ঢাকার মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু সম্প্রসারণ ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র- সব ক’টিতে নেয়া বিদেশী ঋণ কি সত্যিই স্বচ্ছ এবং দেশের জন্য ঝুঁকিমুক্ত? অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চরম অস্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি দায়ের আশঙ্কা।
বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারণশীল অবকাঠামো খাতে বিদেশী ঋণ একটি বড় অঙ্গ। মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতু সম্প্রসারণ এবং নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কোটি কোটি ডলারের ঋণ নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণদাতাদের সাথে চুক্তির শর্তগুলো কতটা স্বচ্ছ এবং দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কতটা- এটি এখনও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু প্রকল্পের চুক্তিতে এমন শর্ত থাকা যা অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করতে পারে এবং সংসদ বা তত্ত্বাবধায়ক কমিটি পর্যবেক্ষণের বাইরে রাখা হয়েছে।
মেগা প্রকল্প : ঋণের শর্ত ও চুক্তি
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশী ঋণ গ্রহণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২০২৫ সালের মধ্যে মোট ১৫টি বড় প্রকল্পে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেয়া হয়েছে।
* পদ্মা সেতু সম্প্রসারণ প্রকল্পে জাপানিজ এক্সিম ব্যাংক থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার
* ঢাকা মেট্রোরেল প্রজেক্টে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (অউই) থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলার
* নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য চীনা ব্যাংক থেকে ২.১ বিলিয়ন ডলার
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে এই প্রকল্পের অংশ অনেক বড় এবং শর্তগুলোতে অস্বচ্ছতা ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নেয়া বিদেশী ঋণের শর্ত এবং মেয়াদ দেশের বাজেট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রকল্পভিত্তিক চুক্তি অনুযায়ী সুদের হার সাধারণত ১.৫ শতাংশ থেকে ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকে এবং ঋণের মেয়াদ ১৫-২০ বছর। তবে অনেক চুক্তিতে রয়েছে মুদ্রামানের ওঠানামার ধারা, যা বিদেশী মুদ্রার মূল্যের পরিবর্তনের সাথে প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।
প্রিমিয়াম এবং বিশেষ ছাড়ও লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতু সম্প্রসারণ চুক্তিতে প্রিপেমেন্ট জরিমানা আছে, যা ঋণ আগেই পরিশোধ করলে অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে। চীনা ঋণে কিছু গোপন ছাড়ের শর্ত রয়েছে, যা সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এসব ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তি সংসদীয় কমিটিতে আলোচিত হলেও মূল শর্তগুলো বাইরে রাখা হয়। এক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা গোপন নাম প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, কিছু শর্ত অননুমোদিতভাবে নথি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে এবং ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব
সরকারি প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু প্রকল্প অনুমোদনের সময় ন্যূনতম জনমত ও বিশ্লেষণ ছাড়া দ্রুত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব এবং করপোরেট লবিং প্রভাবিত করেছে চুক্তির শর্তগুলো। একাধিক বিশ্লেষক মনে করছেন, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য শর্তের স্বচ্ছতা কমানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে বোঝা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশী ঋণ নেয়ার ফলে অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, বাজেট চাপ উল্লেখযোগ্য। বিদেশী ঋণের রেপে-শিডিউল এবং সুদ পরিশোধের জন্য প্রতি বছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার দেশের বাজেট থেকে দেয়া হচ্ছে, যা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সীমিত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মুদ্রা ঝুঁকি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউএসডি-বাংলাদেশী টাকার রূপান্তরের পার্থক্য প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট এবং বাস্তব খরচের মধ্যে ফারাক এই কারণে আরো বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি দায়। অনেক চুক্তিতে অগ্রিম পরিশোধের জরিমানা এবং সুদ সমন্বয় ধারা থাকার কারণে আগাম ঋণ পরিশোধ করা জটিল হয়ে যায়। এ ধরনের শর্ত দেশের বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়ন বনাম অনুমোদিত বাজেটের মধ্যে ফারাক দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতু সম্প্রসারণ প্রকল্পের বাস্তব খরচ অনুমোদিত বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘যদি মুদ্রা বা সুদের পরিবর্তন ঘটতে থাকে, তবে দেশীয় বাজেটের ওপর চাপ দ্বিগুণ হতে পারে। এ ধরনের চুক্তি পরিকল্পনা ছাড়া নেয়া উচিত নয়।’ ফলে, বিদেশী ঋণ নেয়ার আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়াগত সতর্কতা অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক তুলনা
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশী ঋণ নেয়ার সময় স্বচ্ছতা এবং তত্ত্বাবধান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মেট্রোরেল প্রকল্পে ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়েছে। সেখানে চুক্তি সংসদীয় তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত এবং অগ্রিম পরিশোধের জরিমানা বা মুদ্রার ওঠানামার ধারা -এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ শর্ত রাখা হয়নি। এর ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও বাজেট নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং আর্থিক বোঝা কম হয়েছে।
অপর দিকে, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা পোর্ট চুক্তি থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। সেখানে ঋণের শর্ত এবং অস্বচ্ছ চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বোঝা ও বাজেট চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, স্বচ্ছতা এবং তত্ত্বাবধান না থাকলে বাংলাদেশও একই পথে যেতে পারে।
একজন অর্থনীতিবিদ, বলেছেন, ‘প্রকল্পের গুরুত্ব বোঝা যায়, কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করতে পারে। স্বচ্ছতা এবং তত্ত্বাবধান জরুরি।’ তিনি বিশ্লেষণ করেছেন যে, বিদেশী ঋণ কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নয়, দেশের বাজেট এবং মুদ্রানীতি স্থিতিশীল রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যদি চুক্তিতে সুদের হার, অগ্রিম পরিশোধের জরিমানা বা মুদ্রার ওঠানামার ধারা-এর মতো শর্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ না করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে দেশের ওপর আর্থিক বোঝা চাপাতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু শর্ত ইচ্ছাকৃতভাবে নথি থেকে বাইরে রাখা হয়। প্রকল্প দ্রুত শুরু করতে চাওয়ায় এ ধরনের ঝুঁকি নেয়া হয়েছে।’ তার মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রক্রিয়াগত তড়িঘড়ি এবং স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এই বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে, বিদেশী ঋণ চুক্তির স্বচ্ছতা এবং তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
ডাটা টেবিল

বিশ্লেষণ ও সুপারিশ
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশী ঋণ নেয়া দেশের দ্রুত উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে, চুক্তির শর্তে স্বচ্ছতার অভাব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়াতে পারে এবং প্রকল্পের বাস্তব ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। কিছু প্রকল্পে সুদের হার, অগ্রিম পরিশোধের জরিমানা বা মুদ্রার ওঠানামার ধারার মতো শর্ত দেশের বাজেট ও মুদ্রানীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বোঝা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের আর্থিক ঝুঁকি কেবল অর্থনৈতিক নয়, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কটও তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক তুলনা প্রমাণ করে, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধান ছাড়া বিদেশী ঋণ গ্রহণ বিপজ্জনক। যেমন ভারতের মেট্রোরেল প্রকল্পে সংসদীয় তত্ত্বাবধান এবং পূর্ণ স্বচ্ছতার কারণে ঝুঁকি কম, কিন্তু শ্রীলঙ্কার হাবানটোটা পোর্ট চুক্তি থেকে দেখা যায়, স্বচ্ছতার অভাবে ঋণ দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা সৃষ্টি করেছে। সুতরাং বিদেশী ঋণ নেয়ার সময় স্বচ্ছতা, তত্ত্বাবধান এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন অপরিহার্য।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নেয়া বিদেশী ঋণ দেশের অর্থনীতি ও বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই সব বিদেশী ঋণচুক্তি পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা শর্তগুলো সহজে যাচাই করতে পারে। সংসদীয় কমিটি এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা চুক্তি পর্যালোচনা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া শক্তিশালী করবে, যাতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়। ঋণের শর্তে থাকা অগ্রিম পরিশোধের জরিমানা বা মুদ্রার ওঠানামার ধারা এবং অন্যান্য আর্থিক শর্ত নিয়ে সতর্ক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি, যা দেশের বাজেট ও মুদ্রানীতি স্থিতিশীল রাখবে। এ ছাড়া, বড় প্রকল্পের জন্য স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত, যাতে প্রকল্পের বাস্তব ব্যয়, ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক সুফল সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। এই সুপারিশগুলো প্রয়োগ করলে দেশের ঋণ গ্রহণপ্রক্রিয়া আরো দায়িত্বশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ হবে।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশী ঋণ নেয়া অনিবার্য, কিন্তু শর্ত ও চুক্তিতে স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং সংসদীয় তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক উদাহরণ প্রমাণ করে, স্বচ্ছতা ও তত্ত্বাবধান ছাড়া বিদেশী ঋণ কেবল অর্থনৈতিক বোঝা নয়, ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কটও সৃষ্টি করতে পারে।


