মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী রণতরীগুলোর একটি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডে গত সপ্তাহে যে আগুন লাগে, তা নেভাতে নাবিকদের লেগে যায় ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময়। আগুন নেভার পর দেখা গেল জাহাজের ভেতরে অন্তত ৬০০ নাবিক তাদের বিছানা হারিয়েছেন। এখন তারা টেবিল আর মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন। ধোঁয়ার কারণে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়েছে। দুজন নাবিককে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। অথচ বাইরে থেকে এই বিশাল যুদ্ধযন্ত্রটিকে এখনো বলা হচ্ছে পুরোপুরি কার্যকর।
ঘটনাটি সামনে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে। ওয়াশিংটন থেকে প্রতিবেদনটি লিখেছেন পেন্টাগন-বিষয়ক অভিজ্ঞ সাংবাদিক হেলেন কুপার।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর, কূটনীতি এবং হোয়াইট হাউস কভার করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনের শুরুটা ছিল জাহাজের প্রধান লন্ড্রি কক্ষ থেকে। সেখানে একটি ড্রায়ারের ভেন্টে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভেতরের অংশে। এরপর শুরু হয় নাবিকদের লড়াই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
আগুনের পরের দৃশ্যটি ছিল অস্বস্তিকর। জাহাজের ভেতরের বহু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬০০-এর বেশি নাবিক তাদের শোয়ার জায়গা হারান। অনেককে এখন মেঝেতে বা টেবিলের ওপর ঘুমাতে হচ্ছে। লন্ড্রি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে কয়েক দিন ধরে পোশাক ধুতেও পারছেন না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে আগুনে জাহাজের প্রপালশন বা চালনা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়নি। জাহাজ এখনো পুরোপুরি কার্যকর। কিন্তু জাহাজে থাকা নাবিকদের অনেকেই জানিয়েছেন পরিস্থিতি এতটা সহজ নয়। ধোঁয়ার কারণে অনেক নাবিকের শ্বাসকষ্ট হয়েছে। কয়েক ডজন নাবিক ধোঁয়া শ্বাসের সমস্যায় পড়েছেন।
জাহাজের ভেতরের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বাইরে খুব কম তথ্য আসে। যুদ্ধ চলাকালে এসব জাহাজ প্রায়ই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। একে বলা হয় ‘ডার্ক মোড’। ফলে নাবিকদের বাইরে যোগাযোগ করার সুযোগ সীমিত থাকে। নিউইয়র্ক টাইমসকে যেসব কর্মকর্তা ও নাবিক তথ্য দিয়েছেন তারা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন প্রায় টানা ১০ মাস ধরে সমুদ্রে মোতায়েন রয়েছে। এটি শুরুতে ছিল ভূমধ্যসাগরে। গত বছরের ২৪ অক্টোবর সেখানে অবস্থান করার সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হঠাৎ নির্দেশ দেন জাহাজটিকে ক্যারিবীয় সাগরে যেতে। তখন ওয়াশিংটন ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে খুব দ্রুতই আবার দিক বদলায় ফোর্ড। মার্কিন ও ইসরিইলি বাহিনীর ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে অংশ নিতে তাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। এখন সেই যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে।
এই দীর্ঘ যাত্রা জাহাজ এবং নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। ফোর্ড এখন তার মোতায়েনের দশম মাসে ঢুকেছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি যদি জাহাজটি এখনো সমুদ্রে থাকে, তবে এটি ভেঙে ফেলবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের রেকর্ড।
বর্তমান রেকর্ডটি ছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের। ২০২০ সালে সেই জাহাজ টানা ২৯৪ দিন সমুদ্রে ছিল।
ফোর্ডের নাবিকদের এখন জানানো হয়েছে তাদের মোতায়েন সম্ভবত মে মাস পর্যন্ত বাড়তে পারে। যদি তা হয়, তবে তারা প্রায় এক বছর সমুদ্রে কাটাবে। যা একটি স্বাভাবিক বিমানবাহী রণতরীর মোতায়েন সময়ের প্রায় দ্বিগুণ।
নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত দীর্ঘ সময় জাহাজ চালিয়ে রাখা খুব কঠিন। শুধু মানুষ নয় জাহাজও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল জন এফ কিরবি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, জাহাজও ক্লান্ত হয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলে জাহাজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। এত দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চালিয়ে গেলে আশা করা যায় না যে সেটি এবং তার ক্রুরা সব সময় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করতে পারবে।
ফোর্ডে এখন দিনরাত উড়োজাহাজ ওঠানামা করছে।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, জাহাজটি ২৪ ঘণ্টা বিমান অভিযান চালাচ্ছে।
এই আগুনের ঘটনা ফোর্ডের জন্য নতুন কোনো সমস্যার শুরু নয়। জাহাজটি আগে থেকেই একের পর এক প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে এর টয়লেট ব্যবস্থা নিয়ে বহুবার সমালোচনা হয়েছে। জাহাজটিতে প্রায় ৬৫০টি টয়লেট রয়েছে। কিন্তু এই পুরো প্লাম্বিং ব্যবস্থা শুরু থেকেই সমস্যায় ভুগছে।
মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর আগেই জানিয়েছিল টয়লেটগুলোর পাইপলাইন ছোট এবং নকশা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় সেগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। ফলে পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায় এবং তা মেরামত করতে সময় লাগে।
এই সমস্যাগুলো এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে জাহাজের ভেতরে প্রায়ই টয়লেট ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ত। এনপিআর জানিয়েছে নকশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় পুরো টয়লেট লাইন বন্ধ হয়ে যেত।
ফোর্ডের আরেকটি বড় মেরামত কাজ হওয়ার কথা ছিল এ বছরের শুরুতে। ভার্জিনিয়ার নিউপোর্ট নিউজ নৌঘাঁটিতে বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠন কাজের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।
পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা জানেন ফোর্ড এখন তার সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তাই আরেকটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ নামের আরেকটি রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে সেটিই গিয়ে ফোর্ডকে দায়িত্ব থেকে মুক্ত করবে।
কিন্তু ততদিন পর্যন্ত সমুদ্রের মাঝখানে এই বিশাল যুদ্ধজাহাজকে চলতেই হবে। আগুনের ধোঁয়া, ভাঙা বিছানা, বন্ধ লন্ড্রি আর পুরনো টয়লেট সমস্যার মধ্যেই নাবিকদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।



