ইসরাইলকে যেভাবে হামলার সক্ষমতা জানান দিচ্ছে ইরান

এসব হামলায় অন্তত ১৬০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলি আবাসিক এলাকা
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলি আবাসিক এলাকা |রয়টার্স

তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইসরাইলের অভ্যন্তরে পাল্টা হামলা চালিয়ে ক্ষতি করার সক্ষমতা যে এখনো আছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তা জানান দিলো ইরান।

শনিবার রাতে ইসরাইলের পারমাণবিক স্থাপনার নিকটবর্তী দুটি শহরে হামলা চালায় ইরান।

এসব হামলায় অন্তত ১৬০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা।

তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

হামলার শিকার শহর দুটি হলো আরাদ ও দিমোনা।

জানা গেছে, ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার ঘটনায় আরাদে ৮৪ জন এবং দিমোনায় আরো ৭৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এই হামলায় দিমোনার প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কী-না, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছিল, শনিবার ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে ওই হামলা চালানো হয়েছে।

আরাদ শহরে শনিবার রাতে এক হামলায় দুটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভবনের বাইরের দেয়াল অনেক জায়গায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

নেগেভ মরুভূমির এই শহরটি রক্ষণশীল ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর আশেপাশে ভিড় করেন স্থানীয়রা।

ইসরাইলের অভ্যন্তরে ইরানের এখনো এ ধরনের ক্ষতিসাধন করার ক্ষমতা এই যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্য সম্পর্কেই ঈঙ্গিত দেয়।

ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কিভাবে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করল, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে জরুরি তদন্ত চলছে।

কিন্তু, এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে অভ্রান্ত নয়, তা ইসরাইলিদের অজানা নয়।

গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেও বিষয়টি টের পেয়েছিল তারা।

নেতানিয়াহু বললেন, ‘মিরাকল’

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাস্থল দক্ষিণ ইসরাইলের আরাদ শহর পরিদর্শন করে এই হামলায় কেউ নিহত না হওয়াকে ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

শনিবার শহরটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

নিহত হওয়ার ঘটনা না থাকলেও ইসরাইলি জনগণকে ‘আত্মতুষ্টিতে’ না ভোগার আহ্বান জানান নেতানিয়াহু। বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্ক সংকেত বাজার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হবে।

শনিবার রাতে ইরানি হামলার কথা উল্লেখ করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সতর্কবার্তা পাওয়ার পর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি পড়ার আগ পর্যন্ত পুরো ১০ মিনিট সময় ছিল।’

যদি ওই কয়েক মিনিটের মধ্যে সবাই সুরক্ষিত জায়গায় অর্থাৎ, ভবনের নিচে থাকা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেত তাহলে কেউই আহত হতো না, যোগ করেন তিনি।

নতুন করে হামলা

টেলিগ্রামে পোস্ট করা ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতের আঘাতের পর ইরান থেকে ইসরাইলের দিকে আবারো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই হুমকি ঠেকাতে কাজ করছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিও খবর দিয়েছে যে, নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রোববার ইরান থেকে ছোড়া চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ‘ইরানের এই প্রকাশ্য আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর’ থেকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এ পর্যন্ত মোট ৩৪৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ১,৭৭৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে আল্টিমেটাম, পাল্টা হুমকি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার জন্য ইরানকে নতুন করে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, এই সময় পার হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস’ বা ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেবে।

বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল রফতানির পথ- ভৌগোলিকভাবে সংকীর্ণ পানিপথ হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিষয়টি ‘সহজ সামরিক কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, বর্তমানে কেবল ইরানের অনুমোদিত জাহাজগুলোই ওই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করছে।

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেয়ার পর, তেহরান জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলা করবে ইরান।

দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বলেছেন, ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যদি হামলা করে, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জরুরি অবকাঠামোতে ‘অপূরণীয় ধ্বংসযজ্ঞ’ চালানো হবে।

সামাজিক মাধ্যম এক্সে মোহাম্মদ-বাঘের ঘালিবাফ লিখেছেন, সেক্ষেত্রে জরুরি অবকাঠামো, জ্বালানি ও তেলক্ষেত্র– সবই হবে ইরানের ‘বৈধ টার্গেট’।

এছাড়া বিশ্বজুড়ে তেলের দাম অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন ইরানের স্পিকার।

এর আগে, শনিবার ইরান দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে, হামলাটি ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ‘পুনরায় শুরু’র ব্যাপারে আশা রাখেন।

বিবিসি’র মার্কিন সহযোগী সিবিএস’র ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

সিবিএসকে গ্রোসি বলেন, ‘আমি হোয়াইট হাউস ও ইরানের সাথে গুরুত্ববহ আলোচনা করছিলাম। কিছু যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল এবং আমরা সেই সম্পর্কটি পুনরায় স্থাপন করতে পারব বলে আশা করি।’

একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে কিনা, জানতে চাইলে গ্রোসি বলেন, ‘যতক্ষণ আলোচনা চলছে, একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে।’

সূত্র : বিবিসি