যুদ্ধের দাবানলে ইরানের তেলের বাজারে বসন্ত : আয় বাড়ল ১০০ শতাংশ

যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে ইরানের দৈনিক আয় ১৪ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ যুদ্ধের আগে এই অংকটা ছিল মাত্র ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের আশেপাশে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কাজ করছে দুটো বাস্তবতা। একদিকে রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৫০ শতাংশ, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।

সৈয়দ মূসা রেজা

চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানের দৈনিক তেল আয় এক লাফে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন যুদ্ধের ঘনঘটা, তখন ইরানের অর্থনীতির বদ্ধ দুয়ারে যেন খুলে গেছে এক নতুন দিগন্ত। আমেরিকা ও ইসরাইল-এর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের এক মাস না পেরোতেই দেশটির তেল বিক্রির চিত্রে এসেছে এক অবিশ্বাস্য মোড়। যেখানে কামানের গর্জন আর বারুদের গন্ধে বাজার থমকে যাওয়ার কথা, সেখানে ইরানের দৈনিক তেল আয় এক লাফে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ইরানের সংবাদ মাধ্যম তসনিম নিউজ এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই নাটকীয় পরিবর্তনের খুঁটিনাটি।

তেলের বাজারে তেহরানের কৌশলী চাল

তসনিম নিউজের অর্থনৈতিক প্রতিবেদকের তথ্যমতে, যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে ইরানের দৈনিক আয় ১৪ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ যুদ্ধের আগে এই অংকটা ছিল মাত্র ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের আশেপাশে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কাজ করছে দুটো বাস্তবতা। একদিকে রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৫০ শতাংশ, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।

রমজানের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত, যার প্রতি ব্যারেলের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৬০ ডলার। কিন্তু যুদ্ধের এই ডামাডোলে ইরান তাদের কৌশলগত অবস্থান এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ব্যারেলে। শুধু পরিমাণই বাড়েনি, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এখন ১০০ থেকে ১১০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

ফার্সি চলতি ১৪০৫ সালের বাজেট ঘাটতি পূরণের স্বপ্ন

ইরানের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা হলো বাজেটে নির্ধারিত তেলের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রক্ষণশীল পরিকল্পনা: ইরান সরকার তাদের ১৪০৫ সালের বাজেটে বেশ সাবধানী ছিল। ১৪০৪ সালের বাজেটে তেলের আয় ধরা হয়েছিল ৬০৪ ট্রিলিয়ন তোমান, যা বাস্তবে অর্জিত হয়নি। তাই ফার্সি চলতি ১৪০৫ সালের খসড়া বাজেটে সরকার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ২৬০ ট্রিলিয়ন তোমানে নামিয়ে এনেছিল।

বাস্তবতা বনাম পূর্বাভাস: বাজেটে যেখানে তেলের দাম ধরা হয়েছিল মাত্র ৫৪ ডলার, সেখানে ইরান এখন বিক্রি করছে এর প্রায় দ্বিগুণ দামে। যদি এই ধারা বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে শুধু তেল রপ্তানি থেকেই সরকারের আয় ৫০০ মিলিয়ন 'হেমাত' পৌঁছাতে পারে। উল্লেখ্য যে, ইরানি অর্থনৈতিক পরিভাষায় 'হেমাত' শব্দটি একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা মূলত 'হাজার বিলিয়ন তোমান' বোঝাতে ব্যবহৃত হয়; অর্থাৎ ৫০০ হেমাত মানে ৫০০ হাজার কোটি তোমান।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব স্থিতিশীলতা

বিগত এক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এই আয়ের ধারা কেবল সাময়িক কোনো উল্লম্ফন নয়, বরং এটি স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ এবং দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির হিস্যা বাদেও এই বাড়তি অর্থ সরাসরি জাতীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে।

ইরানের অর্থনৈতিক ইতিহাসে তেলের আয়ের এই উল্লম্ফন এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ১১ লাখ ব্যারেল থেকে ১৫ লাখ ব্যারেলে উত্তরণ এবং ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলার থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছানো দেশটির কৌশলগত সক্ষমতারই পরিচয় দেয়। তবে এই ধারা কতদিন বজায় থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

আকাশে যুদ্ধের মেঘ এখনো কাটেনি, কিন্তু সেই মেঘের আড়ালে ইরানের তেলের বাজার যেন রূপ নিয়েছে এক রূপকথার গল্পে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

সূত্র : তাসনিম নিউজ