মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সঙ্ঘাত নয়; এটি ক্রমেই বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধের ৩৪তম দিনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভাষণ এবং পশ্চিমা নেতাদের সতর্কবার্তা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে– এই যুদ্ধ কি কেবল সামরিক সংঘর্ষ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ‘গেম থিওরি’? বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন আলোচিত চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় অধ্যাপক জিয়াং।
যুদ্ধ, ভাষণ ও জনমত ব্যবস্থাপনা
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন– যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজন হলে তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হানবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘কৌশলগত লক্ষ্য’ অর্জনের কাছাকাছি এবং খুব শিগগিরই আরো কঠোর হামলা চালানো হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার নেতারা তাদের জনগণকে আগাম সতর্ক করে দিয়েছেন– জ্বালানির দাম বাড়বে, অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
এই তিনটি বক্তব্য একসাথে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় : সরকারগুলো যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অভিঘাতের জন্যও জনমত প্রস্তুত করছে।
সঙ্ঘাতের বিস্তার : আঞ্চলিক থেকে বহুমাত্রিক যুদ্ধ
ইসরাইল-ইরান সঙ্ঘাত ইতোমধ্যে লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক পানিপথ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হিজবুল্লাহর রকেট হামলা, ইরানের পাল্টা আঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সরাসরি সম্পৃক্ততা– সব মিলিয়ে এটি একাধিক ফ্রন্টে পরিচালিত যুদ্ধ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা। বিশ্বে মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সঙ্কীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি বড় অংশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
স্থল আক্রমণের প্রশ্ন : বাস্তবতা বনাম কৌশল
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আক্রমণ নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। কিন্তু সামরিক বাস্তবতা বলছে, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান– জাগ্রোস পর্বতমালা, বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং দীর্ঘ সরবরাহ লাইন– যেকোনো বাহিনীর জন্য দুঃস্বপ্ন। প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও, ইরানের মতো বৃহৎ দেশ দখল বা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে– যদি এই যুদ্ধ জেতা কঠিন হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন এতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে?
গেম থিওরির দৃষ্টিকোণ: ‘হারতে চাওয়া’ কৌশল?
এখানেই আসে গেম থিওরির ব্যাখ্যা। প্রচলিত বিশ্লেষণে ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো অনেক সময় অগোছালো বা আত্মঘাতী মনে হয়। কিন্তু যদি ধরা হয়– এই বিশৃঙ্খলা পরিকল্পিত?
একটি বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো: যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি সঙ্ঘাত তৈরি করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করবে– এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই লাভবান হবে।
জ্বালানি রাজনীতি : মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তর আমেরিকা
বিশ্বের একটি বড় অংশ– বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপ–মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ ব্যাহত হবে।
ফলে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে হবে–যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভেনিজুয়েলা ও রাশিয়া।
অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা যত বাড়বে, উত্তর আমেরিকা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বৃহত্তর উত্তর আমেরিকা’ ধারণা–গ্রিনল্যান্ড, পানামা খাল, এমনকি লাতিন আমেরিকার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা–নতুন অর্থ পায়।
জ্বালানি ছাড়াও আরো বড় সঙ্কট
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার উৎপাদনের কাঁচামাল– ফসফেট, অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া– পরিবাহিত হয়। এগুলো খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে খাদ্যসঙ্কটও তৈরি হতে পারে। একই সাথে হিলিয়াম ও সালফারের মতো উপাদান, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত হয়, তাও বিঘ্নিত হবে।
অর্থাৎ, জ্বালানি, খাদ্য ও প্রযুক্তি–আধুনিক অর্থনীতির তিনটি স্তম্ভই ঝুঁকির মুখে।
বৈশ্বিক নির্ভরতার পুনর্গঠন
যদি এই সঙ্কট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া বাধ্য হবে নতুন সরবরাহ শৃঙ্খলার দিকে ঝুঁকতে।
এই নতুন শৃঙ্খলায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া প্রধান সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে, যেখানে ‘গ্লোবাল সাউথ’ নয়, বরং সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে বৈশ্বিক প্রবাহ।
পানি ও স্থিতিশীলতার রাজনীতি
গেম থিওরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পানি। যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত মিঠা পানি আছে–যেমন উত্তর আমেরিকা ও রাশিয়া–সেগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের কিছু অংশ পানিসঙ্কটে ভুগছে, যা ভবিষ্যৎ সঙ্ঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
চীনের ক্ষেত্রেও একটি জটিলতা রয়েছে। যদিও তাদের পানির উৎস রয়েছে, তিব্বত মালভূমি থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর ওপর প্রতিবেশী দেশগুলোর নির্ভরতা ভবিষ্যতে নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
‘বিশৃঙ্খলা’ কি আসলে কৌশল?
সমালোচকদের চোখে ট্রাম্পের নীতি এলোমেলো– একদিকে ইরানের সাথে যুদ্ধ, অন্যদিকে ন্যাটো মিত্রদের সাথে টানাপড়েন, আবার উত্তর আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
কিন্তু গেম থিওরির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ হতে পারে– যেখানে স্বল্পমেয়াদে ক্ষতি মেনে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা হয়।
যদি মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল থাকে, বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং নতুন করে গড়ে ওঠে– তাহলে সেই নতুন ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার দ্বারপ্রান্তে?
ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি কেবল সামরিক সঙ্ঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি পরীক্ষাগার।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল সত্যিই পরিকল্পিত কি না, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট– এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি রাজনীতি এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে আমূল বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
গেম থিওরির ভাষায়, এটি একটি ‘হাই-রিস্ক, হাই-রিওয়ার্ড’ খেলা–যেখানে ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, আর সফল কৌশল নতুন বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।



