আইনের লালবাতি পেরিয়ে যুদ্ধের অন্ধকারে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কংগ্রেসকে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা দিয়েছে, প্রেসিডেন্টকে নয়। অনেকে মানেন, সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ প্রেসিডেন্টকে হঠাৎ আক্রমণের জবাব দিতে কিছু স্বাধীন ক্ষমতা দেয়।

সৈয়দ মূসা রেজা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |সংগৃহীত

ভোরের আলো তখনো পুরো ফোটেনি। হোয়াইট হাউস থেকে হঠাৎ ঘোষণা এলো আমেরিকা এখন যুদ্ধে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসনব্যবস্থার আসন্ন হুমকি ধ্বংস করছে। কিন্তু সেই হুমকি কী, কোথায়, কতটা কাছে ছিল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দিলেন না।

কথার ভেতর ভেসে উঠল পুরোনো কিছু ঘটনা। ১৯৮১ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল। ১৯৮৩ সালে লেবাননে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলা। ২০০০ সালে ইউএসএস কোল জাহাজে আঘাত।

ট্রাম্প দাবি করলেন, ইরান এসব জানত, হয়তো জড়িতও ছিল। অথচ একইসাথে তিনি বললেন, গত গ্রীষ্মেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে নতুন এই আসন্ন বিপদ কোথা থেকে এলো। প্রশাসন কোনো প্রমাণ দেখাল না।

এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো বিস্ফোরক করে তুলল। ট্রাম্প যেন প্রকাশ্যেই বিদেশী নেতাদের টার্গেট করার পথে হাঁটলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনা ঘটল। এরও দু’মাস আগে ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের জন্য সেনা পাঠানো হয়েছিল। ট্রাম্পের আগের দফার কৌশলের তুলনায় এটি একেবারেই নতুন দ্বীপ। আইনের বিচারে এই আঘাত একাধিক সীমা অতিক্রম করেছে। দেশের ভেতরের আইনও, আন্তর্জাতিক আইনও। কেউ হয়তো যুদ্ধকে সমর্থন করেন। কেউ হয়তো মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শাসন পরিবর্তনের নামে আগের যুদ্ধ কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পছন্দ আর আইনের প্রশ্ন এক নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কংগ্রেসকে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা দিয়েছে, প্রেসিডেন্টকে নয়। অনেকে মানেন, সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ প্রেসিডেন্টকে হঠাৎ আক্রমণের জবাব দিতে কিছু স্বাধীন ক্ষমতা দেয়। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানেনি। তাহলে জরুরি আত্মরক্ষার যুক্তি কোথায়।

১৯৭৩ ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন স্পষ্ট বলছে, তিন অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদেশে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নিতে পারেন। কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণা থাকতে হবে। নির্দিষ্ট আইনি অনুমোদন থাকতে হবে। অথবা যুক্তরাষ্ট্র, তার ভূখণ্ড বা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আক্রমণ থেকে জাতীয় জরুরি অবস্থা তৈরি হতে হবে। ট্রাম্প এই তিনটির একটিও প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি। সম্ভবত করার সুযোগও ছিল না।

আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও চিত্র ভিন্ন নয়। জাতিসঙ্ঘ সনদ, যা ১৯৪৫ সালে মার্কিন সিনেট বিপুল সমর্থনে পাস করে এবং প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান সই করেন, বলছে কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ।

নিরাপত্তা পরিষদ আত্মরক্ষার অধিকার রক্ষায় বলপ্রয়োগ অনুমোদন দিতে পারে। এখানে তা হয়নি। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইতোমধ্যে এই হামলাকে সনদ লঙ্ঘন বলেছেন।

কিছু আইনজীবী বলেন, প্রেসিডেন্ট চাইলে জাতিসঙ্ঘ সনদ উপেক্ষা করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী অনুমোদিত চুক্তি দেশের সর্বোচ্চ আইন। আদালত হয়তো সরাসরি প্রয়োগ করতে পারবে না। তবু রাজনৈতিক শাখাগুলো নৈতিকভাবে বাধ্য।

খামেনিকে হত্যার ঘটনাও আন্তর্জাতিক আইনে প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যা সাধারণত নিষিদ্ধ। এটি ট্রাম্পের প্রথম দফায় কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার চেয়েও বড় পদক্ষেপ। সোলাইমানি ছিলেন ইরানের সামরিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান নন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনেও ধারাবাহিক নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও ভাষার ফাঁকফোকরে প্রেসিডেন্টরা পথ খুঁজে নিয়েছেন।

গত ২৫ বছরে বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে যে বিতর্ক চলেছে, তার সাথে এই দৃশ্য অচেনা নয়। গত অর্ধশতকে প্রায় সব প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনোভাবে এই সীমা ছুঁয়েছেন। শাস্তির পথ ফৌজদারি মামলা নয়, অভিশংসন। কিন্তু এ কারণে কাউকে অভিশংসিত করা হয়নি। ফলে প্রত্যেক উত্তরসূরি নিজেকে আরো সাহসী মনে করেছেন। ট্রাম্পের আইনজীবীরা এখন বলছেন, ইতিহাস এবং নজির তার পক্ষে।

ওয়াশিংটনে আইনি বিতর্ক হয়তো এমনই ঘুরপাক খাবে। শোনা যাবে, বারাক ওবামা লিবিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছিলেন। তুলনা টানা হবে। কিন্তু প্রেক্ষাপট আর মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ লালবাতি অমান্য করলে যদি জানা যায় তিনি গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিচ্ছেন, প্রতিক্রিয়া একরকম হয়। আর কেউ যদি বিশাল আন্তর্জাতিক আর্থিক জালিয়াতি করেন, সেটি অন্যরকম।

ওবামার ক্ষেত্রে ন্যাটো জোট ছিল। মানবিক সঙ্কটের যুক্তি ছিল। মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিশৃঙ্খলার মধ্যে মারা যান। তাকে আলাদা করে টার্গেট করা হয়নি। পরে বেনগাজিতে চার মার্কিন নিহত হন। মার্কিন কংগ্রেসে বছরের পর বছর তদন্ত চলে। কিন্তু ইরানে ইতোমধ্যে তিন মার্কিন সেনা নিহত। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, হতাহতের ঘটনা আবারো ঘটতে পারে।

ভয় এখানেই। এই যুদ্ধ কি জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের মতো জটিল জালে জড়িয়ে ফেলবে যুক্তরাষ্ট্রকে। নাকি আরো ধ্বংসাত্মক কিছু। ইরাক যুদ্ধে কংগ্রেস সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিল। বিপুল ভোটে। সাদ্দাম হুসেইন বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যদিও বিচার নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তারপর ফাঁসি।

ইরাক যুদ্ধ জাতিসঙ্ঘ সনদ লঙ্ঘন করেছিল। কিন্তু বেশিভাগ আমেরিকান এখন সেটিকে খারাপ সিদ্ধান্ত বলেন প্রাণহানি, বিপুল ব্যয় আর বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে। আরো বলেন, নয়-এগারোর হামলা আর গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে ভ্রান্ত দাবি দেখিয়ে জনগণকে রাজি করানো হয়েছিল। ইরানের ক্ষেত্রে যুদ্ধ জনগণের কাছে বিক্রিই করা হয়নি।

এ যুদ্ধ এমন সময় এলো, যখন ট্রাম্প একসময় ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন বলে দাবি করেন এবং পুনর্নির্বাচিত হলে বৈশ্বিক শান্তির যুগ আনবেন বলেছিলেন। অথচ ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবা পর্যন্ত উত্তেজনা বাড়িয়েছেন। তার ওপর গত বছর জুড়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও নড়বড়ে করেছেন। জরুরি শুল্ক আরোপ করে মিত্র আর প্রতিপক্ষ সবাইকে ক্ষুব্ধ করেছেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এই ক্ষমতা তার ছিল না। বিদেশী দেশগুলো এখন ক্ষতি সামলাতে ব্যস্ত। অবৈধভাবে নেয়া অর্থ ফেরত দেয়া বা নতুন বাণিজ্য আলোচনার স্পষ্ট পরিকল্পনাও নেই।

দেশের ভেতরেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অভিবাসন দমনে কঠোর পদক্ষেপে অসন্তোষ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, আইনি ভিত্তি না থাকাটা কি গুরুত্বহীন। না, গুরুত্ব আছে। আইন শুধু আদালতের বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক আর সামাজিক মানদণ্ডও স্থির করে। নেতা কেমন আচরণ করবেন, সেই প্রত্যাশা তৈরি করে। প্রেসিডেন্ট আইন ভাঙলে জনবিশ্বাস ভাঙে। আর আইনেও, জীবনের মতোই, প্রেক্ষাপট আর মাত্রা দিয়ে বিচার হয়।

এদিকে ইরান নিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়েও ট্রাম্প উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাসনিম নিউজ এজেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ জানায়, তিনি চান না আক্রমণ দীর্ঘায়িত হোক। বলেছেন, তিনি ভেবেছিলেন চার সপ্তাহ লাগবে। এখন নাকি সময়ের আগেই এগিয়ে আছেন। অথচ সামরিক ও বিশ্লেষক মহলে শোনা যাচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক আগ্রাসনে গোলাবারুদের ঘাটতির আশঙ্কা বাড়ছে।

ইরানের পাল্টা আঘাতে তিনি বিস্মিত হয়েছেন বলেও খবর। পারস্য উপসাগর-সংলগ্ন আরব দেশগুলোতে আগ্রাসীদের স্বার্থ আর ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান যে জবাব দিয়েছে, সেটিকে তিনি বড় চমক বলেছেন। একইসাথে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টায় দাবি করেছেন, আরব দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহী। আগে নাকি কম অংশ নেয়ার কথা ছিল, এখন নাকি জোর দিচ্ছে।

তিনি স্বীকারও করেছেন, হোয়াইট হাউসের চাওয়া সবকিছু আলোচনায় ইরান দিতে রাজি হয়নি। তার ভাষায়, তাদের দেয়া উচিত ছিল। আবারো তিনি ২০২০ বাগদাদে হামলা আর হাজ্জ কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেছেন। দাবি করেছেন, সোলাইমানিকে না মারলে ইসরাইল হয়তো আজ থাকত না।

শুরুতে যে লালবাতি উপেক্ষা করে যুদ্ধের ঘোষণা এসেছিল, গল্প শেষেও সেই লাল আলোই জ্বলছে। প্রশ্ন একই রয়ে গেছে। আইন, আস্থা আর প্রাণহানির হিসাব কেমন দাঁড়াবে। আর কত মৃত্যু ও ধ্বংসের পর থামবে এই দৌড়।