ইরান যুদ্ধে জড়ালো হাউছিরা, ঝুঁকিতে বিশ্ববাণিজ্যের আরেক নৌ-রুট

শনিবার (২৮ মার্চ) ইসরাইয়েলি সামরিক বাহিনী একটি হামলা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়ার পরপরই হুথিদের পক্ষ থেকে এই দাবি জানানো হয়। এর আগের দিনই গোষ্ঠীটি সতর্ক করেছিল, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তারা হস্তক্ষেপ করবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইয়েমেনের হাউছি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি
ইয়েমেনের হাউছি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি |সংগৃহীত

এক মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীরা । শনিবার (২৮ মার্চ) ইসরাইয়েলি সামরিক বাহিনী একটি হামলা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়ার পরপরই হুথিদের পক্ষ থেকে এই দাবি জানানো হয়। এর আগের দিনই গোষ্ঠীটি সতর্ক করেছিল, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তারা হস্তক্ষেপ করবে।

ইসরাইল জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান, লেবাননের পর যুদ্ধের নতুন আরেকটি ফ্রন্ট যুক্ত হলো ইসরাইলের জন্য।

হাউছি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক ভিডিও বার্তায় জানান, তারা ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বেশ কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন। উল্লেখ্য, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা বর্তমানে হাউছিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইয়েমেনের দিক থেকে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করতে কাজ করছে। তবে এই ঘটনায় ইসরাইলে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হাউছিরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালেও, বর্তমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত তারা এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত ছিল। তবে গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি সতর্ক করে বলেছে, ‘‘আমাদের আঙুল ট্রিগারেই আছে।’’ তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যদি অন্য কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয় অথবা লোহিত সাগরকে কোনো প্রতিকূল সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা হয়, তবে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে।

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, এসব হামলা ছিল বিক্ষিপ্ত এবং অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝপথে আটকে দেয়া হয়েছিল। তবে কয়েক মাস পরই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একটি হাউছি ড্রোন তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

ইসরাইলের ওপর ইয়েমেনের হাউছিদের আবার হামলা শুরু হওয়া দেশটির জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে; যদিও এটি বড় কোনো সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরির আশঙ্কা কম। তবে হাউছিরা যদি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে নতুনভাবে হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এর প্রভাব হবে নাটকীয়।

বর্তমানে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালী এড়াতে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে। এশিয়ার বাজারের উদ্দেশে পাঠানো এ তেলের জাহাজগুলো ইয়েমেনের পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫-এর শুরু পর্যন্ত হাউছিরা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত একটি জাহাজ ছিনতাই করা হয়েছে। ফলে বাব আল-মানদাব প্রণালী ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

ইরান যদি কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং একই সঙ্গে হাউছিরা লোহিত সাগরের পথটিও বন্ধ করে দেয়, তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের এ যুগপৎ বন্ধ হওয়া বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।

উল্লেখ্য, হাউছিরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। তারা ইয়েমেনের শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু জায়েদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উৎখাতের পর থেকে তারা ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।