মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। এতটুকু সময়েই দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধের মানচিত্র পাল্টে গেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই লেবানিজ ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স তাদের বাহিনী সরাসরি সামনের সারিতে নামিয়ে দেয়। ইসরাইলি দখলদার বাহিনী ভেবেছিল আগের যুদ্ধে জায়নিস্টদের হাতে বড় ক্ষতির পর হিজবুল্লাহ হয়তো ভেঙে পড়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি আরো জানিয়েছে, কিন্তু বাস্তবটা ছিল অন্যরকম। তারা দেখিয়ে দিল, শক্তি এখনো ফুরায়নি। তারা এখনো দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়নিস্ট অবস্থানে আঘাত হানতে পারে। ট্যাঙ্ক উড়িয়ে দিতে পারে। সামরিক সরঞ্জাম গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
এদিকে, ইরান ও হিজবুল্লাহর হামলায় নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির খবর নিয়ে দখলদার ইসরাইলি শাসন কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। লেবাননে তারা বিমান হামলা বাড়িয়েছে। গ্রাম, বেসামরিক ভবন, আবাসিক এলাকা কিছুই বাদ যাচ্ছে না। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সামনের দিনগুলোতে লড়াই আরো তীব্র হবে।
জায়নিস্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের নর্দান ফ্রন্ট কমান্ডকে লেবাননের ভেতরে স্বাধীনভাবে যথেচ্ছ অভিযান চালানোর পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে। জেনারেল স্টাফের সাথে আলাদা করে পরামর্শের প্রয়োজন নেই। মানে ময়দানে আরো দ্রুত সিদ্ধান্ত, আরো বিস্তৃত অপারেশন।
কিন্তু অন্যদিকে এক অদৃশ্য দেয়াল তোলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের স্থান বা ছবি প্রকাশ করা যাবে না। ইরান বা হিজবুল্লাহ সংবেদনশীল সামরিক বা নিরাপত্তা স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করেছে কিনা, সে নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ। সাংবাদিকরা হাসপাতাল ঘুরে সঠিক পরিসংখ্যান জোগাড় করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন। জায়নিস্ট গণমাধ্যমের সেন্সর করা তথ্য বলছে, ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক হাজারের বেশি ইসরাইলিকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। অনেকে এখনো হাসপাতালে ভর্তি।
সেন্সরশিপের পরিধি এতটাই বেড়েছে যে উত্তরের দখলকৃত ফিলিস্তিনের বহু বসতি থেকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেয়ার খবরও চেপে যাওয়া হচ্ছে। মানুষ চুপচাপ মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে সরে যাচ্ছে।
এদিকে হিব্রু সূত্র জানাচ্ছে, উত্তরের সীমান্তে হিজবুল্লাহর অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপে ইসরাইলি মন্ত্রিসভা ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সমালোচনা বেড়েছে। চ্যানেল থার্টিন টিভি এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, আমরা হিজবুল্লাহর অবস্থান ভুল বুঝেছিলাম। তারা লক্ষ্যভেদ এত দূরে বাড়াবে, গভীর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে, তা ভাবিনি।
গত বুধবার রেজিস্ট্যান্স অপারেশন ইসরাইলি শক্তির সব স্তম্ভে আঘাত হানে। অস্ত্রভাণ্ডারের বৈচিত্র্য দেখে দখলদার বাহিনীর হিসাব কেঁপে ওঠে।
প্রথমত, দখলকৃত ফিলিস্তিনের গভীরে অভিযান। লেবানন সীমান্ত থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে তেল হাশোমের ঘাঁটিতে দু’দফা আঘাত। উন্নত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। দখলকৃত ফিলিস্তিনের কেন্দ্রে ইসরাইলি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির স্থাপনাও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়। যে এলাকাগুলোকে দখলদাররা নিরাপদ ভেবেছিল, সেগুলোই হঠাৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, আকাশ প্রতিরক্ষা অচল করার চেষ্টা। রামাত দাভিদ ঘাঁটি, আইন শেমার ও হাইফার কিরিয়াত এলিয়েজার রাডার লক্ষ্যবস্তু হয়। উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলকে অন্ধ করে দেয়া। যাতে ভারী ক্ষেপণাস্ত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদে পৌঁছাতে পারে।
তৃতীয়ত, সীমান্তরেখায় ক্ষয়যুদ্ধ। আল খিয়াম এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক অ্যামবুশ, ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা ঘরে তৈরি বোমা এবং সরাসরি সংঘর্ষ। হুলায় মেরকাভা ট্যাঙ্ক ও একটি সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়। আল মুতালা ও কিরিয়াত শমোনা শহরে জায়নিস্ট সেনাদের জড়ো হওয়ার স্থানে রকেট হামলা চালানো হয়। হতাহত সরাতে দখলদাররা হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
দু’দিন আগে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে বাফার জোন তৈরির লক্ষ্য নিয়ে স্থল অনুপ্রবেশ শুরু করেছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহর পাল্টা আঘাতে তাদের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়।
প্রথম চার দিনের বিশ্লেষণ বলছে, ইসরাইল ভেবেছিল নতুন এলাকা দখল আর পূর্ণ স্বাধীনতায় অভিযান চালালে হিজবুল্লাহ পিছু হটবে। কিন্তু হিব্রু গণমাধ্যমই স্বীকার করেছে, হিজবুল্লাহর অপারেশনের মাত্রা আর তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গভীরতা দেখে সেনাবাহিনী বিস্মিত। সীমান্তে অ্যামবুশে পড়েছে ইসরাইলি ইউনিটগুলো।
লেবানন ফ্রন্ট পুরোপুরি দমন করার যে বাজি ধরেছিল ইসরাইল, তা ভেস্তে গেছে। হঠাৎ করে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা বাড়ানো হামলা আসলে পাল্টা আঘাত। ইসরাইল যে নিয়ম চাপিয়ে দিতে চাইছিল, যুদ্ধের সেই আইন ভেঙে দেয়ার চেষ্টা।
ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের কিছু অংশে অবস্থান করছে। আকাশপথে তাদের চলাচলও অবাধ। তবু হিজবুল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছে, দখলকৃত এলাকাকেও ফাঁদে পরিণত করা যায়। খিয়াম আর হুলার মতো জায়গায় যা হয়েছে, তা তার উদাহরণ। সীমান্তে শত্রু ঘাঁটি পাশ কাটিয়ে সরাসরি ইসরাইলের শিল্প ও সামরিক কেন্দ্রের হৃদপিণ্ডে আঘাত হানা যায়।
যে বাফার জোনের কথা জায়নিস্টরা বলছিল, তা দখলদার শাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। সীমান্তে আগুন জ্বলছে। আকাশে এখনো ড্রোনের গুঞ্জন। আর অন্ধ রাডারের নিচে যুদ্ধের হিসাব আবারো নতুন করে লিখে যাচ্ছে লেবাননের মাটি।



