বিশ্বের সবাই না হলেও বেশিভাগ মানুষই চাইছে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ হোক। এই যুদ্ধ ঘিরে একেকটি দেশের একেকরকম অবস্থান রয়েছে। ফলে যুদ্ধের কিভাবে অবসান হবে, তা নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো কিছুটা অস্পষ্ট। কখনো তাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল সীমিত করার পক্ষে, কখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সব দাবি মেনে নেয়ার চাপে, আবার কখনো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটানোর অবস্থানে দোদুল্যমান দেখা গেছে।
এখন পর্যন্ত ইরানের পতন ঘটেনি, দেশটি আত্মসমর্পণও করেনি। তবে ১৬ দিনের টানা নিখুঁত বোমা হামলায় দেশটির সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল, তাতে পারমাণবিক বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছিল।
ওমানি কর্মকর্তাদের মতে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না- এমন নিশ্চয়তা দিয়ে ইরান বড় ধরনের ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল।
তবে ইরান যা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি ছিল না, তা হলো তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং ইয়েমেনের হাইছি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে দেয়া সমর্থন বন্ধ করা।
ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্রদের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হতো যদি এই যুদ্ধের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহদের শাসনের অবসান ঘটে এবং দ্রুত সেখানে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার আসে।
কিন্তু সোমবার পর্যন্ত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
তবে ইরান যখন তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে বেছে নিয়েছে, তখন সেটি হওয়ার সম্ভাবনা কমই মনে হচ্ছে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতাবাকে বেছে নেয়া ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করারই নামান্তর।
বিশ্ববাজারে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম, হরমুজ প্রণালি আংশিক রুদ্ধ হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের আবারো মধ্যপ্রাচ্যের এক ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা অস্বস্তি-সব মিলিয়ে যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
কিন্তু তেহরানের শাসনব্যবস্থা যদি দমে না যায়, তবে ট্রাম্পের পক্ষে এই যুদ্ধকে ব্যর্থতা ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে তুলে ধরা কঠিন হবে।
ইরান
ইরান চায় যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব থামুক, তবে যেকোনো মূল্যে নয়। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের সব দাবি মেনে নিয়ে নয়। তারা জানে এই যুদ্ধে ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকার মতো ‘কৌশলগত ধৈর্য’ তাদের আছে; তার ওপর ভৌগোলিক অবস্থানও তাদের অনুকূলে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইরানের উপকূলরেখা দীর্ঘতম। সরু হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়, যেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
ইসরাইলের সাথে মিলে যে যুদ্ধ ট্রাম্প শুরু করেছেন, তার পরিণতি সামাল দিতে তিনি অন্যান্য দেশের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে খুব একটা সাড়া মিলছে না।
যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশগুলো তাদের নৌবাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিতে নারাজ, কারণ শুরু থেকেই তারা এই যুদ্ধের পক্ষে ছিল না।
আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান বলছে, যুদ্ধ শেষ হতে হবে এই অকাট্য গ্যারান্টির মাধ্যমে যে তাদের ওপর আর হামলা হবে না।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বিমান হামলায় যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণও তারা চায়।
ইরান সম্ভবত জানে যে এর কোনোটিই তারা পাবে না।
কিন্তু ইরানের ইসলামী নেতৃত্ব এবং রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) যদি কেবল এই সংঘাতে টিকে থাকতে পারে, তবেই তারা নিজেদের জনগণ ও বিশ্বের কাছে বিজয় হিসেবে আলোচনায় থাকবে।
ইসরাইল
যুদ্ধে জড়িত তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ইসরাইলিদের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করার তাড়া সবচেয়ে কম মনে হচ্ছে।
তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের মজুদ, গুদাম, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রাডার স্টেশন এবং আইআরজিসি ঘাঁটিগুলো যতটা সম্ভব ধ্বংস হতে দেখতে চায়। অবশ্য যুদ্ধ থামলে এসবই আবার পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব।
তাই ইসরাইল চায় ইরান এটা বুঝুক যে পুনর্নির্মাণের চড়া মূল্য দিতে হবে- অর্থাৎ ইসরাইলি বিমানবাহিনী কয়েক মাস পর আবারো ফিরে এসে সেগুলোতে বোমা ফেলতে সক্ষম।
ইসরাইল ইরানের মিসাইল এবং বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত ইরানের অত্যন্ত উন্নত নিজস্ব মিসাইল ও ড্রোন শিল্প ছিল (ইরান তাদের মিত্র রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছিল যা ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে)।
এছাড়া ইরান ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই দ্বিমুখী হুমকিকে এমন কিছু হিসেবে দেখছে যার সাথে ইসরায়েল আপস করতে চায় না।
সূত্র : বিবিসি



