‘জন্ম থেকেই আমি কিউবার ব্যাপারে শুনে আসছি, এবার কোনো না কোনোভাবে আমরা কিউবা নিয়েই নেব’- মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) হোয়াইট হাউস থেকে এই বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইতোমধ্যেই কিউবায় জোরাল হয়েছে জ্বালানি সমস্যা। কিউবার একাধিক অঞ্চল বিদ্যুতের অভাবে ডুবে রয়েছে অন্ধকারে।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করার পরেই ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল আমদানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল জানিয়েছেন, গত তিন মাসে কোনো জ্বালানি কিউবায় প্রবেশ করেনি।
গত ৯ মার্চ ট্রাম্প জানান, কিউবা গভীর সঙ্কটে রয়েছে। একইসাথে তিনি কিউবার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ অধিগ্রহণের’ কথা বলেন। কিন্তু আট দিনের মাথায় সুর কঠিন করতে শোনা গেল তাকে।
হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিস থেকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে আমরা কিউবা নিয়ে নেব। আমরা কিউবাকে স্বাধীন করতে পারি, অধিগ্রহণ করতে পারি বা যা খুশি করতে পারি। আপনি সত্যিটা জানতে চান? ওরা এখন খুব দুর্বল রাষ্ট্র।’
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিউবার প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মনোভাব একা শুধু ব্যক্তি ট্রাম্পের নয়, এটা যুক্তরাষ্ট্রের একটা দীর্ঘদিনের ভাবনাচিন্তার প্রতিফলন।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার লড়াই মূলত অর্থনৈতিক ও আদর্শগত।
২০০ বছর ধরে দু’দেশের জটিল সম্পর্ক
কিউবার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, উর্বর জমি ও ছবির মতো সুন্দর সমুদ্রসৈকতের কারণে এই দেশটিকে ‘অ্যান্টিলিসের মুক্তা’ নাম দিয়েছিল স্প্যানিশরা। দীর্ঘ দিন এই দেশটি স্পেনের উপনিবেশ ছিল।
উনিশ শতকের শেষের দিকে কিউবা স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই লড়াইতে কিউবাকে সমর্থন করেছিল।
তার একটা বড় কারণ কিউবার উৎকৃষ্ট আখ ও তামাকের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর ছিল।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার স্পেনের থেকে কিউবাকে কিনে নেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল।
কিউবা যখন ১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রও সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। স্পেনের পরাজয়ের পরে ১৯০২ সাল পর্যন্ত কিউবাকে নিজের দখলে রাখে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯০২ সালে কিউবাকে নামেমাত্র স্বাধীনতা দেয়। টমাস এস্ট্রাডা প্রেসিডেন্ট হন।
চে গুয়েভারার গেরিলা বাহিনী
যুক্তরাষ্ট্র বিতর্কিত ‘প্ল্যাট সংশোধনী’র মাধ্যমে কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বজায় রাখে। এই আইনের জোরে যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় নিজেদের নৌঘাঁটিও স্থাপন করে।
অন্যদিকে কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি মোটেও শান্ত ছিল না। বার বার বিদ্রোহ ও সামরিক শাসনের অধীনে চলছিল কিউবা।
যদিও সব শাসকের সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিল। সেনাশাসক ফুলগেনসিও বাতিস্তাকেও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছিল তাদের বাণিজ্যিক শাসন সুরক্ষিত রাখতে।
তবে ধীরে ধীরে কিউবার ভেতরে বিদ্রোহের আগুন বাড়তে থাকে। যদিও ১৯৫৩ সালে ফিদেল কাস্ত্রো ও তার বিপ্লবী দল বাতিস্তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে অসমর্থ হন।
১৯৫৮ থেকে এই ছবিটা পাল্টে যায়। যুক্তরাষ্ট্র বাতিস্তাকে দেয়া যাবতীয় সামরিক সহায়তা সরিয়ে নেয়। অন্যদিকে চে গুয়েভারার সাহায্যে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কাস্ত্রো। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৯ সালেই তার ৯ হাজার গেরিলা বিপ্লবীর দল হাভানা দখল করে। বাতিস্তা পালিয়ে যান।
কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক অস্ত্র মজুত
ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার প্রেসিডেন্ট হয়েই কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় পরিণত করতে শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রও কিউবার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
কিউবার পলাতক নেতাদের ট্রেনিং দিতে শুরু করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এই নেতাদের নিয়ে ১৯৬১ সালে কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য ‘বে অফ পিগস’ নামে একটি অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বিফল হয়।
এই সময়েই কিউবার সরকারবিরোধী বহু মানুষ শাস্তির ভয়ে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হয়ে চলে যান।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলমান শীতল যুদ্ধের সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পরমাণু অস্ত্র মজুত করতে শুরু করে।
ফ্লোরিডা উপকূল থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে এই মিসাইলগুলো থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা করতে থাকে বিশ্ব। যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে আশ্বস্ত করে তুরস্ক থেকে তাদের পরমাণু মিসাইল সরিয়ে নেয়।
এর জেরে সোভিয়েতও কিউবা থেকে পরমাণু অস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা কিউবা আক্রমণ করবে না।
তবে এর পরেও কিউবার উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র চিরকালই কিউবাকে ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ বলে গণ্য করে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়।
বারাক ওবামা ও কিউবান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো দু’দেশে একাধিক দূতাবাস ফের খোলেন। পর্যটন ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত বহু নিষেধাজ্ঞাও সরিয়ে নেয়া হয়।
বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার অবশ্য কিউবার প্রতি নরম মনোভাব দেখাতে ইচ্ছুক নয়। তিনি বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছেন। শুধু তাই নয়, কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসবাদ’ চালানোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি।
ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি কিউবায় সরকার পরিবর্তন করে দিতে চান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলা ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ বলেই দেখেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনিজুয়েলা আক্রমণের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কিউবাকে ৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পাঠিয়েছেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল জানিয়েছেন, এই তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য দেশের পাওয়ার গ্রিডগুলি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেই একজন কিউবান শরণার্থীর সন্তান।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিউবা সরকারের আমূল পরিবর্তন দরকার। এর মাধ্যমেই কিউবার মানুষের জীবনের মান উন্নত হতে পারে।’
ফলে ট্রাম্পের জন্য কিউবা এখন একটা ‘আইডিওলজিক্যাল ব্যাটল’ বা ‘আদর্শগত যুদ্ধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিউবাকে কিনতে চেয়েও কিনতে না পারা, ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে সহায়তা সত্বেও কিউবার আদর্শগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী অবস্থান নেয়া- এই সব ইতিহাসের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার প্রতি বাড়তি আগ্রহ দেখায়।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে একটি ‘হারানো সুযোগ’ মনে করে।
কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একজনের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি রুবিওকে কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চাই।’
যার ফলে এটা পরিষ্কার, ট্রাম্প নিজের আদর্শগত ভিত্তিতেই কিউবার ভবিষ্যৎ কল্পনা করছেন।
সূত্র : বিবিসি



