যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আকাশ ছুঁয়েছে, পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এ দাম ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ফিলাডেলফিয়ার একটি পেট্রোল পাম্প
ফিলাডেলফিয়ার একটি পেট্রোল পাম্প |এপি/ইউএনবি

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ জ্বালানি তেলের শীর্ষ উৎপাদক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। দেশটির বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন আকাশ ছুঁই ছুঁই।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এ দাম ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।

যুক্তরাষ্ট্রের মোটর ক্লাব ‘এএএ’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ০২ ডলারে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এক ডলারেরও বেশি। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর চার বছর আগে মার্কিন চালকদের পাম্পে সর্বশেষ এই চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছিল।

এ দাম একটি জাতীয় গড় হিসাব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যে চালকদের বেশ কিছুদিন ধরেই ৪ ডলারেরও অনেক বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কর হারের ভিন্নতার কারণে অঙ্গরাজ্যভেদে এই দামের পার্থক্য দেখা যায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপক হারে ওঠানামা করছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব

জ্বালানি তেলের এই উচ্চমূল্য সাধারণ ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে থাকা পরিবারগুলোকে এখন তেলের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে অন্য খাতের বাজেটে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে ইউটিলিটি বিল থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অদূর ভবিষ্যতে মুদি পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে, কারণ এসব পণ্য বারবার পরিবহনের প্রয়োজন হয়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন।

পরিবহন ও বিতরণ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলে এই প্রভাব আরো স্পষ্ট। এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি গ্যালন ডিজেল যেখানে ৩ দশমিক ৭৬ ডলারে পাওয়া যেত, বর্তমানে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৪৫ ডলারে পৌঁছেছে। ইউনাইটেড পোস্টাল সার্ভিস (ইউপিএস) ইতোমধ্যেই তাদের কিছু সেবায় সাময়িকভাবে ৮ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এ দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে প্রণালীটি দিয়ে বর্তমানে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় বন্ধ। এছাড়া ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষই তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালানোয় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরো ঘনীভূত হয়েছে।

দাম কমাতে জরুরি মজুদ উন্মুক্ত

বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের সদস্য দেশগুলোর জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে রিজার্ভ তেলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।

এছাড়া ভেনেজুয়েলা এবং সাময়িকভাবে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেলের প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে শতবর্ষী পুরোনো আইন ‘জোনস অ্যাক্ট’র (যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রপথ ও জাহাজ চলাচল সম্পর্কিত আইন, যা জাহাজ চলাচল এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে) বাধ্যবাধকতা আগামী ৬০ দিনের জন্য শিথিল করা হচ্ছে।

তবে এই প্রচেষ্টাগুলো সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কতটা স্বস্তি বয়ে আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পরিশোধনাগারগুলো আগেভাগেই চড়া দামে অপরিশোধিত তেল কিনে রাখায় নতুন সরবরাহের সুফল পেতে সময় লাগবে। তাছাড়া বছরের এ সময়ে আমেরিকায় তেলের চাহিদা এমনিতেই বেশি থাকে। আবার উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে শোধনাগারগুলোকে গ্রীষ্মকালীন ব্যবহার উপযোগী জ্বালানি তৈরি করতে হয়, যা শীতকালীন জ্বালানির চেয়ে ব্যয়বহুল।

তেল রফতানিকারক দেশ হয়েও কেন এই সংকট?

যুক্তরাষ্ট্র নিজে তেল রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারের এই ধাক্কার বাইরে থাকতে পারছে না। এশিয়ার দেশগুলোর মতো সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও প্রভাবিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র মূলত ‘লাইট সুইট ক্রুড’ (হালকা সালফারযুক্ত তেল যা সহজে পরিশোধন করা যায়) উৎপাদন করে। কিন্তু দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলো ‘হেভি সোর ক্রুড’ (যে তেল পরিশোধন তুলনামূলক কঠিন) প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি। ফলে চাহিদার প্রয়োজনে দেশটিকে আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হয়।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সবসময়ই জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা নিয়ে আসে। ২০২২ সালের জুনে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর চার মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে তেলের গড় দাম রেকর্ড ৫ ডলার ছাড়িয়েছিল। মঙ্গলবার সেই রেকর্ড ছোঁয়ার পথে আবারো ৪ ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করল দেশটির জ্বালানি বাজার।

সূত্র : এপি/ইউএনবি