গত ১০ বছরে বিদেশ গেছেন ৭৫ লাখ ৮৯ হাজার ৪৩০ জন বাংলাদেশী, যার প্রায় ৫৪ শতাংশ অদক্ষ কর্মী। এ সময়ে রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে ১৮৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
আগামী ৫ বছরে ১ কোটি জনশক্তি বিদেশে প্রেরণসহ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মোট ২০টি কর্মসূচি রয়েছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) খুলনার কয়রা উপজেলার খান সাহেব কোমর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে অনুষ্ঠিত উপজেলার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন : প্রেক্ষিত সৌদি আরব ও জাপান’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব), বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মো: আশরাফ হোসেন।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মোট ২০টি কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি জনশক্তি বিদেশে প্রেরণ; প্রবাসী কার্ড তৈরি; প্রবাসী কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা; দক্ষ দেশী ও বিদেশী প্রশিক্ষক নিয়োগ; ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ই-লার্নিং সেন্টার নির্মাণ; দক্ষ কর্মীদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি; মাইগ্রেশন মার্কেট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ওভারসিজ ইমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট) প্রতিষ্ঠা; ওয়ানস্টপ প্রবাসী সাপোর্ট সেন্টার তৈরি, সেন্ট্রাল ডিজিটাল মনিটরিং; কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ও ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিতকরণ; নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষায় স্কলারশিপ প্রদান উল্লেখযোগ্য।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) রয়েছে। টিটিসিগুলোতে ১৩০টি অকাপশনের জন্য ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং আইএমটিগুলোতে দুটি ডিপ্লোমা প্রদান করা হয়- ডিপ্লেমা ইন ম্যারিন টেকনোলজি ও ডিপ্লোমা ইন শিপবিল্ডিং। বর্তমানে ২৭টি দূতাবাসে ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইং রয়েছে।
গত ১০ বছরে বিদেশ গেছেন ৭৫ লাখ ৮৯ হাজার ৪৩০ জন, যার প্রায় ৫৪% অদক্ষ কর্মী। এ সময়ে রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে ১৮৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। আরবি ভাষী দেশে অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন ৭৭% পুরুষ ও ৯৮% নারী কর্মী। কিন্তু তাদের অধিকাংশই আরবি ভাষার সাথে পরিচিত নয়। আরবি ভাষা জ্ঞান থাকলে তারা উন্নতমানের চাকরি, বর্ধিত বেতন ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ পেত। এজন্য দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের যে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইটি আছে সেখানে ১০০ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ নম্বরের আরবি ভাষা শিক্ষার ওপর নম্বর বণ্টন করা যেতে পারে। এর বাড়তি কোনো শিক্ষকের প্রয়োজন হবে না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানব শিশু গড়ে পাঁচটি ভাষা শিখতে সক্ষম। তাহলে আমাদের শিশুরা অবশ্যই তিনটি ভাষা সহজেই রপ্ত করতে সক্ষম।
গত জুন মাস পর্যন্ত সৌদি আরবে কর্মী প্রেরণের জন্য আমরা মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার জনকে স্কিল ভেরিফিকেশন টেস্ট নিতে পারতাম। গত জুলাই থেকে এই সক্ষমতা ৬০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে।
মনে রাখতে হবে, ফ্রি ভিসা কোনো চাকরির নিশ্চয়তা বহন করে না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে এমপ্লেয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট অর্থাৎ কর্মসংস্থান চুক্তি ব্যতীত বিদেশে গমন করা ঠিক হবে না। কোনো দক্ষতা অর্জন ব্যতীত বিদেশে যাওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। যে দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সেই দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি ভালো করে শিখে যাওয়াই উত্তম। অহেতুক বাবা-মায়ের সম্পদ বা সম্পত্তি বিক্রি করে অনিশ্চিতভাবে বিদেশ গমন পরিহার করতে হবে। তা না হলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র আমাদের পিছু ছাড়বে না। আমরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং দক্ষ কর্মী প্রেরণের কৌশলের অংশবিশেষ বর্তমানে আরবি ২৬টি; ইংরেজি ৩২টি; জাপানিজ ৪৮টি; কোরিয়ান ২৯টি; জার্মান ২টি, ইটালিয়ান ২টি; চাইনিজ ক্যান্টনিজ ৩টি ও ১টিতে চাইনিজ ম্যান্ডারিন ভাষা চালু আছে, যা আগামীতে সম্প্রসারণ করা হবে এবং রাশিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, মালয়েশিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করার পাশাপাশি একটি ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ১২টি সিটি করপোরেশনের সিটি ডিজিটাল সেন্টার এবং ৩৩০টি পৌরসভার পৌর ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অনলাইনে টিটিসিতে ভর্তি, বিদেশ গমনের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করার একটি বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
দেশের ২২টি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ২৮টি দফতর বা সংস্থার প্রায় ৯০০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৯ লাখ প্রশিক্ষণার্থীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমটি) কর্তৃক ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯৯ জনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং ১১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৪০ জনকে প্রি-ডিপার্টচার ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। একই সময়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাঠানো হয়েছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার ১৭৬ জনকে এবং দেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ৯২ হাজার ৩৮৪ জনের।
বর্তমানে সোদি আরবের স্কিল্ড ভেরিফিকেইশন প্রোগ্রামের আওতায় দেশের ২৬টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৭৮টি অকাপশনে মাসে প্রায় ৬০ হাজার জনশক্তির স্কিল ভেরিফিকেশন টেস্ট গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে।
ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) কর্তৃক অনুমোদিত ১ হাজার ৭৬৯টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দক্ষ প্রশিক্ষণার্থীর তথ্য নিয়ে দক্ষ জনশক্তির ডাটা সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।
বিদেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের অংশবিশেষ মালয়েশিয়ার সিআইডিবি, ইটালির আইএলও ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম, জাপানের ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন ফর জাপান, হংকংয়ের ক্যান্টোনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স চালু রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খুলনার জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল বাকী, পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী, খান সাহেব কোমর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের সভাপতি ডা: খান আহমেদ হেলালী, কয়রা থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম, পাইকগাছা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হাবিবুর রহমান প্রমুখ।



