বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কটের মুখোমুখি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘রেজোলিউশন স্কিম’ নামের সিদ্ধান্তে কার্যত এস আলম গ্রুপকেন্দ্রিক ব্যাংক লুটের দায় চাপানো হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং আমানতে সরাসরি হেয়ারকাট আরোপের এই পদক্ষেপ শুধু আর্থিক নয়, বরং নীতিগত ও নৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত। প্রশ্ন উঠেছে– চুরির দায় কেন ভুক্তভোগীর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।
রেজোলিউশন স্কিমের বাস্তবতা : নোটিশ বনাম প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশে বলা হয়েছে, রেজোলিউশন স্কিমের ‘অভিন্ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে দ্রুততম সময়ে আমানত হিসাব পুনর্গণনা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। এই ‘সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ সবচেয়ে বেশি অসুষ্ঠু প্রমাণিত হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের জন্য। যারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না, ঋণগ্রহণে জড়িত ছিলেন না, বা কোনো অনিয়মে যুক্ত ছিলেন নাÑ তারাই আজ আর্থিক শাস্তির মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানত হিসাব পুনর্গণনা করা হবে বিদ্যমান স্থিতির ভিত্তিতে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। উপরন্তু, এই হেয়ারকাটের ফলে আমানতকারীদের চূড়ান্ত স্থিতি কমিয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ, যারা ব্যাংকে আস্থা রেখেছেন, তাদের অর্থের বড় অংশ স্বেচ্ছায় হারাতে হবে।
এস আলম গ্রুপ ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার উত্তরাধিকার
গত কয়েক বছরে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ, বিপুল অঙ্কের অনিয়মিত ঋণ গ্রহণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রিপোর্ট অনুসারে, এস আলম গ্রুপ ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোট সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের নামে বের করে নিয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এসব ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ বের করা হয়েছে। কখনো কখনো কোনো ব্যাংকের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত, ব্যাংক ডাকাতির এই সুযোগ প্রায় পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছে।
একই সময়, এক্সিম ব্যাংক থেকে নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ অন্যান্য ব্যক্তি ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অর্থ বের করার অভিযোগে যুক্ত। এর ফলশ্রুতিতে, সাধারণ আমানতকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। সরকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন সংস্থা হিসেবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নামকরণ করেছে।
প্রশ্ন উঠে, এই ব্যাংক লুটের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কোথায় ছিল? ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট, ঋণসীমা লঙ্ঘন, একই গ্রুপকে বারবার ঋণ অনুমোদন– সবই নিয়ন্ত্রকের চোখের সামনে ঘটেছে, অথচ কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। আজ সেই অনিয়মের ফল হলো ব্যাংক দুর্বল, আর সেই দুর্বলতা ঢাকতে গিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর ক্ষতির বোঝা চাপানো হচ্ছে।
২ বছরের মুনাফা বাতিল : চুক্তি ভঙ্গ
ব্যাংকে আমানত রাখা মানে একটি লিখিত ও অলিখিত চুক্তি। নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা সুদ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু এখন সেই চুক্তি কার্যত বাতিল করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ‘পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন, যা আমানতকারীর অধিকারকে স্বীকার করে না।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবাসীর পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী– যারা এই মুনাফার ওপর নির্ভরশীল, তারা হঠাৎ দুই বছরের আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকা আমানত করেছিলেন। তিনি প্রতি বছর ৮-১০ লাখ টাকা মুনাফা তুলে সংসার চালাতেন। এই হেয়ারকাটের ফলে তার প্রাপ্ত মুনাফা প্রায় ১৬ লাখ টাকা কর্তন হয়ে যাবে, এবং মূলধন ৩৪ লাখ টাকায় নেমে যাবে। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
হেয়ারকাট : ক্ষতির দায় কার?
হেয়ারকাট মানে আমানতের একটি অংশ স্থায়ীভাবে কেটে নেয়া। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ে এটি বিরল এবং সাধারণত বড় বিনিয়োগকারী বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশে এই হেয়ারকাট চাপানো হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর, যারা কোনো ঝুঁকি নেননি।
প্রশ্ন জাগে: যারা হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে কেন আমানতকারীর টাকায় ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে? আদালতের মাধ্যমে এস আলমের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, কিন্তু কেন ওই সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের দায় শোধ করা যায়নি? রাষ্ট্র যদি সম্পদ ক্রয় করে দায় শোধ করাত, তাহলে সাধারণ মানুষ এই ক্ষতির মুখে পড়ত না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় এড়ানোর কৌশল
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরো প্রক্রিয়া গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংকগুলো দখল হওয়ার সময়, অনিয়মিত ঋণ ফুলে-ফেঁপে ওঠার সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। আজ যখন ক্ষতি বাস্তবায়নের সময় এসেছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দায়িত্ব স্বীকার না করে আমানতকারীদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর কৌশল।
নৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ বার্তা
এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর বার্তা দিচ্ছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে বার্তা স্পষ্ট : ‘আজ লুট করো, কাল দায় নেবে সাধারণ মানুষ।’ এটি ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। যদি এই দৃষ্টান্ত স্থায়ী হয়, ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারির দায় সাধারণ আমানতকারীর ওপর চাপানো হতে পারে।
আস্থার সঙ্কট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঝুঁকি
ব্যাংকিং ব্যবস্থা আস্থার ওপর টিকে থাকে। দুই বছরের মুনাফা বাতিল ও হেয়ারকাট সেই আস্থায় গভীর ফাটল ধরাচ্ছে। ইতোমধ্যেই অনেক আমানতকারী আতঙ্কিত, আজ এই ব্যাংক, কাল অন্য ব্যাংক? বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে এই সিদ্ধান্ত আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করছে, যার প্রভাব পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংস্কার নয়, শাস্তি পাচ্ছে নিরপরাধরা
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এস আলম গ্রুপকেন্দ্রিক ব্যাংক লুট একটি দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার ফল। কিন্তু সেই ব্যর্থতার দায় যদি শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীরা বহন করে, তা কোনো সংস্কার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেয়া অবিচার। প্রকৃত সংস্কারের মানে হলো: লুটের টাকা পুনরুদ্ধার; দায়ীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আমানতকারীর সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এসব না করা হলে, ‘রেজোলিউশন স্কিম’ ব্যাংক সংস্কারের নয়, বরং আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই সঙ্কট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কটও। দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং হেয়ারকাটের মতো সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপানোয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারের উচিত এই ক্ষতির দায়কে প্রকৃত অপরাধীদের ওপর চাপানো এবং সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, নয়তো ‘রেজোলিউশন স্কিম’ স্বাভাবিক ব্যাংক সংস্কারের বদলে আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
শরিয়াহ নীতি অনুযায়ী ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা ২ বছর মুনাফা পাবেন না : গভর্নর
শরিয়াহ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত পাঁচটি একীভূত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা পরবর্তী দুই বছর কোনো মুনাফা পাবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
গভর্নর জানান, শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ের মূল নীতির আলোকে ব্যাংক শুধুমাত্র লাভ হলে তবেই আমানতকারীদের সাথে মুনাফা ভাগ করতে পারে। কোনো ব্যাংক লোকসানে গেলে সেই সময়ে মুনাফা বণ্টন করা যায় না। তিনি বলেন, ‘শরিয়াহ উইংয়ের গাইডলাইন অনুযায়ী লোকসান হলে আমানতকারীদের জন্য কোনো মুনাফা প্রযোজ্য নয়।’
তিনি আরো জানান, সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংক ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমানতকারীদের মুনাফা প্রদান করেছে। তবে নতুন অডিটে দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো ব্যাপক লোকসানে পড়েছে। তাই এই দুই বছরের জন্য কোনো মুনাফা বিতরণের সুযোগ নেই।
ড. মনসুর জানান, নতুন ও পুরনো উভয় ধরনের আমানতকারী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মুনাফা পেতে শুরু করবেন। তবে এটি নির্ভর করবে নতুন একীভূত ব্যাংক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-এর বিনিয়োগ এবং আমানত নীতিমালার ওপর।
এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর উল্লেখ করেন, ‘ব্যাংকগুলোর এই সঙ্কটের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দোষীদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সঙ্কটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতের মুনাফায় ‘হেয়ারকাট’ আরোপ করা হবে। অর্থাৎ এই দুই বছরের জন্য আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাবেন না এবং হিসাব অনুযায়ী তাদের ব্যালান্স পুনর্গণনা করা হবে।
এ একীভূতকরণের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো : ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
গ্রাহক উদ্বেগ ও ব্যাংকে অস্থিরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে গতকাল সারা দিন পাঁচটি ব্যাংকে অস্থিরতা বিরাজ করেছে। গ্রাহকরা ব্যাংকের শাখায় এসে কেন মুনাফা প্রদান বন্ধ করা হয়েছে তা জানতে চাইছেন।
ইউনিয়ন ব্যাংকের একজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনেই ৯৮ শতাংশ টাকা এস আলম লুট করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। এখন আমাদের আমানত থেকে কেন টাকা কর্তন করা হবে?’
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কর্তৃপক্ষের চাপে আত্মীয় পরিজনের টাকা আমানত হিসেবে রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। অনেকেই জীবন শেষের সময়ে এককালীন পেনশন বা সঞ্চয়ের অর্থ আমানত করেছিলেন। হঠাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে এই পরিবারগুলো চিন্তায় পড়েছে। আমাদের বেতনও ঠিকমতো পাচ্ছি না, তবু গ্রাহক ও পরিবারিক চাপে আমাদেরকে দোষারোপ করা হচ্ছে।’
অনুরূপভাবে অন্যান্য ব্যাংকেও গ্রাহকরা নিজেদের আমানত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা চাপের মুখে রয়েছেন।



