দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হতে যাচ্ছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে নতুন আলোচনায় সংশোধিত ও কম খরচের প্রস্তাব জমা দেয়ার পর টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আজ বুধবার জানান, কনসোর্টিয়াম সার্ভিস চার্জ, অপারেশনাল কন্ট্রোল এবং রাজস্ব ভাগাভাগি সংক্রান্ত বিষয়ে আর্থিক প্রস্তাব পুনঃসমন্বয়ের মাধ্যমে ঢাকার উদ্বেগ দূর করেছে। এসব বিষয় পূর্ববর্তী আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
গত সোমবার ও মঙ্গলবার বেবিচক সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক কারিগরি বৈঠকের পর চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। বৈঠকে উভয়পক্ষ মূল্য নির্ধারণ ও পরিচালন উপাদান নিয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে। এ বৈঠক নীতিগত আলোচনার পর্যায় থেকে চূড়ান্ত আলোচনার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো: মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক আজ সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে কারিগরি বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করেন।
তিনি জানান, দ্বিতীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আগামী ৩ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠকে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ অন্যান্যরা।
বেবিচক চেয়ারম্যান ইঙ্গিত দেন, এ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। আশা করা হচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যেই একটি চুক্তি সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, ৩ এপ্রিলের বৈঠকের পর আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে আশা করা হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ ৯৯ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হলেও ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অনেক দিন ধরে এটি অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা এই বিলম্বের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তারা এটিকে নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা ও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর অবস্থানের ফল বলে মনে করেন। ফলে একটি বড় জাতীয় সম্পদ অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে আলোচনা পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেন। এতে বাস্তবসম্মত ও ফলাফলমুখী সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
এই নির্দেশনার ফলে ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অগ্রগতি আসে। বৈঠকটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানি পক্ষকে সংশোধিত প্রস্তাব দেয়ার অনুরোধ জানায়।
জাপানি কনসোর্টিয়াম- জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিত্জ কর্পোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন- ইতোমধ্যে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এতে মূল্য কমানো হয়েছে এবং এর ফলে উল্লেখযোগ্য হারে পার্থক্য কমেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন প্রস্তাবে অধিক নমনীয়তা প্রতিফলিত হয়েছে এবং একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
টার্মিনাল প্রকল্পটিতে মূলত জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন অ্যাজেন্সি (জাইকা) অর্থায়ন করেছে এবং এটি আনুমানিক ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে।
প্রায় পাঁচ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ টার্মিনালটি প্রতি বছর অতিরিক্ত এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় নয় লাখ টন কার্গো সামলানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
টার্মিনালটি চালু করতে বিলম্ব হওয়ার কারণে দৃশ্যমান প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এয়ারলাইনগুলোর জট, স্লট সঙ্কট এবং পরিচালন অদক্ষতার মুখোমুখি হচ্ছে। আর যাত্রীরা টার্মিনালে ভিড়ের মধ্যে ভোগান্তি ও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
সংশোধিত মূল্য এখন আলোচনায় এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রক্রিয়াটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো: মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা শুধু ঢাকার বিমানবন্দরের চাপ কমানোর জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, যদি ৩ এপ্রিলের বৈঠকে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ অবশেষে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান অবকাঠামো প্রকল্প চালু করতে পারবে। এতে অনেক বছরের বিলম্বের অবসান ঘটবে এবং দেশের বিমান চলাচল সম্প্রসারণের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
সূত্র : বাসস



