মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান ‘ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনার’ কথা বিবেচনা করছেন। তবে এসবের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে আরো তিনটি উভচর যুদ্ধজাহাজ ও প্রায় আড়াই হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ মার্চ) বিশ্বব্যাপী বিনোদন ও পর্যটন স্পটগুলোতে হামলার হুমকি দেয় ইরান। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের এ মন্তব্য আসে। একইসাথে ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজে তোলা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে। যা জ্বালানি তেলের দামের লাগাম টেনে ধরার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে যখন ধস নেমেছে, ঠিক সেই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এ দ্বিমুখী বার্তা এলো।
গত তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইসরাইল জানিয়েছে, শনিবার (২১ মার্চ) ভোরেও ইরান তাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব বলেছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এর একদিন আগে পারস্য নববর্ষ নওরোজ উদযাপন চলাকালে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থান সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে বিদ্রোহ উসকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, আবার কখনো তেহরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্দেশ্য সাধনের কোনো লক্ষণ প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। সেইসাথে ইরান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে, তাতে যুদ্ধের অবসান কবে হবে সে বিষয়টিও অনিশ্চিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সামরিক কার্যক্রম গুটিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’
তবে তার এই বক্তব্য বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং যুদ্ধে ব্যয়ের জন্য কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার চাওয়ার মতো পদক্ষেপের সাথে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরো তিনটি উভচর যুদ্ধজাহাজ ও প্রায় দু’ হাজার ৫০০ নৌসেনা মোতায়েন করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো দুই মার্কিন কর্মকর্তা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে সেগুলো রওনা হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তারা।
এর আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আড়াই হাজার নৌসেনার একটি বহর সরিয়ে আনা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো ওই নৌসেনারা বর্তমানে ওই অঞ্চলে অবস্থান করা ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার সাথে যুক্ত হবে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই, তবে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হামলার হুমকি ইরানের
ইরানের শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র জেনারেল আবোলফজল শেখারচি শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের ‘পার্ক, বিনোদন এলাকা ও পর্যটনস্থল’গুলোও শত্রুদের জন্য নিরাপদ থাকবে না।
তার ওই মন্তব্যের পর তেহরান চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও সশস্ত্র হামলার পথ বেছে নিতে পারে, সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নওরোজ উপলক্ষে দেয়া এক লিখিত বার্তায় যুদ্ধের মুখে দেশটির জনগণের দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। যদিও ইসরাইলি হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত এবং তিনি নিজে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি।
ইরান থেকে খুব কম তথ্য বাইরে আসায় দেশটির সামরিক, পারমাণবিক বা জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট নয়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পরও ইরানের পাল্টা হামলা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে। এতে করে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে হুঁ হুঁ করে।
হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলের হামলা অব্যাহত
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার ভোরে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে নতুন করে তারা হামলা শুরু করেছে। বৈরুত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধোঁয়া, আগুন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ওই অঞ্চলের সাতটি এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার সতর্কতা জারি করে ইসরাইলি বাহিনী।
লেবানন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরাইলের হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ এরই মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
চলমান যুদ্ধে ইরানে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৫ জন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরো চারজন নিহত হয়েছেন। সেইসাথে তেহরানের হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা।
ইরানি তেলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধের কারণে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৭০ ডলারের মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় শুক্রবার পর্যন্ত জাহাজে তোলা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে, যা ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত উৎপাদন বাড়তে সহায়ক হবে না। ফলে দামের ঊর্ধ্বগতি কতোটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা অনিশ্চিত।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রফতানি করে আসছে, ফলে তাদের অধিকাংশ তেল আগেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যায় বলে ধারণা করা হয়।
ইরান যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে রাশিয়ার কিছু তেল চালানের ওপরও ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল। সমালোচকদের মতে, এতে মস্কো লাভবান হলেও বাজারে এর প্রভাব ছিল সীমিত।
সূত্র : ইউএনবি



