।

সৈয়দ মূসা রেজা

আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা মিসাইল আর নিখুঁত নিশানায় গুঁড়িয়ে দেয়া বাঙ্কার—প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে বিজয় কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু যুদ্ধের ময়দান যখন তেলের বাজার আর সাইবার জগতের অদৃশ্য জালে জড়িয়ে যায়, তখন কেবল 'ট্যাকটিক্যাল' বা রণকৌশলগত সাফল্য দিয়ে শেষ রক্ষা হয় না। ইরান যুদ্ধ আজ সেই কঠিন সত্যেরই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনীর হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিণতির এক জটিল মাকড়সার জাল জয়ের পথকে ক্রমেই দুর্গম করে তুলছে।

ফোরকাস্ট ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র অ্যানালিস্ট শন ম্যাকডুগাল বলছেন, এই যুদ্ধ এখন রণকৌশলগত সাফল্যের সীমাবদ্ধতা পরীক্ষা করছে। গত সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৯ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের ১৪০টিরও বেশি নৌযান। বিশেষ করে মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে খাড়গ দ্বীপে চালানো হামলাটি ছিল বেশ কৌশলী, কারণ ইরানের সিংহভাগ তেল এখান থেকেই রপ্তানি হয়। সেন্টকমের দাবি, তারা কেবল দ্বীপের সামরিক স্থাপনা ও মাইন মজুতগারে আঘাত হেনেছে। তবে অন্যান্য হামলায় ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানও বসে নেই; তারা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল শোধনাগারে হামলা শুরু করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে অস্থিরতা চরমে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলা। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বড় বড় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিশানায় আছে, যা সরকারি নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ পরিষেবা পর্যন্ত অচল করে দিতে পারে।

এদিকে যুদ্ধের ময়দান থেকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় এক ভিন্ন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক বিশ্লেষণে গবেষক এসফান্দিয়ার বাকেরি বিষয়টিকে দেখছেন ট্রাম্পের এক ধরনের 'পিছু হটা' হিসেবে।

তার মতে, যুদ্ধ কেবল উন্নত অস্ত্র বা বোমা ফেলার লড়াই নয়, এখানে অর্থনীতি ও জ্বালানি এখন প্রধান হাতিয়ার। ট্রাম্প যখন বাজারের লেনদেন বন্ধ হওয়ার মুখে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন, তখন ইরানও পাল্টা হুমকি দেয় পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেয়ার। এরপরই দেখা যায় ট্রাম্পের সুর নরম হতে। তিনি তার আল্টিমেটাম আরো পাঁচ দিন পিছিয়ে দিয়েছেন, যা মূলত বাজার সামাল দেয়া এবং সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল মাত্র। বাঘেরির মতে, মার্কিন বন্ড মার্কেট যখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিকূলে যাচ্ছে, তখন তিনি মূলত এই পাঁচ দিন সময় কিনে নিয়ে বাজার ও জনমত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।

যুদ্ধের এই আবহে মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনী অনবরত ইরানি শাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের টার্গেট করছে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড বুধবার সিনেটরদের জানিয়েছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে থাকলেও তা অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি এবং বাসিজ মিলিশিয়ার প্রধান জেনারেল গোলাম রেজা সোলেমানি নিহত হয়েছেন। লারিজানির মৃত্যু ইরানের জন্য এক বিশাল ধাক্কা, কারণ মনে করা হয় আয়াতুল্লাহিল উজমা আলি খামেনির শাহাদতের পর তিনিই সামরিক অভিযানের হাল ধরেছিলেন। এর পরপরই বুধবার ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খতিবও নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

তবে আসল সঙ্কট লুকিয়ে আছে সমুদ্রের নীল জলরাশিতে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে সরু পথ দিয়ে যায়, সেই 'হরমুজ প্রণালী' এখন কার্যত অবরুদ্ধ। ইরানের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল আর ড্রোন বোটগুলো এখানে প্রধান আতঙ্ক। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরোনো এ-টেন (A-10) ওয়ার্টহগ বিমানগুলোকেও এখন এই ছোট ছোট দ্রুতগামী নৌযান ঠেকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ধারণা ছিল ইরান হয়তো ভয় পেয়ে নতি স্বীকার করবে, কিন্তু তারা আবারো প্রমাণ করেছে যে তারা সহজে দাবার চাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। ট্রাম্পের একেক সময় একেক অবস্থানে মিত্রদেশগুলোও বিভ্রান্ত। জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সরাসরি বলে দিয়েছেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়।” ক্ষুব্ধ ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, সাহায্য না করলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ “খুবই খারাপ” হবে। যদিও পরে এক ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে তিনি লেখেন, “আমাদের আর ন্যাটোর সাহায্যের কোনো দরকার নেই!” তবে শেষমেশ কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাজ্যসহ সাতটি দেশ হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার ব্যাপারে কাজ করতে রাজি হয়েছে।

এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে ওয়াশিংটন এখন তাদের জরুরি তেল মজুত (SPR) থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, রাশিয়ার ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে তারা, যা পরোক্ষভাবে ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকেই শক্তিশালী করবে। এমনকি ভেনেজুয়েলা ও খোদ ইরানের তেলের ওপর থেকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সরানোর পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। লক্ষ্য একটাই—নিজের দেশে তেলের দাম বাড়তে না দেয়া। রণাঙ্গনে হয়তো একেকটি লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে ধ্বংস হচ্ছে, কিন্তু এই যুদ্ধের শেষ কোথায় বা এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী, তা আজও কুয়াশাচ্ছন্ন। একদিকে তেলের বাজারের হাহাকার, অন্যদিকে মিত্রদের সাথে টানাপড়েন—সব মিলিয়ে ট্যাকটিক্যাল জয়ের আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে কৌশলগত অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়ায়।

সূত্র: ফোরকাস্ট ইন্টারন্যাশনাল, তাসনিম নিউজ।