বিপজ্জনক এক রণকৌশল সাজিয়েছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ঘাতক ‘মাইন’। সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী এই অস্ত্র দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীকে কার্যত পঙ্গু করে দেয়ার ছক কষছে তেহরান। আর এই চোরাগোপ্তা হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতিতে খোদ পেন্টাগনই এখন বড়সড় সঙ্কটে।
পারস্য উপসাগরের সরু নৌপথ এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। মার্কিন নৌ-কৌশলী আর জাহাজ কোম্পানিগুলোর জন্য রাতের ঘুম হারাম করে দেয়ার মতো এক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। আগ্রাসী যুদ্ধের শিকার ইরান যদি হরমুজ প্রণালির দখল নিতে চায়, তবে তাদের তুরুপের তাস হতে পারে সমুদ্রতলে লুকিয়ে রাখা কয়েক হাজার মাইন।
সাগরের নিচে ঘুমিয়ে থাকা বিপদ
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির ইরান-বিষয়ক নৌ-বিশেষজ্ঞ ফারজিন নাদিমি বলছেন, এটা প্রায় নিশ্চিত যে ইরান ইতোমধ্যেই সমুদ্রতলে বেশ কিছু ডিভাইস বা মাইন বসিয়ে রেখেছে। যেকোনো সময় শুধু একটি সিগন্যাল দিয়ে এগুলোকে সক্রিয় করা সম্ভব। সারাবিশ্বের পানিপথের বাণিজ্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এখান দিয়ে যায়। ফলে এখানে একটি বিস্ফোরণ মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস।
আসল লড়াই যেখানে: ৬০০০ মাইনের মজুদ
লন্ডনের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে (এফটি) প্রকাশিত এক বিশেষ ফিচারে সাংবাদিক জ্যাকব জুডাহ তুলে ধরেছেন এই নেপথ্য সঙ্কটের কথা।
তিনি জানাচ্ছেন, ইরানের ভাণ্ডারে অন্তত ছয় হাজার নৌ-মাইন আছে। উপকূল থেকে তারের মাধ্যমে বা শব্দ সংকেত (অ্যাকুস্টিক সিগন্যাল) পাঠিয়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের দাবি, ইরান ইতোমধ্যেই উপসাগরের সরু অংশে অন্তত এক ডজন মাইন স্থাপন করে রেখেছে। এই এলাকাটি চওড়ায় মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৩৯ কিলোমিটার। মাছ ধরার ট্রলার, কার্গো জাহাজ এমনকি কাঠের ডিঙি নৌকায় চেপেও চুপিচুপি এই মাইন সাগরে ফেলে আসা যায়।
প্রস্তুতিতে পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র?
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার টম শুগার্ট বলছেন, ‘মাইন পাতা যতটা সহজ, তা পরিষ্কার করা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন।’
এখানে বড় অসমতা কাজ করে। ইসরাইল এবং হামাস-হিজবুল্লাহর সাথে উত্তেজনার এই আবহে যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের মাইন-বিরোধী সক্ষমতা।
গত কয়েক দশকে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজ বা ‘মাইনসুইপার’-এর পেছনে বাজেট কমিয়েছে। বর্তমানে তাদের কাঠের তৈরি পুরোনো অ্যাভেঞ্জার-ক্লাস জাহাজগুলো অবসরে যাচ্ছে। এর বদলে লিটোরাল কমব্যাট শিপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আসলে বেশ ধীরগতির প্রক্রিয়া।
যেভাবে কাজ করে এই মাইন
ইরানের কাছে এমন কিছু আধুনিক মাইন আছে, যা জাহাজের প্রপেলারের শব্দ বা তার চৌম্বকীয় ক্ষেত্র টের পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হয়। সমুদ্রের একদম তলদেশে পড়ে থাকা এই ‘বটম’ মাইনগুলোই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এগুলো জাহাজকে স্পর্শ না করেই ধ্বংস করে দিতে পারে। বিস্ফোরণের সাথে সাথে সমুদ্রের নিচে বিশাল এক গ্যাসের বুদবুদ তৈরি হয়, যা প্রচণ্ড শক্তিতে ওপরের দিকে ধাবিত হয়। এই বুদবুদের কারণে জাহাজের নিচের পানির ভারসাম্য বা ‘সাপোর্ট’ হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। ফলে মুহূর্তের মধ্যে জাহাজের তলা ফুটো হয়ে যায় অথবা মাঝখান থেকে মেরুদণ্ড ভেঙে আস্ত জাহাজটি দু’টুকরো হয়ে তলিয়ে যায়।
অ্যাজেন্সি ও যুদ্ধের শঙ্কা
বিভিন্ন গোয়েন্দা অ্যাজেন্সি জানাচ্ছে, ১৯৪৫ সালের পর থেকে মার্কিন যত যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবেছে, তার ৮০ শতাংশেরই কারণ মাইন। অথচ নৌ-বাজেটের মাত্র এক শতাংশ খরচ করা হয় এর পেছনে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) ক্যাটলিন তালমাজ মনে করেন, মাঝসমুদ্রে যুদ্ধ চলাকালীন মাইন পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব।
থিংক-ট্যাংক র্যান্ডের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার স্কট স্যাভিটজ এক কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে, ‘সাগরে যদি একটি মাইনও না থাকে, কিন্তু জাহাজ মালিকরা যদি মনে করে সেখানে মাইন পাতা হয়েছে, বিপদ আছে, তা হলে সেই ফাঁকা সমুদ্রই একটা কার্যকর মাইনফিল্ডে পরিণত হয়।’
হরমুজ প্রণালির এই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো বিশেষ বাহিনী পাঠাতে হবে ইরানের উপকূলে। কিন্তু তাতে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। আপাতত সমুদ্রের শান্ত পানির নিচে তেহরানের পেতে রাখা সেই ‘টাইম বোমার’ দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।


