গুচ্ছ বোমা আর মাল্টিপল ওয়ারহেড—পার্থক্য কোথায়?

ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে যেগুলো একসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু অনেকেই এটাকে গুচ্ছা বোমা বা ক্লাস্টার বোমার সাথে গুলিয়ে ফেলছেন। আসলে দুটো একেবারেই আলাদা জিনিস বলে উল্লেখ করেছে তাসনিম নিউজ।

সৈয়দ মূসা রেজা

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি নিয়ে, বিশেষ করে “মাল্টিপল ওয়ারহেড” বা বহুমুখী বোমার প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে যেগুলো একসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু অনেকেই এটাকে গুচ্ছা বোমা বা ক্লাস্টার বোমার সাথে গুলিয়ে ফেলছেন। আসলে দুটো একেবারেই আলাদা জিনিস বলে উল্লেখ করেছে তাসনিম নিউজ।

গুচ্ছা বোমা বা ক্লাস্টার বোমাকে ভাবতে পারেন একটা বড় পটকার মতো। এটি আকাশে গিয়ে ফেটে অসংখ্য ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়। সেই ছোট বোমাগুলো নিচে পড়ে বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটায়। মানে এটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আাঘাত করে না। বরং একটা বড় এলাকা ছড়িয়ে পড় আঘাত হানে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য, যানবাহন বা খোলা এলাকায় থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এর বড় সমস্যা হলো—এগুলো অনেক সময় বিস্ফোরিত না হয়ে এমন বোমা দিনের পর দিন পড়ে থাকে, পরে সাধারণ মানুষের জানমালের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

অন্যদিকে মাল্টিপল ওয়ারহেড বা বহুমুখী একেবারে আলাদা কৌশল। এটাকে ভাবতে পারেন একটা ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরে আলাদা আলাদা ভাবে কয়েকটা “স্মার্ট” বা চৌকস বোমা রাখা আছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেলে এই বোমাগুলো বিছিন্ন হয়ে যায়, এবং প্রতিটা নিজের নিজের পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতেসরাসরিআঘাত করে। ধরুন, একটা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে তিনটা ওয়ারহেড বের হলো—একটা গেল রাডার স্টেশনে, একটা গেল সামরিক ঘাঁটিতে, আরেকটা গেল জ্বালানি ডিপোতে। অর্থাৎ এক ক্ষেপণাস্ত্র, কিন্তু আঘাত তিন জায়গায়—এবং প্রতিটাই পূর্বে ঠিক করে দেয়া সুনির্দিষ্টভাবে।

এখানেই মূল পার্থক্য। গুচ্ছ বোমা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আঘাত করে। অন্যদিকে মাল্টিপল ওয়ারহেড পৃথক পৃথক লক্ষ্যে সুনির্ধারিত এবং নির্ভুল ভাবে আঘাত হানে। একটায় ছড়ানো-ছিটানো ধ্বংস ঘটে, আরেকটায় পরিকল্পিত ভাবে আঘাত হানা হয়।

তাসনিমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের কিছু কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে, বিশেষ করে তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে এই মাল্টিপল ওয়ারহেড প্রযুক্তি রয়েছে। কিছু কিছু মডেলে প্রতিটি ওয়ারহেড আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ফলে একইসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতোসক্ষম হয়ে ওঠে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।

ইরান কোথায় কোনটা ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করে লক্ষ্যবস্তুর ওপর। যদি বড় এলাকা বা ছড়িয়ে থাকা টার্গেট থাকে, তখন গুচ্ছা বোমা কার্যকর হতে পারে। আর যদি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে হয়, তখন মাল্টিপল ওয়ারহেড বেশি কাজে লাগে।

সব মিলিয়ে, এই প্রযুক্তি প্রমাণ করছে—ইরান শুধু ক্ষেপণাস্ত্রই বানাচ্ছে না, বরং সেগুলোকে আরও বুদ্ধিমান এবং চৌকস ও কৌশলগতভাবে কার্যকর করে তুলছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা আর চাপের মধ্যেও তারা ধাপে ধাপে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি গড়ে তুলেছে। এখন সেই শক্তি শুধু দূরত্বে নয়, আঘাতের ধরনেও বৈচিত্র্য আনছে। দুশমনের জন্য দুঃস্বপ্নের বার্তা বাহক হয়ে উঠতে শুরু করছে।

সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি